নিজের ক্ষুদ্রতা নিয়েই দেশটাকে ভালোবাসি

সেবিকা দেবনাথসেবিকা দেবনাথ :: শৈশবের স্মৃতিগুলোই বোধ হয় মানুষের মনে থাকে বেশি। তাই ছোটবেলার ঘটনা দিয়েই লেখাটা শুরু করছি। আমরা তখন নরসিংদীতে। স্কুল থেকে প্রভাত ফেরি করে শহীদ মিনারে যেতাম ফুল দিতে। ৬টার মধ্যে স্কুলে থাকতে হতো। যে আমাকে টেনে হিচড়ে ঘুম থেকে উঠাতে হতো সেই আমি ২১ ফেব্রুয়ারি কাকডাকা ভোরে উঠে যেতাম।

একটুও কষ্ট হতো না। মা আমাকে আর বড়দিকে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিতেন। ধোয়া আর ইস্ত্রি করা স্কুল ড্রেস, সাদা-কালো ফিতা দিয়ে চুলে দুই বেণী, আগের দিন ধুয়ে চক ঘষে ধবধবে করে রাখা সাদা কাপড়ের ক্যাডস পড়িয়ে মা আমাদের দুই বোনকে স্কুলে পাঠাতো। বড়দি যেতো শান্ত ভাবে রাস্তার একধার ধরে। আর আমি যেতাম টাট্টু ঘোড়ার মতো লাফিয়ে। বড়দির গানের গলা অসম্ভব ভালো ছিলো। (ছিলো এজন্য বলছি চর্চার অভাবে যা হয় আরকি)।

প্রভাত ফেরিতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে যে ক’য়জন লিড দিতো বড়দি ছিলো তাদের মধ্যে একজন। সাড়ি বদ্ধ হয়ে সবাই হাটতাম। এতটুকু ক্লান্তি বোধও হয়নি কখনও। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আসার সময় যে ফুলটা বেশি ভালো লাগতো তা টুক করে হাতে তুলে নিয়ে আসতাম। এ নিয়ে মা পড়ে বকতো। মারও খেয়েছি।

তখন আমরা ঘোড়াশালে। বাসায় পত্রিকা রাখা হতো। একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন পত্রিকার পাতা থেকে শহীদ মিনারের ছবি কাটা হতো। পরে তা আঠা দিয়ে লাগানো হতো ঘরের দেয়ালে। শক্ত কাগজ দিয়েও বড়দি আর আমি মিলে অনেক সময় শহীদ মিনার বানাতাম। বানানো শহীদ মিনার রাখতাম কাঠের ওয়াড্রবের ওপর। বিকেলে বেলায় ফুল নিয়ে আসতাম বাসায়। বিভিন্ন আকারের ছোট্ট সোলার উপর কাঠি দিয়ে ফুল বসাতাম। মালা গাঁথতাম। তোড়াও বানাতাম। কালো কাপড় কেটে ব্যাজ বানাতাম।

অন্য সময় ঘুমে চোখ বুজে আসলেও ২০ ফেব্রুয়ারি যেন ছিলো একেবারেই আলাদ। ঘড়ির কাটা রাত ১১টা পার করলেই যেন অস্থিরতা বাড়তো। টেবিল ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখতাম। ১২টা বাজার কয়েক মিনিট আগে ঘরের দেয়ালে আটকানো শহীদ মিনারের সামনে ফুল নিয়ে আমরা সব ভাই বোন দাঁড়িয়ে যেতাম। বড়দি গান ধরতো, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’ আমরা গলা মেলাতাম। ঘড়ির এলার্ম বেজে উঠতেই আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিতাম। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

একসময় আমি ইডেনের ছাত্রী। হলের মেয়েদের নিয়ে হলের প্রভোস্ট ও শিক্ষকরা কলেজের শহীদ মিনারে ফুল দিতে যান। ফুল দিতে হবে তাই রাতে হলের মাঠে বান্ধবীরা মিলে আড্ডা দিতাম। সময় মতো হলের প্রভোস্ট ডাক দিতেন। হাজির হতাম। ফুল দিতাম শহীদ মিনারে।

পর্বর্তীতে আমি যখন বাংলাদেশ সময়ে কাজ করতাম তখন থাকতাম আজিমপুর। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হলো। বলা হলো রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি থাকবে আর ভোরে যেনো আমি শহীদ মিনারে চলে যাই। ভোরেই হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু শহীদ মিনারে ফুল দেয়া হয়নি।

প্রতিবার ঘরোয়া আয়োজন হলেওতো ফুল দিয়ে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসেও শ্রদ্ধা জানাতে না পারায় সেদিন কষ্ট পেয়ে খুব কেঁদেছি। এখন আর শহীদ মিনারে ফুল দেয়া হয় না। টিভির পর্দায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন দেখি। ঠাকুরের কাছে প্রণাম করে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করি। সবার সুখ কামনা করি।

আমার মধ্যে দেশপ্রেম আছে কী না জানি না! কিন্তু যখন কেউ আমার দেশ তুলে গালি দেয়, দেশকে হেয় করে, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কটাক্ষ করে সত্যি বলছি ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হয়। জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ কিংবা প্রভাত ফেরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গান দু’টি শুনলে কেন জানি না চোখের জল অবাধ্য হয়। দেশের প্রয়োজনে জীবন দিতে পারবো কি না জানি না! আমার ক্ষুদ্রতা নিয়েই আমি দেশটাকে ভালোবাসি। আমি আমার মতো করেই বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

 

লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদ।

ইমেইল: sebikadebnath@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আজ পবিত্র আশুরা

ডেস্ক নিউজ ::  পবিত্র আশুরা আজ। আরবী শব্দ আশরুন তথা দশ শব্দটি ...