নওগাঁর চামড়া ব্যবসায়ীদের নানান সমস্যা, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ফরিয়ারা

কোরবাণী ঈদে বড় রকমের ব্যবসা করার জন্য চামড়া ব্যবসায়ীদের অপেক্ষা সারাবছর। কিন্তু নওগাঁয় এই ব্যবসার সাথে জড়িতদের রয়েছে হাজারো সমস্যা। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের নেই কোন উন্নতি। তার পরও পেটের তাগিদে তাদের করতে হয় পুরোনো এই ব্যবসা। এবার নওগাঁয় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন উদ্দোমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। ট্যানারী ও আতরদারদের কাছ থেকে গত কয়েক বছরের পাওনা টাকা এখনও পাননি অনেকে। তাই এবার তাদের একমাত্র ভরসা দাদন ব্যবসায়ী।

স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবাণী ঈদে প্রতি বছর নওগাঁ জেলা থেকে প্রায় ৫০ হাজার গরু ও ৭০ থেকে ৮০ হাজার ছাগল ও ভেড়ার চামড়া কিনেন তারা। এসব চামড়া দু’এক জন ব্যবসায়ী ছাড়া অধিকাংশ ব্যবসায়ী আড়তদারদের মাধ্যমে দেন ট্যানারী মালিকদের। কিন্তু তাদের অভিযোগ নগদ টাকায় চামড়া কিনে আড়তদার ও ট্যানারী মালিকদের কাছে বিক্রি করে সময় মত টাকা পাননা। পাওনা টাকার জন্য ঘুরতে হয় বছরের পর বছর। অনেকে বছরের পর বছর পাওনা টাকা না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছেন এই ব্যবসা। কোরবাণী ঈদ তাদের ব্যবসার একটি ভালো সময়। এর জন্য অপেক্ষা করতে হয় সারা বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঈদের ৩/৪ দিন আগে এসে পাওনা টাকা অনাদায়ী থাকায় দারস্থ হতে হয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে। এ বছর এক মাসের জন্য প্রতি লাখে ৫ হাজার টাকা হারে সুদ দিয়ে ঋণ নিতে হচ্ছে।

নওগাঁর চামড়া ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন জানান, গত ৫ বছরে তিনি ঢাকার ফাইভ স্টার, নাসির ট্যানারী, মমতাজ ট্যানারী, প্রাইমস লেদারসহ বেশ ক’টি ট্যানারী ও আড়তদারের কাছে চামড়া বিক্রি বাবদ প্রায় ১৫ লাখ টাকা পাবেন। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেছিলেন। কিন্তু সেই টাকাগুলো এখন আর আদায় করতে পারছেন না। দাদন ব্যবসায়ীদের সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়েছেন তিনি।

অপর চামড়া ব্যবসায়ী আজাহার উদ্দীন বলেন, নওগাঁ জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের মোট সদস্য ২১৮ জন। কিন্তু ট্যানারী ও আড়তদারদের কাছ থেকে বছরের পর বছর পাওনা টাকা উঠাতে না পারায় গত ৫ বছরে চামড়া ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় গেছেন দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী। অনেকেই সুদের টাকা পরিশোধ করতে ধরেছেন ব্যাটারী চালিত টমটমের হ্যান্ডেল।

এব্যাপারে নওগাঁ জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আলাউদ্দীন খাঁনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নওগাঁয় বর্তমানে যে ক’জন চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের মধ্যে দু’এক জন ছাড়া মূলধন হারিয়েছেন সবাই। তার পরও আড়তদার ও ট্যানারী মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে, অনাদায়ী টাকা হারানোর ভয়ে অনেকেই ছাড়তে পারছেন না পুরনো এই ব্যবসা। ব্যবসা করার জন্য তারা কখনও সরকারী সহায়তা পাননি। যারা মূলধন হারিয়েছেন তারা এখন আড়তদার ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাঁধ্য হচ্ছেন।

এ অবস্থায় এবার ঈদে জবাইকৃত পশুর চামড়ার বাজার ও দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে পানির দরে বিপুল পরিমাণ চামড়া গোদামজাত করে পরবর্তীতে মুনাফা লোটার উদ্দেশ্যে প্রতি বছরের মত এবারো মাঠে নেমেছে এলাকার কয়েকটি সিন্ডিকেট। পারস্পরিক বুঝাপড়ার মাধ্যমে চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে হাজার হাজার চামড়া স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে পরবর্তীতে মুনাফা লুটের কয়েক বছরের সাফল্যের ধারবাহিকতায় এ বছর ও একই টার্গেট নিয়ে ওই ব্যবসায়ীরা ওঁৎ পেতে আছে। মহাদেবপুর এলাকার ১০ টি ইউনিয়ন ছাড়াও জেলার ধামইরহাট, মান্দা, বদলগাছী, রাণীনগর, সাপাহার, নিতপুর এলাকা থেরে ওইসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কোরবানি পশুর চামড়া স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে মজুদ রাখে।  প্রতিবছর কোরবাণীর ঈদের দিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওইসব বাজারের বিস্তীর্ণ অংশে হাজার হাজার চামড়া বিক্রির জন্য স্তুপ করা হয়। এ মোক্ষম সময়কে কাজে লাগিয়ে কতিপয় চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বল্প মূল্যে এই বিপুল পরিমাণ চামড়া কিনে গোদামজাত করে রাখে ও পরে চড়া মূল্যে ঢাকা-চট্টগ্রামের ট্যানারি ও চামড়ার আড়তে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নেয়। ফলে সাধারণ জনগণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। মুখ চেনা এ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সারা বছর অন্য ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকলেও হঠাৎ করেই প্রতি বছর কোরবাণীর ঈদের সময় “লেদার মার্চেন্ট” হিসেবে আর্ভিভূত হয় এবং হাতিয়ে নেয় বিপুল মুনাফা। চলতি বছর ও আসন্ন কোরবাণীর ঈদের প্রচুর চামড়া নিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় সিন্ডিকেট বাণিজ্যের আশংকা করা হচ্ছে। কোরবাণীর ঈদের দিন বাজারে নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ চামড়া ক্রয় করার জন্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ দেশের অপরাপর এলাকার প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাজারে না এসে ফরিয়াদের মাধ্যম্যে চামড়া ক্রয় করে। ফলে এলাকার ভুক্তভোগীরা নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। সাধারণত কোরবাণীর চামড়া বিক্রিলব্ধ টাকা বিভিন্ন ধর্র্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেন কোরবাণী দাতাগণ। চামড়ার নায্য মূল্য নিশ্চিত হলে এক্ষেত্রে লাভবান হবে এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই কোরবাণীর ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলমান জমজমাট চামড়ার বেচাকেনার মোক্ষম সময়ে দেশের প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/তন্ময় ভৌমিক/নওগাঁ

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ

তারেক রহমানের ভিডিও কনফারেন্স আচরণবিধি লঙ্ঘন নয়: ইসি সচিব

স্টাফ রিপোর্টার :: বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারে লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দলটির ...