পশ্চিমবঙ্গের গল্পকার সোনালি-এর ছোটগল্প ‘ব্যাসিলিকা’

ব্যাসিলিকা

সোনালি

“লিক ইট অফ;লিক ইট অল অফফ”—

যন্ত্রনা, পিপাসা, আরও কি কি যেন মিশে শব্দগুলোর সঙ্গে ।

চার্চের ভিতরের আলোআঁধারি আর্চ দেওয়া সিঁড়ির তলায় ঘুরতে ঘুরতে ,হাস্কি পুরুষ কন্ঠের আর্ত স্বর শুনে এগিয়ে গিয়েছিল সঞ্চারী।

একটা জংধরা লোহার পাত লাগানো পুরোনো কাঠের দরজার ফাঁকে চোখ রেখে নিজের অজান্তেই শ্বাস টেনে নিয়েছিল লম্বা করে।

ছোট্ট ঘরটা।গোল টুলের ওপর কাঠের বাতিদানে রাখা মোমবাতির আলোয় ফুটে উঠেছে একটা ঘামে ভেজা চকচকে চওড়া পিঠ,নীচের দিকে ঢালু হয়ে নামা সরু কোমর ,আরও নীচে সুগোল পিছনের খাঁজ ,পেশীবহুল এক জোড়া লম্বা পুরুষালি পা।মুখোমুখি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে একটা কাঠের চৌকিতে বসে আছে এক অলিভরঙা সুন্দরী।একটু তেকোনা মুখের ছাঁদ। লম্বা লম্বা হাত পায়ের টান। খয়েরি গোছের এক রাশ চুল মাথার ওপর দিকে এলোমেলো খোঁপায় আটকানো। বড় বড় পাপড়িতে ঘেরা দীঘল চোখ জোড়া নিষ্পলক হয়ে আটকে আছে সামনের অনাবৃত পুরুষ শরীরে। এক দৃষ্টে চেয়ে আছে মেয়েটা । পলক পড়ছে না। নিশ্বাস ও বন্ধ বুঝি। উত্তপ্ত তীব্র দৃষ্টি দিয়েই যেন লেহন করে নেবে সামনের উন্মুক্ত শরীরটাকে। পাতলা লাল চামড়ায় ঢাকা খাঁজকাটা এক জোড়া ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে গেছে। ঠোঁটের ওপরে , ঠিক মাঝখানের খাঁজ বরাবর মুক্তোর মত ঘামের বিন্দু।

সামনের পুরুষালি শরীরটি মসৃণ । ঘামে ভিজে চকচক করছে।

কন্যার হাতে পলকাটা কাঁচের বাটি। সোনালি রঙ টলটল করছে তাতে। ঠিক তরল নয়। একটু ঘন কিছু। সামনের নিখুঁত উন্মুক্ত পুরুষ শরীরটি থেকে চোখ না সরিয়েই সে ডান হাতের আঙ্গুলগুলো চুবিয়ে দিয়েছে সেই সোনারং বস্তুটায়। আঙুলগুলো তুলে নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিতেই ,হাত বেয়ে গড়াতে লাগল  চটচটে সোনা । খাঁটি মধু।

এক টানে তর্জনী আর মধ্যমারগড়ানো মধু সামনে দাঁড়ানো পুরুষটির শরীরের মাঝবরাবর সরল রেখায় মাখিয়ে দিয়েই ,আস্তে আস্তে ঠোঁটের কাছে আঙুলগুলো নিয়ে এল মেয়ে ।পুরুষটীর চোখে চোখ রেখে আস্তে আস্তে চেটে নিতে লাগল নিজের আঙুলগুলো । লাল টুকটুকে জিভের ডগায় গড়িয়ে পড়া নেশা লেপ্টে যাওয়ার সঙ্গেই ভেসে এল আর্ত পুরুষ কণ্ঠ, “আহ মারিয়া …”

নিজের বুকের ঢিপ ঢিপ শুনতে শুনতে সঞ্চারী ভাবল, “মধু? কি উর্বর ভালবাসার মস্তিষ্ক রে …”

গোয়ার পুরোনো চার্চের ভিতর দাঁড়িয়ে ছিল সঞ্চারী। ইতিহাসের ছাত্রী ।কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এসেছে গোয়া ।এডুকেশানাল ট্যুর ।

পনেরশ শতাব্দী থেকে পর্তুগিজদের নজর গোয়ার ওপরে ।একেক বারের আক্রমনের পর এরা বীভৎস ভাবে খুন করেছে পুরুষদের। আর মেয়েমানুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে জাহাজের ভিতর খাঁচায় ভরে রেখেছে পোষা জন্তুর মত। যুদ্ধে জেতার পর দিন চারেক করে নাবিক, সৈনিকদের ক্ষুধার্ত কুত্তার দলের মত শহরের ওপর ছেড়ে দিয়েছে সেনাপতি।

যাও ,যা ইচ্ছে করে এস, যা পার লুটে নাও।

মান্ডভির জলে ভাসা আম নারকেলের অজস্র সবুজ।লাল মাটিতে সোনার চেয়েও দামি মসলার সুগন্ধি ফলন।এদেশের মানুষের ঘরে অপর্যাপ্ত হীরে ,চুনি, পান্না।সবই পৌঁছোল বিদেশি কোষাগারে ।সমস্ত সমুদ্র তীর জুড়ে তৈরি হল কেল্লা, লাইট হাউস।ছাপোরা বিচের পাশে পুরোনো ফোর্ট, কান্ডলিম বিচের পাশে ফোর্ট আগুয়াডা, কেল্লার সাথে পুরোনো লাইট হাউসে পুরোনো গল্পের হাতছানি। এমন অজস্র দুর্গ চারদিকে।

এমনি করেই থেকে গেল পর্তুগিজরা। সংগে নিইয়ে এল উদ্দাম লালসা, বুল ফাইটের রক্ত লাল উন্মাদনা, মদের ফোয়ারা ,আর ক্রিশ্চান পাদ্রেদের ।

 

কলকাতার ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীরা পুরোনো ঐতিহ্য , ফ্রেঞ্চ পর্তুগিজ স্থাপত্য, চার্চ , কোঙ্কনি মানুষের সঙ্গে এদেশের সাংস্কৃতিক মিশেল, এইসব ছুঁয়ে ছেনে দেখতে এসেছে।

পুরোনো চার্চের উপাসনাকক্ষে সোনায় মোড়া অল্টার বেদীর চারপাশে ভিড় করে ছিল সবাই। বিরাট হল। আর কত উঁচু।

একটা কালো কাঠের লম্বাটে বাক্স দাঁড় করানো ছিল একপাশে।পাশে আবার কাল কাপড়ের পর্দার মতন কি ঝুলছে। সঞ্চারীরা জিগেস করতে, স্যরেদের আগেই লোকাল গাইড ভদ্রলোক বলে উঠলেন , “কনফেশান।কনফেশান। ইট ইজ দা কনফেশান বক্স।”

সবাই ভারি কৌতূহলী হয়ে চলে এল এ বস্তুটা দেখতে।

এবার স্যর বুঝিয়ে বললেন , বাক্সটার ভিতরে দাঁড়াবার জায়গা আছে। দুজন মানুষ দাঁড়াতে পারে এর মধ্যে।একজন, যে কোনো  অপরাধ করেছে। যার অনুশোচনা হয়েছে বলে বিবেকের দংশনে ছুটে এসেছে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে। অন্য জন ঈশ্বরের প্রতিনিধি কোন ধর্মযাজক।বাইবেল বলেছে পাপকে ঘৃণা কর , পাপীকে নয়। এখানে নিজের পাপের কথা স্বীকার করে পাদ্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে অনেক সাধারন ধর্মভীরু মানুষ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরত।তাদের গ্লানি জমা থাকত চার্চের কাছে।

সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে এই বাক্সটা।আর এর চারপাশের জিনিসপত্র।

এক ফাঁকে সঞ্চারী পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল বিশাল প্রাসাদের মত বাড়িটার আনাচকানাচগুলো একা ঘুরে দেখবে বলে। পুরোনো সময়কে ছোঁয়ার চেষ্টা করাটা ওর নেশা।

হলদে খয়েরি পাথরের বিশাল প্রাসাদ। অনেকটা দুর্গের মত। পুজোর বেদী , প্রার্থনার হল ছাড়াও কত কত ঘর , প্যাসেজ চার দিকে। অলিগলি রাস্তারা কোথায় কোথায় গেছে ? বাইরের বড় দরজাটাও দুর্গের দরজার মতই। তিন চার মানুষসমান উঁচু ,ভারি কাঠের ।বাইরে লোহার পাত লাগানো ।তার ওপর এক হাত লম্বা লম্বা মোটা লোহার পেরেক গাঁথা । আক্রমণ ঠেকানোর জন্যেই নিশ্চয়ই। হবে না। কত সোনা রুপো দামি জিনিষ ঠাসা ভিতরে । আগে তো আইনি ক্ষমতাও প্রচুর ছিল। রাজাগজাদের মতই ত ছিল চার্চের লোকেরাও।

দরজার ভিতরের দিকে মোটা কাজকরা রূপোর পাত। একটা বড় প্যাসেজ পুরো চার্চের তোলাটা ঘিরে এসেছে। ওইটা ধরে হাঁটলে প্রদক্ষিণ করে আসা যায় সবটা । ওর সামনের ভাগটাতেই বড় তামার বেদি। সেখানে অজস্র মোমবাতি জ্বলছে। দরজার বাইরে গরিব কোঙ্কানি মেয়ে বাচ্চারা মোম হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রি করবে বলে। যারা ভিতরে আসে, প্রার্থনা সেরে, মনস্কামনা পুরবে আশায় বা প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করে আলো জ্বেলে যায় ।

সিঁড়ির নিচে আর্চ দেওয়া আছে পরপর। সেই আবছায়া ঢাকা জায়গায় সারি সারি ছোট ছোট কাঠের বন্ধ দরজা। হয়ত আগে এখানে লোক থাকত ?

আস্তে আস্তে সেইখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ই সঞ্চারীর কানে এসেছিল পুরুষ কণ্ঠের মাদকতা মাখানো সেই আর্ত উচ্চারণ।

“আহ !মারিয়া !লিক ইট অফ।লিক ইট অল অফফ—”

চুম্বকের মত সঞ্চারীকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেই স্বর।

ঝিমঝিম নেশা ধরে যাচ্ছিল সঞ্চারীর । আকাঙ্ক্ষার এই সোনালি মুহুর্তের সাক্ষী হবার নিষিদ্ধ উত্তেজনায় হৃদপিণ্ড ছুটছে অশ্বগতিতে। তেতে উঠছে কান, গাল।ঘরের মধ্যে জ্বলতে থাকা মোমবাতিদানের মোমের মতই কি যেন গলে যাচ্ছে ভিতরে।

চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক; সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে প্যাসনের সুরা পান করছে দুটি জ্বলন্ত শিখার মতসত্তা, পিপাসার ঢেউ উঠছে ইথারের তরঙ্গে।

হঠাৎ তীব্র মধুর এই দৃশ্যটা খানখান হয়ে গেল এক ধারালো ধাতব ঝিলিকে।মূর্তির মত সুন্দর টানটান পুরুষ পিঠের মাঝবরাবর ছিটকে এসে বিঁধে গেল তীক্ষ্ণ ধাতব কিছু। গড়িয়ে পড়ারক্তের ধারা, সামনে বসা মেয়েটির ভীত আতঙ্কিত মুখের চমকে ওঠা ভয় আর তীক্ষ্ণ তীব্র আর্তনাদের মধ্যেই উলটে গেল ঘরের মোমবাতিদান। ঘর অন্ধকার।তারপর মর্মান্তিক নারী কণ্ঠের আরেকটি চীৎকার তার মৃত্যুযন্ত্রনার জানান দিল বুঝি।

পরের মুহুর্তেই আচমকা শুনশান নিস্তব্ধতার মধ্যে ফিরে এসে চমকে উঠল সঞ্চারী। নিঃশব্দ দুপুর। চার্চের প্যাসেজ চুপচাপ।

ভীষণ হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাতেই দেখল, আধবুড়ো পাদ্রী হেঁটে আসছেন এক পাশের থামের কোনা  থেকে। সাদাকালোয় মেশানো একগাল দাড়ি ।লম্বা কালো রোব পরনে।গলায় রোজারি বিডসের পুঁতির সঙ্গে ক্রস ঝুলছে ।

তিনি বললেন,“দেখতে পেলে বুঝি? ওঃ অনেকেই পায়। ছেলেটারপরেমেয়েটা ও একইভাবেখুনহয়েছিল। একইসঙ্গে । একেবারেএফোঁড়ওফোঁড়।

পরেরদিনটেরপেয়েছিলসবাই। পাপ কি আর চাপা থাকে? বিয়ে না শাদি না, চার্চের মধ্যে এসে বেলেল্লাপনা। নরকেই জায়গা হওয়া উচিত এই সব ব্যভিচারীদের। তবু ত চার্চের মধ্যে মৃত্যু , তাই কবরে জায়গা দিয়েছিলেন বিশপেরা—-”

গলার স্বরটা ভাল লাগল না সঞ্চারীর।

বলেন কি পাদ্রী ? দুটো মানুষ ভালবাসছিল বলেই এমন হিংস্র হয়ে উঠছে এনার গলার আওয়াজ? যিশাস না বলেছেন প্রেমের, ক্ষমার ধর্ম প্রচার করতে?

তবু এ ভদ্রলোকের পাশে পাশেই পা চালিয়ে এই সিঁড়ির তলার অন্ধকারটা থেকে বেরিয়ে যেতে চায় সঞ্চারী। পৌঁছোতে চায় বাইরের আলোয় ।

চলতে চলতেই বলে, “ব্যভিচারী বলছেন কেন? ভালবাসা কি অপরাধ?”

হাত তুলে থামিয়ে দ্যান ফাদার।

“থামো হে। যা জানো না তাই নিয়ে কথা বল কেন? বলেছিল সুইসাইড ।কিন্তু আসলে ত পুরোনো লাইট হাউস থেকে বৌটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল ছোকরা। ওই যে লোকাল হিরো ,পাওলো।

এক মাথা কোঁকড়া চুল, রোগা মতন সেই মেয়েটা ।হ্যাঁ, খুব বদমেজাজি ছিল বটে। পাওলো অন্য কারো দিকে তাকালেও আঁচড়ে কামড়ে চেঁচিয়ে অস্থির করে ফেলত। তা, অন্য কারো দিকে তাকানোই বা কেন? ঢের পয়সা দিয়েছিল মেয়েটার বাপ বিয়ের সময়।নইলে অত হাড্ডিসার মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাত না হিরো। সে পয়সা দিয়েই তো অতবড় ফার্নিচারের দোকান তৈরি হল। দোকানেও এসে বসে থাকত বউ। পাছে বর অন্য কারোর সাথে ফষ্টিনষ্টি করে। পাগল। পাগল।

আরে, অমনি করে আটকানো যায় কাউকে?

আর এ ছোকরা তো আজন্ম লক্কা পায়রা। চারপাশে চিরকাল মাছির মত মেয়েমানুষ ভন ভন। তাকে সামলে রাখা কি আর ওই খ্যাংরাকাঠি পুচকে মেয়ের কম্মো ?

কেবল ঘ্যান ঘ্যান আর চেঁচামিচি ।পাড়ার লোক অবধি অস্থির হয়ে থাকতো ।

তিতিবিরক্ত পাওলো লাইটহাউস দেখতে নিয়ে গেল বউকে এক রোববারে । ফিরে এসে বলল ,বারন না শুনে পাঁচিলের ধারে উঠে ঝগড়া করছিল বউ।বলছিল পাওলো যথেষ্ট মনোযোগ দেয় না, ভালবাসে না, তাই সুইসাইড করবে। সেইসব কথা কাটাকাটির মধ্যেই হঠাৎ পা স্লিপ করে নিচে পড়ে গেছে।

সকলেই জানত মেয়েটা খ্যাপাটে । নিচে থেকে বডি উদ্ধার করে আনল সবাই মিলে। ভারি কান্নাকাটি করে তাকে কবর দিয়ে হাঁফ ছাড়ল ছোকরা ।”

চটপট পা চালাচ্ছিল সঞ্চারী। লম্বা লম্বা আর্চের তলার অন্ধকার যেন ফুরোচ্ছেই না, উফফ।

তবু কৌতূহল না চাপতে পেরে মুখ ফেরায় ।

“কিন্তু মারল কে?”

কি বিশ্রী খিকখিকে হাসি বুড়ো পাদ্রীর।

“কেন? সিস্টার জোসেফিন? সেতো বরাবর পাওলোর জন্য ফিদা। ভেবেছিল বৌটা মরে যেতেই পাওলো বুঝতে পারবে যে একেবারে মনপ্রাণ দিয়ে তাকে পাবার জন্যই অল্টারে বসে রোজারিতে জপ করে চলেছে জোসেফিন। কিছু যিশাসের জন্য নয়। পাওলো একবার তার দিকে চোখ তুলে তাকালেই চার্চ থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে যেত।

কিন্তু পাওলো ছুতোর তো কোন দিন টেরও পায়নি সে ব্যথা।উলটে পাশের জেলেপট্টির মেয়ে মারিয়াকে এই চার্চেই ডেকে এনেছিল, গ্রামের সবার চোখ এড়িয়ে নষ্টামি করার জন্য। তার জন্যেই না খিটখিটে বৌটার গতি করেছিল আগেভাগে।

চার্চের ফার্নিচার বানাতে আসত। পিউএর সারি, কাঁচের জানালা।সেই জন্যে এই তলার ঘরটা দেওয়া হয়েছিল ত তাকে।

সেখানেই শুনশান দুপুরে মারিয়াকে নিয়ে আসত বদমাশটা ।

মারিয়ার বর মরে গেছিল কবেই। মছছিমার ছিল তো। নৌকো নিয়ে বেরিয়ে ঝড়ে তলিয়ে গেছিল। খুচরো কাজ করে দিন কাটত মেয়েটার। তবে সুন্দরী বলে একটু বেশীই ডাক পেত এদিক ওদিক।

নষ্টামির নেশায় ডুবে থেকে এরা টের পায়নি জোসেফিন সব দেখে রাখছে।

সে মেয়ে চার্চে জয়েন করেছিল বাচ্চা বয়েসে। সাতটা মেয়ের সাত নম্বর।বাপের কারবার ছিল মদ চোলাই করা। মাটা বাচ্চা বিয়োতে বিয়োতে অক্কা পেয়ে নিস্তার পেয়েছিল। বাপ রোজ রাতে মদ গিলে ফিরে মেয়েদের একেকটাকে বেল্ট দিয়ে বেদম পিটতে পিটতে ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে দরজা দিতো। দশবছুরে মারিয়ার দিকে যেদিন মাতালের চোখ পড়ল, ও মেয়ে রুটি বানানোর বেলুনের ঘায়ে বাপের মাথায় আলু গজিয়ে চার্চে পালিয়ে এল এক দৌড়ে। মাদার সুপিরিয়র ছিলেন দয়ার শরীর ।চট করে সিস্টার বানিয়ে নেবেন বলে ডিক্লেয়ার করে দিলেন। বুঝেছিলেন, এ না হলে গুণ্ডাটার হাত থেকে রেহাই পাবে না।

বছর আট নয় দিব্যি ভিজে বেড়ালের মত ছিল ছুকরি। মাথা নিচু করে চলাফেরা করত, যেন কাউকে তাকিয়েও দেখে না। একেবারে সন্তদের মত হাবভাব। আহা, প্রার্থনার সময় কি চোখ উল্টে ভক্তি। যেন সাক্ষাৎ এঞ্জেল।

এইসময়েই পাওলোর বিয়ে ঠিক হল । বড়লোক শ্বশুর হবু জামাইকে নিয়ে চার্চে এলেন সিনিয়র বিশপ ফাদারের সঙ্গে সব ব্যবস্থা ঠিক করতে। ব্যস।

হয়ে গেলো সিস্টারের ধম্মকম্ম।

রোজারিতে যিশাসের নামের জায়গায় পাওলোর নাম জপত, নির্ঘাত।

বিয়ের দিন মন্দ দেখাচ্ছিল না বউটাকে। সাদা লেসের গাউন, লম্বা ভেইল।পয়সাদার বাপ সারা চার্চ সাদা লিলি দিয়ে সাজিয়েছিল। মেয়ের মাথায় সাদা গোলাপের টায়রা, হাতের বোকেতে সাদা গোলাপের সঙ্গে সাদা ভেলভেটের লম্বা লম্বা ফিতের বো। মায়ের গয়নাগুলো অত রোগা শরীরে একটু ঢলঢল করছিল বটে।তবু খারাপ লাগছিল না সব মিলিয়ে। পাশে হিরোকে ভাল দেখাচ্ছিল বলাই বাহুল্য। সেই দেখেই সিস্টার ফিদা হয়ে গেছিল আর কি, হে হে।”

এত বুকভাঙ্গা সব কষ্টের কথা এমন রেলিশ করে বলছেন ভদ্রলোক, বড্ড রাগ হয়ে গেল সঞ্চারীর। একেবারে রহস্য রোমাঞ্চ গল্প বানিয়ে ফেলছেন বুড়ো। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড দ্যাখো, কি সহজে বদনাম দিচ্ছেন চার্চেরই কোনো মহিলার নামে।

কি রে বাবা !

বাইরের পিলারঘেরা মোমবাতি জ্বালানোর জায়গাটা দেখা যাচ্ছে একটু দূরে। সাহস পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সঞ্চারী।

ভিতরটা অস্থির করছে।

আর এই যে খ্যাঁকখ্যাঁকে বুড়ো , ধর্মযাজক বটে কিন্তু ধার্মিক কি? কি বিশ্রি কথা বলার ভঙ্গি।কত দিন আগে মরে গেছে বলেও মানুষগুলোর প্রতি না আছে সম্মান, না আছে সিমপ্যাথি। জঘন্য !

“থামুন তো।কে মেরেছে সে ত দেখাই গেল না। শুধু শুধু বদনাম করছেন চার্চের কোনো মেম্বারের নামে। প্রমাণ আছে কিছু? এটা নিশ্চই অনেক অনেক দিন আগের ঘটনা?”

“ছিল তো প্রমাণ। ছিল বৈকি। জোসেফিন নিজের মুখে কনফেশান করেছিল যে।

একদিন সকালে তো চার্চের মালি পুজোর ফুল নিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল নিচের তলার ওই ঘরের দরজা খোলা। উঁকি মেরেই চীৎকার করতে করতে এসে অজ্ঞান হয়ে গেলো ।পরে সবাই ঘরে ঢুকে দেখল পাওলো আর মারিয়া দুজনেই মরে পড়ে আছে। পাওলোর গায়ে সুতোটি নেই ।মারিয়া একখানা পাতলা উড়নি জড়ানো ।দুজনেই রক্তের পুকুরে চুবে আছে। খুব ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে গিঁথে দিয়েছে দুজনকেই কেউ। ইনকোয়েস্টের পর; করোনার খুব আশ্চর্য হয়ে বলে ছিলেন,প্রত্যেকটি আঘাত এত সরু অথচ গভীর , এমনধরনের  অভিজ্ঞতা তাঁর আর কখনও হয়নি।দেশে বা বিদেশে ,এত সরু ছুরি তিনি কখনও দেখেননি। অস্ত্রটাও পাওয়া যায়নি অবশ্য।খালি এক বাটি মধু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

আইনি ঝঞ্ঝাট মিটে যেতে কবর দেওয়া হল দুটোকেই । সিনিয়ররা বললেন , চার্চের মধ্যে মারা গেছে, আর দুজনেই সিঙ্গল, কাজেই এদের মাফ করে দেওয়া যায়।

সেদিন সন্ধ্যে বেলাই জোসেফিন কনফেশান বক্সে এল।

বলল,রোজই দরজার ফাঁক দিয়ে ওদের দেখত। এই আজ যেমন তুমি দেখছিলে। ওদিন আর সহ্য করতে পারেনি। আগের দিনই মারিয়া চাকভাঙ্গা মধু আনবে বলে গেছিল ছোকরাকে মিচকি হেসে।মধু দিয়ে কি হবে জানতে, ওদের আসার সময়ের আগে থেকেই সিস্টার ঘরের একপাশে দাঁড় করানো ভাঙ্গা কাঠের আলমারির ভিতরে ঢুকে বসেছিল । আদরের বহর দেখে রাগে অন্ধ হয়ে আগে পাওলোকে মেরেছে, পরে অন্ধকারে মারিয়াকে। কিছুতেই আর সহ্য হয়নি ওর ।কিন্তু এখন নাকি পাওলোর জন্য খুউব কষ্ট হচ্ছে।

আমি ঐ কনফেশানবক্সে দাঁড়িয়েই তক্ষুনি বলে দিয়েছিলাম, ঘাড় ধরে চার্চ থেকে বের করে দেব।

অনেক দিন তক্কে তক্কে থেকেছি। পাওলোর বিয়ের দিন থেকেই দেখেছি, ওর নজর একেবারে আঠার মত চিপকে আছে ছোকরার গায়ে। মাদার সুপিরিয়র যতই দয়া পরবশ হয়ে চার্চে নিয়েনিন; কি ফ্যামিলির মাল সেতো দেখতে হবে।এদের ভিতর ধম্ম ঢোকানো হোলি মাদারের ও কম্ম নয়, হ্যাঃ

আর তখনই ত—”

তীব্র তীক্ষ্ণ কন্ঠ ক্রমশ উপরে উঠতে থাকে।

“— তখনই ত ঐ ধারালো স্কুয়ারিং এর তারটা দিয়ে কনফেশান বক্সের মধ্যেই আমায়ও এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে চলে গেল, দ্যাট কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার। অলটারের গলানো মোম , ধুপের ছাই পরিস্কার করতে ব্যবহার হয় ও তার।শক্ত তামার তৈরি। ওইটেকেই ধার দিয়ে মারাত্মক করে তুলেছে শয়তান কেউ টের পেলো না।

অথচ তারপর কত কত বছর চার্চের সবাই জানল ও ভারি ভক্তিমতী সন্ন্যাসিনী। চোখ নামিয়ে কেবল পুজোর কাজই করে চলে।কি সংযম, কি ভক্তি।

কেউ টের পেল না। ইস, কেউ না, কেউ না।

আ ব্লাসফেমী ইউ নো? আ শিয়ার ব্লাশফেমী…”

নিষ্ফল আক্রোশে উচ্চারিত শব্দের মধ্যেই একটু একটু করে মুছে যাচ্ছিলেন ক্ষমাহীন ফাদার। ক্রমশ আবছা হয়ে আসছিল তাঁর অবয়ব। ইরেজারে মোছা পেন্সিল স্কেচের মত মুছে যাচ্ছিল হাত পা , রোব, কাঁচাপাকা চুল দাড়ি ।

ঘণ্টার আওয়াজ আসছিল চার্চের ভিতর থেকে। সেখানে সোনায় মোড়া অল্টারের ওপরে নির্মম পেরেকবিদ্ধ যীশুর হৃদপিণ্ড থেকে কেবলই গড়িয়ে পড়ে কাঁটার মুকুটে গিঁথে থাকা যন্ত্রনা। ভালবাসার পাপ। অনুশোচনার গলতে থাকা মোম ।

ক্রশের সাইন আঁকতে আঁকতে দৌড়ে বাইরের রোদে এসে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামতে থাকল সঞ্চারী।

“ওহ যিশাস!”

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

স্টাফ রিপোর্টার :: ‘ভালোবাসি বলবো তোকে/ দিন যায় বলি বলি করে’ এমন ...