দেশ রক্ষায় ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করুন

লেখক: মোঃ সোয়েব মেজবাহউদ্দিন

 

এ কোন গনতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে আমাদের দেশ? ৩০লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান এই বিজয় দিবসে নতুন কোন যুদ্ধ চলছে ? হরতাল অবরোধে আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছে পুরুষ মহিলা ও শিশু। গনতান্ত্রিক এ দেশে কিষের জন্য এ হানাহানী চলছে। এ যুদ্ধের শেষ কবে হবে ? আর কত লাশ পরলে এ হানাহানি বন্ধ হবে ? কত লাশ দেখতে চায় বর্তমান এই রাজনীতিবিদরা।

বর্তমানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রধান দুই দলের মহিলা প্রধান নেত্রীদ্বয় একজন অন্যজনকে দোষারোপ করছে। আর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ। যারা দিন আনে দিন খায়, লাগাতার অবরোধের কারনে তাদের যে কি অবস্থা, তা ভেবে দেখার কেউ নেই। অথচ দুই নেত্রীই বলেন তারা জনগনের নেত্রী। সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিএনপি ১/১১ এর জন্ম দিয়েছিল। আজ আওয়ামী লীগ সরকারও সেই একই ভাবে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা দখলের নেশায় দেশকে যে কঠিন বিপদের দিকে ঢেলে দিচ্ছে, সে ব্যাপরে কোন খেয়ালেই নেই।

দুই নেত্রীর একই কথা, “তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ (প্রধান মন্ত্রীর চেয়ার) চাই”। আমি সব কিছু ছাড়তে পারি কিন্তু প্রধান মন্ত্রীর চেয়ারের লোভ সামলাতে পারি না। এটা আমার বাবার/স্বামীর সম্পদ। সংবিধান কি স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় কোন বস্থ ? যে কোন বিশেষ প্রয়োজনেও এর পরিবর্তন করা যাবে না। দেশের স্বার্থে দলের স্বার্থে প্রতিনিয়ত এ সংবিধান পরিবর্তন হচ্ছে।

তাহলে এখন কেন আবার পরিবর্তন করতে দেরি হচ্ছে। আওয়ামী লীগ যত চেষ্টাই করুক না কেন এক তরফা নির্বাচন কেহই মেনে নেবে না। কাহারো কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না।  তবে হ্যা, আওয়ামী লীগ সরকার যতদিন পারছে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্ঠা করছে এতেই তাদের লাভ মনে করছেন। তবে সত্য কথা হচ্ছে এই ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্ঠা সাময়িক লাভের চেয়ে পরবর্তিতে ক্ষতিই বেশী হবে।

প্রধান দুই দলের এই দুই নেত্রী দুইবার করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ১০ বছর করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাধ গ্রহন করেছেন। তাহলে আর কত ক্ষমতার লোভ থাকতে পারে ! আজ ভাবতে খুব কষ্ট হয় এই দুই নেত্রী আবার গনতন্ত্রের কথা বলেন। প্লিজ আপনারা দুই নেত্রী একটু বিশ্রাম নিন। আপনাদের দুই নেত্রীর এখন আর দেশ চালানোর মত সক্ষমতা আর নেই।

আপনাদের বিশ্রামের প্রযোজন। আপনাদের কাছে অনুরোধ নতুন প্রজন্মের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিন। দেশে গনতন্ত্রের নতুন বাতাস প্রবাহের সুযোগ দিন। আপনারা অবসর নিয়ে নিশ্চিনে- জীবন যাপন করুন। আর দেখুন নতুন প্রজন্ম কিভাবে সুন্দর করে গনতন্ত্রের নতুন রুপ দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশ আজ কঠিন সংকটের মুখে। দুই নেত্রী কারনে দেশের অর্থনীতি আজ ধংশের পথে। অথচ ক্ষমতার লোভের কারনে প্রধান দু’দলের কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। কিভাবে ছাড় দিবে, তারা দুজন মহিলা বলে কথা। আমাদের দেশের জনগন আর মহিলা শাসন চায় না। একটি ইসলামি রাষ্ট্র পুরুষ শাসিত হওয়া প্রয়োজন। কারন দেশের এই সংকট কালীন সময়ে প্রধান দু’দলের প্রধান পুরুষ হলে অনেক আগেই এর সমাধান হতো। আমরা কি আবার কোন —১২ এর আবদ্ধ হতে যাচ্ছে ? নাকি কোন তৃতীয় শক্তির কাছে ক্ষমতা চলে যাবে ? এ প্রশ্নগুলো আজ সকলের মুখে মুখে ।

বিএনপি ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবার পর ও ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে অনেক নাটকের জন্ম দিয়েছিল। আর তার ফল হয়েছিল ১/১১ এর। পরে আটক হয়েছিল প্রধান দুই দলের দুই নেতাসহ অনেক নেতা। নেতারা দীর্ঘদিন জেল ও খেটেছিল।  কিন্তু কোন ফল হয়নি। আড়াই বছর পর নির্বাচন হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলো। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবার পর তারাও ব্‌িএনপির পথ অবলম্বন করল।

ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকায় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করে। মেয়াদ শেষ হবার পরও আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা প্রধান মন্ত্রীত্ব ধরে রেখেছেন। নতুন করে মন্ত্রী তৈরী করেছেন। আরও একবার ক্ষমতায় থাকার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন।  দেখা যাক এর শেষ পরিনতি কি হয় !

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় পুনরায় আসার জন্য পূর্ব পরিকল্পিতভাবে প্রথমে বিএনপির শরিক জামায়েত ইসলামীর নেতাদেরকে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে আটক করে। আদালত সেই মামলার রায় দিয়ে দিয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে জামায়াত একটি অরাজনৈতিক দল। আগামী নির্বাচনে তারা অংশগ্রহন তরতে পারবে না। এরশাদ শৈরাচার হওয়া সত্যে এবং তার দল বর্তমানে ৪ ভাগ হবার পর ও আওয়ামী লীগের সমর্থনকারী হওয়ায় তার দল আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারবে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিগত ৫ বছরে আন্দোলন করে কোন কিছু করতে পারেনি। কারন একটি গনতান্ত্রিক দেশে বিএনপি কেন আন্দোলনের ঘোষনা দেওয়ার সাথে সাথে তাদের নেতা কর্মীদের গনগ্রেফতার করেছে। রিমান্ডে নিয়েছে। এটা কি ধরনের গনতন্ত্র ? এর জবাব কে দেবে। প্রধান মন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাকে বলছেন আন্দোলনের ঘোষনা দিয়ে এসি রুমে বসে না থেকে মাঠে আসুন। আমরা কি আওয়ামী লীগ এর প্রধান শেখ হাসনিার কাছে এই কথা আসা করি না যে, ”আমি আর হানাহানি দেখতে চাইনা,  আমি ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছি , আসুন নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচনের মাঠে”।

তাহলে দেশে শান্তি ফিরে  আসবে দলের প্রধানদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরে আসবে। দেশ সত্যিকারের গনতন্ত্রের দেশে পরিনত হবে।

নির্বাচন কমিশন আগামী জানুয়ারী মাসে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষনা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধিনে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন গতকাল বলেছেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখ পরিবর্তন করা হবে না। অপর দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এর প্রতিনিধি বলেছেন এই একদলীয় নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষকদল পাঠাবে না। আওয়ামী লীগ বিরোধী দল বিএনপিকে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহনের আহবান জানাচ্ছে।

যা বাংলাদেশে রাজনীতিতে কোন দিন সম্ভব কবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনের তফসিল বাতিলের প্রতিবাদে বিএনপি অবরোধ কর্মসুচী চলছে। সাধারন মানুষ নাশকতার স্বীকার হয়ে মারা যাচ্ছে। একদল আরেকদলকে দায়ী করছে। কিন্তু সাধারন জনগনের কথা কেউ ভাবছে না। একটি উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের আন্দোলন দেশকে যে কি ভয়াবহ পরিনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা কল্পনাও করা কঠিন।

সরকার দাবী করছে তারা বিগত ৫ বছরে ব্যাপক উন্ন্রয়নমুলক কাজ করেছে তাহলে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন দিতে ভয় পাচ্ছেন কেন ? দুই নেত্রীর জেদের কারনে বর্তমানে দেশ ভয়াবহ পরিসি’তির দিকে যাচ্ছে, যা হয়তবা কন্ট্রোল করা সম্ভব হবে না। আবার কি কোন —–১২ এর জন্ম হতে যাচ্ছে ? তাহলে কে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে, নেতা নেত্রীরা না কি সাধারন জনগন ? আমার মনে হয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টার কারনে বিএনপির মত আওয়ামী লীগকে ও চরম মুল্য দিতে হবে। কারন ১/১১ এর পূর্বে বিএনপিও একই চেষ্টা করেছিল। আর তাই নির্বাচনে ব্যাপক পরাজয়ের সাধ ভোগ করতে হয়েছে।

অবরোধে দেশের যানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কয়েকদিনে রেল খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা অপুরনীয়। পিপরের মত সাধারন মানুষ মরছে। সে দিকে কাহারো কোন ভুরুক্ষেপ নেই। এই পরিসি’তিতে সকল শ্রেনীর ব্যবসায়ী, ও সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে তার দায়ভার কে নেবে। সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ না খেয়ে দিন যাপন করছে। নিরাপদে অফিসে যাতায়াত করা যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী বাসে কিছু জানোয়ার শ্রেনীর মানূষ পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে নিরঅপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে।

সাধারন জনগন হলমার্ক ও বিসমিলল্লাহ গ্রুপের দুর্নীতি, পদ্মা সেতুর দূর্নীতি, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্রের নাগামহীম উর্ধগতি, ইলিয়াস আলী ঘুম হওয়া, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর রুনীর হত্যা, ব্‌শ্িবজিত হত্যা, শেয়ার মার্কেটের কেলেংকারীতে ক্ষতিগ্রস্থ কয়েক লক্ষ মানুষ কি তাদের কষ্টের কথা ভুলে যাবে। এসব ঘটনার কি বিচার করা সম্ভব হত না। কেন হয়নি সুষ্টু বিচার। আজ ও সাংবাদিক দম্পত্তির খুনের রহস্য উদঘাটন হলো না কেন? কেন শেয়ার মার্কেট কেলেংকারীর তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হলো না। শেয়ার মার্কেট কেলেংকারীরা কেন শাস্তি পেল না। এসব নাটের গুরুরা আজ কোথায়।

আমার মরহুমা শ্রদেয়া নানী একটা কথা বলতেন, ”খাদিজা তুই সেই বিয়েই করলি কিন্ত মাঝখানে কয়েকদিন সময় নষ্ট করলি আর কিছু সমস্যার সৃষ্টি করলি”। আমাদের দেশে ও ঠিক তাই হবে, আগামী নির্বাচন হয়তবা বিএনপির সেই ১৫ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের মত হবে, বা তার চেয়ে উন্নতমানের অর্থাৎ বিএনপির চেয়ে কিছুদিন বেশী স্থায়ী হবে।

তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিহীন নির্বাচন যখন যখন দেশ বিদেশে গ্রহনযোগ্য হবে না, দেশ বিদেশের সাহায্য যখন বন্ধ হয়ে যাবে, তখন কি করবেন আওয়ামী লীগ। সবাই জানে ও মানে ক্ষমতা কোন দিন চিরস্থায়ী হয়না। এটা বাংলাদেশ,  এদেশের জনগন ক্ষমতার পরিবর্তন চায়।  প্রতি ৫ বছর পর নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচন সাধারন জনগনের দাবী ও ইচ্ছা। কারন বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন কোন দিনও সম্ভব হবে না, যতদিন না আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মনমানুষিকতার পরিবর্তন হবে।

দুই নেত্রীর কাছে দাবী, দেশকে রক্ষায় ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে এগিয়ে আসুন।

 

Soyeb4@gmail.com

(লেখক একজন ফ্রিলেন্স সাংবাদিক)

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আরিফ চৌধুরী শুভ

‘শিক্ষা আমার স্বাধীনতার অধিকার, আমৃত্যু লড়ে যাবো অধিকার আদায়ে’

আরিফ চৌধুরী শুভ :: বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকার মানুষের সংবিধান স্বীকৃত জন্মগত অন্যতম একটি মৌলিক ...