ব্রেকিং নিউজ

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কি ক্ষমতায়ন সম্ভব?

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কি নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব?নূসরাত ইমা :: সারা বিশ্বে গত কয়েক দশক ধরে মানব উন্নয়নের একটি চলমান ধারা তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসার দাবীদার। এই উন্নয়নের ধারায় যে বিষয়টি বার বার গুরুত্ব পেয়েছে চর্চিত হয়েছে সেটা হল- নারীর ক্ষমতায়ন। বছরে আমাদের দেশেই নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নুনতম অর্ধশত সভা, গোল টেবিল বৈঠক, সেমিনার, টক শো হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল যে দেশে নারীর নিরাপত্তাই নেই, যে দেশে নারীকে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়, যে দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্ম স্থলে, রাস্তায়, যানবাহনে এমনকি নিজের ঘরেও নারী প্রতিনিয়ত নিগ্রহ, নির্যাতন, হয়রানীর স্বীকার হতে হয়। সে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বলে চিৎকার করে আর সভা সেমিনার করে কি সত্যিই কোন লাভ আছে ?

নারীকে যদি নিরাপত্তাই দিতে না পারি। নারীকে যদি পদে পদে ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই চলতে হয় তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কি করে হবে? আমারা সবক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছি। আমারা হেন করেছি আমারা তেন করেছি বলে-বলে গলা ফাটালে কি নারী নিরাপদ হয়ে যাবে? সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন বাড়ালেই কি নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে যায়? নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কি নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব?

খুব সাম্প্রতিক একটা ঘটনা হল কুড়ির বিশ্বরোডে কর্মস্থল থেকে ফিরার পথে এক তরুণীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা। মেয়েটা সাহস নিয়ে মামলা করতে গেলো অথচ তাকে এই মামালা করতে গিয়ে চরম হয়রানী হতে হল। একের পর এক থানা ঘুরেছে কিন্তু পুলিশ মামলা নিচ্ছিলনা নানা অজুহাতে। শেষ পর্যন্ত যে মেয়েটি মামালা করতে পেরেছে তারজন্য ওকে আমি স্যালুট জানই। কিন্তু এই শেষ নয়, এই মামলা নিয়ে তাকে যে আরও কত ভগান্তি পোহাতে হবে, আমাদের প্রশাসন যে তাকে আর কত হয়রানী করবে, তার কথা ভেবেই আতঙ্ক বোধ করছি।

সবচে বাজে যে ব্যপার হল একটা মেয়ে ধর্ষিত হলে তার নামে নানান আজেবাজে কথা ছড়ানো হয়। তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তার পোশাকের দোষ ধরা হয়, আর কত কি। শুধু হয়রানি এবং লোক লজ্জার ভয়ে অনেক মেয়ে এখনো মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করে। অনেকে দিনের পর দিন ধর্ষিত হয়। যে দেশে মনে করা হয় যে মেয়েটা ধর্ষিত হল সব দোষ তার। সে নষ্ট মেয়ে সে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন একটা কপটতা ছাড়া আরা কিছু না।

যে দেশে শিক্ষকের কাছে ছাত্রী নিরাপদ নয়। যে দেশে শুধু স্কুলের ব্যবসায় যেন ক্ষতি না হয় তার জন্য ধর্ষক শিক্ষক কে কর্তৃপক্ষ সমর্থন করে ঘটনা ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করে, সে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন কি করে হবে? একজন নারী হিসেবে আমি আতঙ্কবোধ করি। কেন আমরা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় বার বার বলে দিতে হবে সে যেন একা ক্লাসরুমে না থাকে। কেন আমরা আর শিক্ষকের উপর নির্ভর করতে পারব না? যে শিশু ছোট বেলা থেকে শুনে বড় হয় কখনো একা থাকবে না। একা কোথাও যাবে না। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফেরো। সে যখন বড় হয়, তখন সে কিছুতেই আর একা চলার সাহস পায় না। ছোট বেলাতেই তার মনে যে ভয় তৈরি হয় তা থেকে খুব কম মেয়েই বেরুতে পারে। তাহলে এই ভয় নিয়ে কি করে নারীর ক্ষমতায়ন হবে?

এই যে পহেলা বৈশাখে টি.এস.সি তে যে ঘটনা ঘটলো। তার কি কোন সুরাহা হয়েছে? এক জনকেও কি শাস্তি দেয়া হয়েছে? শাস্তি তো দূরে থাক আমাদের পুলিশ প্রশাসন তো সি.সি. টিভি ফুটেজ খুঁজেই পেলো না । বলেই দিল তেমন কিছু ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং সংবাদ মাধ্যমের চাপে তারা ১ মাস পরে কিছু ঝাপসা ছবি প্রকাশ করে বলল এদের ধরিয়ে দিলে লাখ টাকা পুরস্কার। সবচে হাস্যকর ব্যপার হল- এদের ঘটনার দিনই জনতা ধরিয়ে দিয়েছিল কিন্তু কোন এক যাদুবলে তার সে দিন ই ছাড়া পেয়ে যায়।

সবচে দুঃখজনক হলো- পহেলা বৈশাখের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো প্রতিবাদকারিদের উপর পুলিশ হামলা করে। যেখানে নারীদের গায়ে হাত তুলতে, তাদের বুট দিয়ে লাথি মারতেও আমাদের পুলিশ পিছ পা হয়নি। যে দেশে পুলিশ প্রশাসন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যাকে জনগণের বন্ধু আখ্যা দেয়া হয়, তারই নারীর নিরাপত্তা না দিয়ে ধর্ষক, নির্যাতনকারি, নিগ্রহকারিদের নিরাপত্তা দেয়ার কাজ করে, সে দেশে নারী কখনই নিরাপদ নয় এবং নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

একটা দেশ কতটা সভ্য তা বুঝা যায়, সে দেশে নারীরা কতটা নিরাপদ তা দেখে। নারী প্রয়োজনে যখন খুশি বাইরে যাবে তাকে এই আতঙ্কে থাকতে হবে না যে আমি যে রাতে একা বেরুচ্ছি আমি আবার সুস্থ ভাবে সম্মানের সাথে বাড়ি ফিরতে পারব তো। নারী তার রুচি পছন্দমত পোশাক পরবে, যেমনটা পুরুষ করে। নারী তার ইচ্ছায় হিজাব করবে, তার ইচ্ছায় পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরবে, তার জন্য তাকে হাজার বার ভাবতে হবে না, যে বাইরে বেরুলে তাকে হ্যারাস হতে হবে কিনা।

এই দেশে সভ্যতার মুখোশ ধারি, অনেক ডিগ্রিধারি, মুখে প্রগতিশীলতার বুলি আওড়ান অনেক কে দেখেছি কোন নারী হ্যারাস হলে তার পোশাক, তার চলা, তার কথা বলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করে দোষটা নারীরই। সে কেন এমন করে পোশাক পরল, সে কেন এমন করে কথা বলে, সে কেন এমন করে তাকায়। পুরুষ তো পুরুষই তাদের কি দোষ? আমার কথা হল একটা পুরুষ যখন নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় নারীরা কি গিয়ে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে? তবে পুরুষ কেন নিজেকে পশুরও অধম পর্যায়ে নামিয়ে ফেলে? এটায় যে তাদের লজ্জা, এটায় যে তাদের সো-কল্ড পৌরুষের অপমান সেটা যদি সে বুঝতে পারে তাহলে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে এত ভাবনার দরকারই হয় না।

ছোট বেলা থেকে ছেলেদের একটা কথা শেখানো হয়, ছেলেদের কাঁদতে নেই। তাদের যদি ছোট বেলা থেকে এটা শিখানো হয়, ছেলেদের কাঁদতে নেই, আর কাঁদাতেও নেই। ছেলেদের উচিত মেয়েদের সম্মান করা। সম্মান করলে সম্মান পাওয়া যায়। ছোট বেলা থেকেই যদি পরিবার থেকেই ছেলে মেয়েরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে, আলাদা না ভেবে নিজেদের সহযোগী ভাবতে শিখে। একে অপর কে সম্মান করতে শিখে, তাহলে নারীর নিরাপত্তা আপনাতেই নিশ্চিত হবে, তখন নারীর ক্ষমতায়নের পথও সুগম হবে। কর্মস্থল থেকে ফিরতে গিয়ে, বাসে, রাস্তায় আর কোন বোন কে নির্যাতিত হতে হবে না। নারীর নিরাপত্তার ব্যপারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রক্ষকের ভূমিকা পালন কতেই হবে। যতদিন তা না হয় ততদিন নারীর নিরাপত্তা সম্ভব হবে না। আর নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কাগজে কলমে নারীর ক্ষমতায়ন হবে কিন্তু বাস্তবে সম্ভব হবে না।

লেখক: haider_nusrat@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

"রামগতি তোমায় ভালোবাসি"

‘রামগতি তোমায় ভালোবাসি’

সুলতান মাহমুদ আরিফ :: ভালোবাসা আর ভালোলাগার প্রিয় জায়গা রামগতির ভালোবাসাময় প্রিয় ...