‘নৌকা’ না পেয়ে স্বতন্ত্র তিন শতাধিক

2848_f4আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন ও ‘নৌকা’ প্রতীক না পেয়ে বিদ্রোহী হয়েছেন অসংখ্য প্রার্থী। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়া ইউপি নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তারা। দলীয় সূত্র, প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ২২শে মার্চ সারা দেশে অনুষ্ঠেয় ৭৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের জন্য সোমবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। প্রার্থীদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের নেতা যেমন আছেন, তেমনি সমর্থক পরিচয়েও অনেকে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। এদের বেশ কজনের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, দল যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদের চেয়ে তারা যথেষ্ট যোগ্য, নিজ নিজ এলাকায় জনপ্রিয়। অনেকেই বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তারা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের অভিযোগ, জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় নেননি মনোনয়নে সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণে তারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্রোহীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও কেন্দ্রের নেতাদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। তাদের আশঙ্কা দল মনোনীত প্রার্থীর বিজয়ের ক্ষেত্রে তারা ফ্যাক্টর হতে পারেন। একই সঙ্গে তৃণমূলে কোন্দল ও সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন দলের তৃণমূল নেতারা। যদিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও দায়িত্বশীল নেতারা বিদ্রোহীদের এমন তৎপরতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, বিদ্রোহীরা দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বিজয়ে বাধা হতে পারবেন না। পাশাপাশি যারাই বিদ্রোহী হবেন তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কারাদেশসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
আগামী ২২শে মার্চ প্রথম ধাপে সারা দেশের ৭৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আইনে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীক ও পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের হয়ে যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে তাদের নাম প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড। ৭৩৯ জনের নাম প্রকাশের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যানসহ কাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন না পাওয়ায় অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা নিজ এলাকার দলীয় কার্যালয় ঘেরাও, সড়ক অবরোধসহ সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। সোমবার মনোনয়নপপত্র দাখিলের শেষদিনে বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র দাখিলের পর পরই ঘরোয়াভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। মঙ্গলবার সারা দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলার বেশ কজন বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতাদের চোখ রাঙানির পরেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। দলের তরফে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিকেও পাত্তা দিচ্ছেন না অনেক বিদ্রোহী।
বাগেরহাটের ৯ উপজেলার ৭৪টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে সরকারি দলের স্থানীয় নেতা ও সমর্থক পরিচয়ে ৩১ বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে কচুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সাত বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রত্যয়নপত্র পেয়েছেন পঙ্কজ কান্তি অধিকারী। তবে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, তিনি বিলুপ্ত হওয়া মঘিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এ কারণে এ ইউনিয়নে বিদ্রোহী হয়েছেন অ্যাডভোকেট বরুণ কুমার শিকদার। মানবজমিনকে তিনি বলেন, পঙ্কজ অধিকারী দুবছর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও তিনি কটাক্ষ করেছেন। সেই লোক কীভাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র পান? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে আমি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবো।
কিশোরগঞ্জের ১১টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে অন্তত ২০ জনের মতো প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে ২ থেকে ৪ জন বিদ্রোহী প্রার্থী সোমবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ইতিমধ্যে তারা নির্বাচনী মাঠে অনানুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায়ও নেমে পড়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র রশিদাবাদ ইউনিয়ন ছাড়া বাকি ১০টিতে বর্তমান চেয়ারম্যানরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের অভিযোগ বর্ধিত সভা ও আলাপ-আলোচনা ছাড়াই কিছু ইউনিয়নে প্রার্থীর নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন তারা। যে কারণে দলের শীর্ষ নেতাদের হুমকি-ধমকিকে উপেক্ষা করেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন প্রার্থীদের অনেকেই। কিশোরগঞ্জ জেলার বিন্নাটী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আজহারুল ইসলাম বাবুল। এ ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য। দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনিও। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত নৌকা প্রতীক না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন শফিকুল ইসলাম। জানতে চাইলে মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমি ১৪ বছর ধরে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দলের প্রতিও অনুগত। কিন্তু কারও সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করেই তাকে (আজহারুল ইসলাম বাবুল) মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এখন দল যেটা ভালো মনে করেছে সেটি করেছে। তবে, জনগণ আমার সঙ্গে আছে আমি নির্বাচনে লড়বো। যদি দলের তরফে আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় আমার কিছুই করার নেই।
খুলনা জেলার ৯ উপজেলার ৬৭টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি সমর্থকও রয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, ইউপি নির্বাচনে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী দল মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারেন।
ভোলা জেলার ৪৩টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে একই দলের স্থানীয় নেতা ও সমর্থক অন্তত ৭০ জনের বেশি প্রার্থী নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ভোলা সদরের ১০টি ইউনিয়নে অন্তত ১৫ প্রার্থী নিজ দলের প্রার্থীর বিপরীতে নির্বাচনে লড়তে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা যেমন আছেন, তেমনি আওয়ামী লীগের সমর্থকসহ প্রভাবশালী নেতাদের আত্মীয়রাও রয়েছেন।
সাতক্ষীরা জেলার সাত উপজেলার ৭৭টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ও সমর্থক অন্তত ১০০ জনের বেশি প্রার্থী আসন্ন ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে জেলার কলারোয়া উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ও সমর্থক অন্তত ২০ প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা দল সমর্থিত প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে সংশয়ে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, একই ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থী থাকলে কিছুটা সমস্যা তো হবেই। তবে, যারা নির্বাচনে লড়বেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তাদের অনেকেই স্থানীয় পর্যায়ের নেতা নন, সমর্থক। আর যারা নেতা তাদের প্রথমে অনুরোধপত্র ও তা না মানলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর যারা শুধু সমর্থক তাদের বুঝিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের চেষ্টা করা হবে।
এদিকে বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আমি আশা করি বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবেন। তারা নির্বাচনী মাঠে থাকবেন না। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন মানবজমিনকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীরা তেমন ফ্যাক্টর হবেন না। পৌরসভা নির্বাচনেও বিদ্রোহীদের বিষয়ে অনেক কিছু শোনা গিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে অনেকেই যেমন শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, তেমনি মাত্র কয়েকজন প্রার্থী জিততে পেরেছেন। তাই তারা তেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে হয় না। এর পরও যদি কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার চেষ্টা করেন তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার :: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর উপজেলার শিবনগর গ্রামে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি ...