দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদের প্রত্যাশিত ভূমিকায় ঘাটতি রয়েছে: টিআইবি

টিআইবিস্টাফ রিপোর্টার :: দশম জাতীয় সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনের গড় বৈঠক কাল এবং প্রতি কার্য দিবসে সদস্যদের  গড় উপস্থিতির  হার অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদের একই  অধিবেশন গুলোর তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও  কোরাম সংকট প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

এছাড়া আইন প্রণয়নে জনমত গ্রহণের বিদ্যমান পদ্ধতিগুলোর সীমিত প্রয়োগ, সংসদীয়উন্মুক্ততা চর্চার ঘাটতি, সরকারের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় প্রধান বিরোধী দলের ব্যর্থতা এবং আইন প্রণয়নে ব্যয়িতমোট সময়ের শতকরা হার পূর্বের তুলনায় হ্রাস পাওয়াসহ একাধিক কারণে সংসদের প্রত্যাশিত  কার্যকরতার ঘাটতিপরিলক্ষিত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার দশম জাতীয়  সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ  অধিবেশনের কার্যক্রমের ওপর টিআইবি’ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণভিত্তিক  গবেষণা  প্রতিবেদন‘পার্লামেন্টওয়াচ’ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাপ্তফলাফল তুলে ধরে সংসদকে কার্যকর করতে ১৪ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেনটিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান,উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুলহাসান।

সংস্থার ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ওপলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোর্শেদা আক্তার ও নিহার রঞ্জন রায় এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজারঅমিত সরকার।

সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের অপর সদস্য টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজারজুলিয়েট রোজেটি  এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণাটিতে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দশম সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনের বিভিন্নপরিমাণবাচক এবং গুণবাচক তথ্য সংগৃহীত হয়। প্রত্যক্ষ তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সংসদ টেলিভিশনচ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত সংসদ কার্যক্রম।

এছাড়া পরোক্ষ তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় সংসদ কর্তৃক প্রকাশিতঅধিবেশনের সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ও কমিটি প্রতিবেদন, সরকারি গেজেট, প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন, বই, প্রবন্ধ ওসংবাদপত্রের তথ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দশম সংসদের  চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ- এই পাঁচটি অধিবেশনে নবম সংসদের একই অধিবেশনগুলোরতুলনায় সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ সাধারণ সদস্যদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া অধিবেশনের গড়বৈঠককালের ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি লক্ষণীয়।

এ সকল ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও অধিবেশনগুলোতে মন্ত্রীদের উপস্থিতি হ্রাসপাওয়াসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ লক্ষণীয়।

পাঁচটি অধিবেশনের প্রতি কার্যদিবসের গড় কোরাম সংকট ৩০ মিনিট, নবমজাতীয় সংসদের একই অধিবেশনগুলোর প্রতি কার্যদিবসের গড় কোরাম সংকট ছিল ৩২ মিনিট।

কার্যপ্রণালী বিধি ২৭০এর ৬ উপবিধি লঙ্ঘন করে সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের অসংসদীয় আচরণ ও ভাষার ব্যবহার অব্যাহতরয়েছে।

আইন প্রণয়নে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের তুলনামূলক বেশি অংশগ্রহণ থাকলেও তাদের মতামত ও প্রস্তাবযথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং আইন প্রণয়নে জনমত গ্রহণের বিদ্যমান পদ্ধতিগুলোর প্রয়োগের ঘাটতির ফলে জন-অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত ছিল।

এছাড়া প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধিবেশনে উপস্থাপিত না হওয়ার চর্চা অব্যাহতরয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত আলোচিত হত্যাকা-, জঙ্গি তৎপরতা, বাজেটে  প্রস্তাবিত বিষয়ের ওপর গঠনমূলকসমালোচনা,  আর্থিক খাতে অনিয়ম  ও দুর্নীতির বিষয় জনগুরুত্বপূর্ণনোটিস পর্বে আলোচিত হলেও সদস্যগণের একাংশেরবক্তব্যে অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার ও আচরণে বিধির ব্যত্যয় লক্ষণীয়।

নারী সদস্যদের উপস্থিতি পুরুষ সদস্যেরতুলনায় বেশি হলেও অধিকাংশ পর্বের আলোচনায় নারী সদস্যদের অংশগ্রহণের হার তুলনামূলক কম ছিল।

এছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বসহ জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পর্বে নারী সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় উত্থাপিত হয়নি।

সরকারি ওবিরোধী উভয় দলের সদস্যদের বক্তব্যে বাজেটে প্রস্তাবিত বিষয়ের ওপর গঠনমূলক সমালোচনা হলেও সরকারেরজবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা লক্ষণীয়।

অপরপক্ষে সংসদীয় কমিটির নিয়মিতসভা অনুষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেলেও কমিটি সদস্যদের একাংশের স্বার্থের দ্বন্দ্ব^, কমিটির একাংশের বিধিঅনুযায়ী নিয়মিত সভা না হওয়া, কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্বারোপে ঘাটতি এবং সংসদেরকার্যবিবরণী ও কমিটি প্রতিবেদনসমূহের উন্মুক্ততা ও অভিগম্যতার ঘাটতি ইত্যাদি চ্যালেঞ্জসমূহ লক্ষণীয় ছিল।

দশমসংসদের পাঁচটি অধিবেশন সময়ে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে ৪৬টির সভা অনুষ্ঠিত হলেও ৪টি কমিটির কোনোসভা অনুষ্ঠিত হয়নি। বিধি অনুযায়ী প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪২টি কমিটির।

এর মধ্যেসরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সর্বোচ্চ ৫২টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী আটটিকমিটিতে সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কিত সম্পৃক্ততা দেখা যায় যা কার্যপ্রণালী বিধির লঙ্ঘন। ৫০টি স্থায়ী কমিটিরমধ্যে ১৬টি কমিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১১টি কমিটির সদস্যদের সার্বিক গড়উপস্থিতি ৫৬%, ৫টি কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদনের ৪১%সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৪৬% বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

পার্লামেন্টওয়াচ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দশম সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনের প্রকৃত মোট কার্যকালের ১৩%কোরাম সংকটের কারণে ব্যয়িত হয়।

দৈনিক গড়ে ৩০ মিনিট হিসেবে মোট কোরাম সংকট হয়েছে ৩৮ ঘন্টা তিনমিনিট যার প্রাক্কলিত অর্থমূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ৩৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। তবে পাঁচটি অধিবেশনের কোনোটিতেইপ্রধান বা অন্য বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট ও সংসদ বর্জন করেননি। আইন প্রণয়নে অধিবেশনের মোট সময়ের মাত্র৯% ব্যয়িত হয়েছে।

পাঁচটি অধিবেশনে পাস হওয়া ২৪টি সরকারি বিলের ২১টির ওপর জনমত যাচাইয়ের সকল প্রস্তাবকণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। প্রতিটি বিল পাস হতে গড়ে সময় ব্যয় হয় মাত্র ৩৫ মিনিট। উল্লেখ্য, ভারতের লোকসভায়প্রতিটি বিল পাসের গড় সময় ২ ঘন্টা ২৩ মিনিট।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলের সভাপতিকে সরকারের বিভিন্ন কাজেরগঠনমূলক সমালোচনা করাসহ দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা  সম্পর্কে দলীয় ফোরাম ওজনসভায়  জোরালো বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও সংসদীয়  কার্যক্রমে  এ সকল  বিষয়ে  তার অনুরূপ ভূমিকার ঘাটতিলক্ষণীয়। বর্তমান সংসদের মোট ১৮টি অধিবেশনের ৩২৭ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি উপস্থিত ছিলেন ৭৯ কার্যদিবস(২৪%)।

সরকারি প্রটোকল ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের জন্য বিশেষ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাসহ প্রতি মাসে গড়েপাঁচ লক্ষ টাকা সরকারি ব্যয় হলেও দায়িত্ব পালনে তাঁর ভূমিকা লক্ষণীয় নয়।

দায়িত্ব গ্রহণের পর চীন, ভারত, মালয়েশিয়া,  সিঙ্গাপুর,  ভুটানসহ বিভিন্ন  দেশে ব্যক্তিগত সফর  করলেও বিশেষ দূত  হিসেবে তাঁর দায়িত্ব  পালনে ভূমিকানিতে  দেখা যায়নি।

সংসদ অধিবেশনে অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার ও কোরাম সংকট অব্যাহত থাকার বিষয়কে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ড.ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদেরপ্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলই এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী।

সংসদেবিরোধী দল হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করেন বা যাদের উপস্থাপন করা হয় আত্মপরিচয় নিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্ট সংকটবর্তমান সংসদের মেয়াদের শেষ বছরে তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন।”

সংসদকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়েআসতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে ড.জামান বলেন, কমিটিগুলোতে আলোচিত সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের সাথে কমিটিগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশেরনেতৃস্থানীয় সদস্যদের স্বার্থ জড়িত থাকার কারণে কার্যকর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সরকারকে জনগণের নিকটজবাবদিহি করার মৌলিক দায়িত্ব পালনে কমিটিগুলোর একাংশের কার্যকরতার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মালয়েশিয়ায় ৫৫ বাংলাদেশি আটক

ডেস্ক রিপোর্ট :: মালয়েশিয়ায় ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম লঙ্ঘন করে কাজ করার অভিযোগে ...