নাতির হাতে নানী খুন

পালিত নাতী ফয়সালের হাতেই খুন হলেন- ঠাকুরগাঁও শহরের আশ্রমপাড়া মহলার আইনজীবী বদিউজ্জামান বাদল চৌধুরীর স্ত্রী পিটিআইয়ের প্রাক্তন সুপারিনটেনডেন্ট উম্মে কুলসুম (৬০)। কম্পিউটার কিনে দোকান দেবে, আর সেই কম্পিউটারের টাকা যোগাতেই রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় উম্মে কুলসুমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ফয়সাল। ঘরে থাকা ১৪হাজার ২০২ টাকা নিয়ে উধাও হয়। সোমবার সারাদিন জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে এমন তথ্য দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে সে।

ফয়সাল সদর উপজেলার ছোট বালিয়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে ।

সদর থানার ওসি গোপাল চক্রবর্তী জানান, শনিবার দুপুরে বাড়ি থেকে এসে বিকেলে শহরের গোয়াল পাড়ায় মাসুম ম্যাচে ওঠে ফয়সাল। সন্ধ্যায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ওই আইনজীবীর বাড়ির ছাদে ওঠে।  রাত ৯টায় কৌশলে সে ছাদ থেকে ঘরে ঢুকে পড়ে। এর পর ওই বাড়ির একটি কক্ষের খাটের নিচে রাত কাটায়। অন্যান্য দিনের মতো বাদল চেীধুরী সকালের নাস্তা সেরে আদালতপাড়ায় যান। স্ত্রীকে পেনশনের টাকা তোলার জন্য সকাল ১০টায় স্থানীয় সোনালী ব্যাংকের শাখায় আসতে বলেন তিনি। উম্মে কুলসুমও ব্যাংকে আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বের হবেন। এমন সময় ফয়সাল খাটের নিচ থেকে বের হয়ে পেছন থেকে লেপের কভার দিয়ে গৃহকর্ত্রী কুলসুমের গলায় ফাঁস লাগিয়ে দেন। এর পর তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে রশি দিয়ে তার হাতপা বেঁধে বেলন দিয়ে কপালে আঘাত করে। তারপর  ফয়সাল চাবি নিয়ে আলমারী থেকে ১৪ হাজার ২শ ২টাকা নিয়ে নেয়। কিন্তু বাহির থেকে দরজা লাগানোর কারনে বের হতে পানেনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর জানালা দিয়ে অপরিচিত এক মহিলাকে খালা সম্বোধন করে ডেকে নেয়। তাকে বাহির পাশের দরজা খুলে দেয়ার অনুরোধ জানায়। অপরিচিত ওই মহিলা এসে দরজাটি খুলে দিয়ে চলে যায়। এই সুযোগ পেয়ে ফয়সাল টাকা নিয়ে সটকে পড়ে।

এদিকে অপেক্ষায় থাকা স্বামী বা্‌দল চৌধুরী স্ত্রীকে অসংখ্য বার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সাড়া না পেয়ে অবশেষে বাড়ি ফেরেন। তিনি ঘরে ঢুকে দেখেন তার স্ত্রী ডাইনিং এর টেবিলের নিচে মুমুর্ষ অবস্থায় পড়ে আছেন। পরে তাকে সদর আধুনিক হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষনা করেন। এ ঘটনার পর শংকিত হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। দানা বাঁধতে থাকে পুরো বিষয়টি। পুলিশের সন্দেহের তীর পালিত নাতী ফয়সালের দিকে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ফয়সালের বাড়ি ছোট বালিয়ায় হানা দেয় পুলিশ। সেখনে ফয়সালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে লুটে নেয়া টাকার সন্ধান পায়। সেই টাকা উদ্ধার করে তার বাড়ির রান্না ঘরের এককোনে মাটির নিচ থেকে। এর পর একে একে হত্যার রহস্যের জট খুলতে থাকে। নির্দিধায় হত্যার দায় স্বীকার করে সে। ওই ঘটনায় পুলিশ ফয়সালের মা ফুলু বেগম(৩২)সহ ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে । পরে ফয়সালকে রেখে অন্যদের ছেড়ে দেয়া হয়। সোমবার সারা দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিকেল ৪টায় কোর্টে তাকে হাজির করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টায় চীফজুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট জুলফিকার আলী খানের আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেখানে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে সে অপরাধ স্বীকার করে।

এদিকে সকাল থেকে ওই ঘটনার মুল হোতা ফয়সাল গ্রেফতার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। সকাল থেকে সংবাদকর্মীরা থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন অফিসে গিয়েও কোন তথ্য পায়নি। দিনভর নাটকীয়তার পর রাত সাড়ে ৮টায় সদর থানার গোলচত্বরে ফয়সালকে সাংবাদিকদের মুখোমুখী করে পুলিশ। ফয়সাল নারকীয় এই হত্যা কান্ডের বর্ননা অকপটে স্বীকার করে। ফয়সাল বলে,কম্পিউটার কেনার উদ্দেশ্যেই এ হত্যাকান্ড। তবে প্রথমে এমনটা হবে তা ভাবিনি।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার শাহ আলম বলেন, হত্যাকান্ড ঘটার পর পুলিশের কয়েকটি টিম মাঠে নেমে যায়। সন্দেহের তীর যে দিকেই গেছে সেখানেই পুলিশ কাজ করেছে। ফয়সালকে সনাক্ত করে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করায় মামলা আর বিস্তৃত হয়নি। ১৬৪ ধারায় জবান বন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করায় মামলা পরিচালনায় সহজ হয়েছে। এছাড়াও ১৪ হাজার ২০২ টাকা,লেপের কভার, বেলন, হেডফোন,রশি ও ফয়সালের মায়ের নামে একাউন্ট করা পুবালী ব্যাংকের টাকা জমার রশিদ বই উদ্ধার করা হয়েছে।  তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যেহেতু অপরাধী জাবানবন্দিতে একাই ঘটনার সাথে জড়িত জানিয়েছে সেহেতেু এখন পর্যন্ত আর কেউ এই মামলায় আসামী হিসেবে দেখানো হয়নি।

সাংবাদিকদের সাথে ফয়সালের মুখোমুখী করার সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সার্কেল মোশাররফ হোসেন,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সার্কেল সদর এটিএম শাহিন, ওসি গোপাল চক্রবর্তী উপস্থি ছিলেন।

জানা গেছে, সিনিয়র আইনজীবী বদিউজ্জামানের ৩ মেয়ে। তার কোন ছেলে সন্তান নেই । গ্রামের বাড়ির আবু হানিফের স্ত্রী ফুলু বেগম ওই বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করতো। ফুলুর ছেলে ফয়সালে সাথে  পরিবারটির নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় আইনজীবীর পরিবার ফয়সালকে নাতীর আসনে জায়গা দেন। লেখাপড়ায় ভাল হওয়ায় বাদল চৌধুরীর স্ত্রী শহরের রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি করে দেন। সে এবার জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতীত্বের সাথে নবম শ্রেনীতে উঠেছে। কিন্তু ধনসম্পদের মালিক হওয়ার স্বপ্ন তাকে বিপদগামী করে তোলে। গত রোজার ঈদে ফয়সাল ওই বাড়ি থেকে স্বর্ণের চেইন ও ৪২ হাজার টাকা চুরি করে। ওই টাকা দিয়ে সে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন কেনে। এ সব দেখে ওই পরিবারটি তাকে সন্দেহ করে। পরে তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা,স্বর্নের চেইনটি ও ওই টাকায় কেনা একটি মোবাইল সেটও ফেরত পায়। এ ঘটনার পর তাকে ওই বাড়িতে আর রাখা হয়নি। কিন্তু এর পরেও শেষ রক্ষায় পেলনা উম্মে কুলসুম।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/তানিয়া সরকার/ঠাকুরগাঁও

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আইনি পথে খালেদা জিয়ার মুক্তি ভুলে যান: মওদুদ

ষ্টাফ রিপোর্টার :: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দলের নেতা-কর্মীদের ...