নাগরিক সুবিধা দিতে এত সংস্থা থাকবে কেন?: আইআরসির সিইও প্যাট্রিক মরিয়ার্টি

CEO of IRC Patrick Moriartyআরিফুর রহমান :: ঢাকায় বসবাসরত প্রায় দুই কোটি মানুষের নাগরিক সেবা নিশ্চিতে একটি অথবা সর্বোচ্চ দুটি সংস্থা দায়িত্ব পালন করতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন নেদারল্যান্ডসের বেসরকারি সংস্থা আইআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্যাট্রিক মরিয়ার্টি। গত ৩ থেকে ৫ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক সম্মেলনে যোগ দিতে এসে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজ দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, আমাস্টারডামে নাগরিক সেবা দেওয়ার দায়িত্বে আছে দুই একটি সংস্থা। তোমাদের ঢাকায় নাগরিক সেবা দিতে কাজ করছে ৫৪টি’র সংস্থা। একসঙ্গে এতগুলো সংস্থা কাজ করতে গেলে তো সমন্বয়হীনতা দেখা দেবেই। দেখা দেবে জটিলতা। নাগরিক সেবা দিতে এত সংস্থা থাকবে কেন। এই সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারলে নাগরিক সেবা দেওয়া সহজ হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করা সম্ভব হবে।

ঢাকায় বসবাসরত দুই কোটি মানুষের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব এমন প্রশ্নে প্যাট্রিক মরিয়ার্টি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, দুই কোটি মানুষকে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে দক্ষ সংগঠন, ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো পানি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়তই এখানে মানুষ আসছে। বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। তাই পানির সমস্যা সমাধানে একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। সংগঠনটিকে হতে হবে দক্ষ। জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। যেটা নেদারল্যান্ডস সরকার করে দেখিয়েছে। তবে কিছুটা সময় লেগেছে।

তাঁর মতে, নাগরিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সুশাসন। এগুলো নিশ্চিত না হলে কোনো কাজই টেকসই হয় না।

আইআরসির সিইও পেট্রিক মরিয়ার্টি মনে করেন, জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি (২০১৬-৩০) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জন বাংলাদেশের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জই হবে। বিশেষ করে এসডিজির ছয় নম্বর অভিষ্ঠ্য সবার জন্য নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

তাঁর মতে, ২০০০ থেকে ২০১৫ এই সময়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি ছিল মৌলিক। অর্থ্যাৎ সেখানে শুধু লক্ষ্য অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন’ এসডিজিতে জোর দেওয়া হয়েছে গুণগত মানের ওপরে। এজন্য অভিষ্ঠ্যগুলো বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জ হবে।

প্যাট্রিক মরিয়ার্টি বলেন, এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। পানির প্রাপ্যতা বেড়েছে। উন্মুক্ত স্থানে মলমুত্র ত্যাগের হার অনেক কমেছে। তবে নিরাপদ পানি এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। শতভাগ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তোমাদের উপকূলীয় এলাকায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। তাদের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততার হার বাড়ছে প্রতিনিয়তই। প্রতিবছরই বন্যা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। তাই এখানে পানির গুণগত মান নিশ্চিত করা, সবার জন্য পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

প্যাট্রিক মরিয়ার্টি বলেছেন, তোমাদের সঙ্গে আমাদের একটা জায়গায় বেশ মিল; আর তা হলো উভয় দেশ বদ্বীপ। ১৯৫৩ সালে আমাদের দেশে এক ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এরপর আমাদের সরকার দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে যার নাম দেওয়া হয় ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা। আমাদের শিফল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সমুদ্রসীমার চার মিটার নিচে। আমাদের এক তৃতীয়াংশ এলাকা সমুদ্রসীমার নিচে। সে হিসেবে সব তলিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে, নদীর নাব্যতা রক্ষা করে এবং পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির সুরক্ষা করে আমরা আজ সফল। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অসংখ্য ড্যাম ও ডাইক দিয়ে বেঁধে জমিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডেসরই রয়েছে অভিজ্ঞতা। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের প্রায় শতবছর সময় লেগেছে। এতে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা ছিল।

CEO of IRC Patrick Moriartyতিনি বলেন, নেদারল্যান্ডসের গণতন্ত্র একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। সে কারণে সরকার যেকোনো পরিকল্পনা নেওয়ার পর সাধারণ জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে। বদ্বীপ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। দিনের পর দিন জনগণের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদেরকে বোঝানো হয়েছে ভালো দিকটা। তারপর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে তোমাদের সরকারও একশ বছর মেয়াদি একটি ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বন্যা প্রতিরোধ, পানি ব্যবস্থাপনা ও নদীর নাব্যতা রক্ষা করে তোমাদের দেশও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। আশা করি, বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ সফল হবে।

প্যাট্রিক মরিয়ার্টি মনে করেন, বাংলাদেশে ভূ-গর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি ব্যবহারে একটি শক্ত ব্যবস্থাপনা ও কৌশলপত্র থাকা জরুরি। মনে হচ্ছে সেটা এখন নেই। ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এমনও শুনা যাচ্ছে কোথাও কোথাও দশ মিটার পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর। তোমাদের দেশে উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কমাতে হবে ভূগর্ভস’ পানির ব্যবহার। এটি নিশ্চিত করতে হলে দরকার একটি শক্ত ব্যবস্থাপনা ও কৌশল। তোমাদের নদীর পানি ব্যবহার বাড়াতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই কেবল ভূগর্ভস’ পানির ব্যবহারের ওপর চাপ কমবে।

আন্তঃদেশীয় নদীর প্রসঙ্গে প্যাট্রিক মরিয়ার্টি নিজ দেশের রাইন নদীর কথা উল্লেখ করে বলেন, রাইন নদী জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। রাইন নদীও আন্তঃদেশীয় নদী। দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছি। তোমাদের ৫৭টি আন্তঃদেশিয় নদী আছে। এরমধ্যে ৫৪টি ভারতের সঙ্গে তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে। আন্তঃদেশিয় নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে ওই দেশের সরকারের সঙ্গে বসতে হবে। নিজ দেশে কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, একদিনে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সময় লাগবে। তবে সেজন্য টাকাও খরচ করতে হবে।

প্যাট্রিক মরিয়ার্টি মনে করেন, অনেক সময় সরকারের একার পক্ষে সব কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সে কারণে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এসডব্লিউএ প্রতিনিধি মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান ডরপ এর মাধ্যমে এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। সরকারের যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। এতে করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই সঙ্গে সেটা টেকসই হবে।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে

কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আদিবাসীদের উন্নয়নে জাতীয় নীতিমালার বাস্তবায়ন শীর্ষক প্রশিক্ষণ

রাজশাহী :: কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১৪ ও ১৫ নভেম্বর “আদিবাসী উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট জাতীয় ...