দুর্নীতির আখড়া পাইকগাছা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস

দুর্নীতির আখড়া পাইকগাছা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসমহানন্দ অধিকারী মিন্টু, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি :: খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি পাইকগাছা জোনাল অফিসের আওতায় ০৯-৭১৮-৫৯৬ হিসাবধারী আজহারুল। বাড়ি পৌরসদরে গোপালপুর ২ নং ওয়ার্ডে। গত ১৬ জুনে ওই গ্রাহকরে বিদ্যুৎ বিল প্রস’ত করা হয়। মিটার রিডিং যাচাই ১৫ জুন। সরবরাহকৃত বিলে বর্তমান রিডিং ৮৮০ইউনিট। ১৬ মে পর্যন্ত ওই গ্রাহকের মিটারে সর্বমোট রিডিং ছিল ৭৫০ ইউনিট। এখানে প্রাপ্ত বিল থেকে ৩০ ইউনিট বেশি দেখানো হয়েছে। পূর্ববর্তী ইউনিট (১৬.০৫.২০১৮) তারিখে ৭৯৫। ব্যবহৃত ইউনিট ৮৫। প্রকৃতপক্ষে ওই গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিট ৪৫ অথবা তারও কম হওয়ার কথা থাকলেও বিল দেওয়া হয়েছে ৮৫ ইউনিট। এতে করে ওই গ্রাহককে গুণতে হচ্ছে কমপক্ষে আরো ৪৬ ইউনিট বেশি বিদ্যুত বিল। প্রকৃত ব্যবহৃত ইউনিট হিসেবে গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল ২৩০ টাকার কম হওয়ার কথা থাকলেও তাকে পরিশোধ করতে হচ্ছে ৪০৯ টাকা।

কপিলমুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ নূরজ্জামান জানান, বিদ্যালয়ের মিটার নং ৯১৯৬৪১। রিডিংম্যান সরেজমিনে না এসে প্রায় অতিরিক্ত রিডিং দেখিয়ে ভৌতিক বিল প্রস্তুত করেন। ১০.০৫.১৮ তারিখে পূর্ববর্তী রিডিং ৯৯০৯০ ইউিনট এবং ০৮.০৬.১৮ তারিখে দেখানো হয়েছে বর্তমান রিডিং ১০১৯০ ইউনিট। কিন্তু ২১.৬.১৮ তারিখে আমার মিটারে প্রকৃত রিডিং ১০১৩৫ ইউনিট। কপিলমুনি কলেজ রোডের গ্রাহক মোঃ মনিরুল ইসলামের এপ্রিল মাসে বিল আসছে ৭১১ টাকা। মে মাসে বিল করা হয়েছে ৩ গুনেরও বেশি ২৩৪৭ টাকা।

নাছিরপুর পালপাড়া রোডের গ্রাহক আব্দুল হাই বলেন, মে মাসের বিলে আমার ৩টি মিটারে অস্বাভাবিক ভাবে ইউনিট বাড়ানো হয়েছে। ফলে বিলও বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুন হয়েছে। আমাকে এখন বাড়তি টাকা গুনতে হয়েছে। এমনভাবে অসংখ্য পল্লি বিদ্যুৎ গ্রাহক অভিযোগ তুলে ধরেন। গ্রাহক হয়রানির এমন অসঙ্গতি লাঘবে সমিতির অফিসে যোগাযোগ করলে পরবর্তী মাসে সমন্বয়ের কথা বলে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন সুফল পাচ্ছেন না ভূক্তভোগী সাধারন গ্রাহকরা।

অপর দিকে জনপ্রতিনিধি বা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিযোগ জানালে বিল ভুল হয়েছে বলে ৫ মিনিটের ভিতরে নতুন একটা বিলের কাগজ ধরিয়ে দিচ্ছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্ববর্তী পল্লী বিদ্যুতের বিল ১৬.০৫.১৮ তারিখে মোট ইউনিট ৭৯৫ কিন’ জুন মাসের বিল (১৫.০৫.১৮) তারিখে মোট ৮৮০ ইউনিট। যা আসার কথা ছিল ৭৯৫ কিন্তু সেখানে তা না লিখে ইউনিট বাড়িয়ে লিখেছেন ৮৮০ইউনিট। বর্তমান মিটারে ইউনিট দেখা যায় ৮৬৩। যাহা এখনো মিটারে ৮৮০ উঠতে ১৭ ইউনিট বাকি।

এসমস্যা শুধু এক দু’জনের না এটা সমস্ত উপজেলা ব্যাপি এই একই সমস্যা সাধারন গ্রাহকের। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’র কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মিটার রিডারদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দায়িত্বহীনতা এ দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে গ্রাহকরা তথ্য অনুসন্ধানে এমনটি উঠেছে। একদিকে অর্থনৈতিক অন্যদিকে মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। হাতে নাতে এমন তথ্য মিললেও বেশিরভাগ সময় অভিযোগ উড়িয়ে দেন সংশ্লিষ্টরা। বাধ্য হয়ে কোনো গ্রাহকের অভিযোগ নিলেও নয়-ছয় করে বুঁঝিয়ে দেন অথবা নামে মাত্র গ্রাহকের বাড়ীতে তদন্তের জন্য টিম পাঠিয়েই দায়িত্ব এড়িয়ে যান। এমন স্বেচ্ছাচারিতা এখানকার নিত্য ঘটনা।

এছাড়াও সমিতির অভিযোগ কেন্দ্রগুলোর যোগাযোগের জন্য দেয়া মুঠোফোন গুলো অধিকাংশ সময় বন্ধ পাওয়া যায়। মাঝে-মধ্যে কল গেলেও কেউ রিসিভ করেন না মর্মে অভিযোগ অনেকের। এমনি আরেকটি অভিযোগ নিয়ে অফিসে আসেন গদাইপুর গ্রামের মোছাঃ নাছিমা বেগম তিনি বলেন আমি এখান থেকে আরও ৩ দিন আগে বেশি ইউনিট লেখার অভিযোগ করলে তার অভিযোগ তদন্তে পাঠানো হয়। মিটার রিডার তদন্ত শেষে এ গ্রাহককে পরামর্শ দেন মিটার পরিবর্তনের। সঙ্গে এক গাদা টাকা আর নানা বিবিধ সর্তকতা।

অভিযোগ রয়েছে মিটার স্থানান্তর, নতুন মিটার প্রাপ্তিসহ নানা কার্যক্রমে ধীরগতি ও হয়রানির। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিলের বিপরীত পৃষ্ঠায় সমিতি’র ১০টি সাধারণ বিধিতে কোথাও মিটার ভাড়া সংক্রান্ত কোনো বিধির উল্লেখ না থাকলেও প্রতি মাসে গ্রাহক প্রতি ১০ টাকা হারে মিটার ভাড়ার নামে কেটে নেয়া হচ্ছে। অথচ সমিতির সকল নিয়ম-কানুন মেনে নির্দিষ্ট হারে সংযোগের টাকা পরিশোধ করে গ্রাহক মিটারের স্থায়ী অনুমোদন পান। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দাবী মিটারের মালিকানা আবার পল্লী বিদ্যুৎ নিজেই।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতায় মিটার প্রত্যাশীদের ভোগান্তির শেষ নেই। একটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক মিটার অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। মাত্র ৭৫০ টাকা কিংবা ৮৫০ টাকার বিনিময়ে যে মিটার পাওয়ার কথা তা পেতে মিটার প্রত্যাশীকে দিতে হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তবুও দেখা নেই মিটারের। অভিযোগটি জানালেন একাধিক মিটার প্রত্যাশী। অন্যদিকে কোনো গ্রাহকের নড়বড়ে ঘরের মিটারটি অন্যত্র স্থানান্তরেও রয়েছে জটিল বিধি-বিধানের বিড়ম্বনা, বিআরইবি’র খবরদারিতে গ্রাহকরা হতাশ।

কর্মকর্তা কর্মচারীরা গ্রাহকদের দেখিয়ে বেড়ান মামলা মোকদ্দমার ভয়। পাইকগাছা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে দালালদের দৌরাত্ব সেখানকার পরিবেশ বদলে দিয়েছে। কোনো গ্রাহকই তাদের চোখ এড়িয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টেবিলে যাওয়ার সুযোগ পাননা। শুধু তাই নয় এ অফিসের অধীনস্থ অস্থায়ী লেবাররাও জড়িত মিটার প্রসেস সহ অফিসের নানা রকম অনৈতিক কর্মকান্ডে। টাকা ছাড়া এক সুতোও নড়েনা এখানকার মিটার আবেদন ও অন্যান্য ফাইল। কোনো ভাবে একজন গ্রাহক দালালদের চোখ এড়িয়ে এক টেবিলে গেলেই অন্য টেবিল দেখিয়ে তাদের গতিপথ বদলে দেয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিণত হয়েছে দুর্নীতির আখড়ায়।

কপিলমুনি অভিযোগ কেন্দ্রের ইনচার্জ নুর আলম জানান, এবিষয় আমি কিছু জানি না। পাইকগাছা অভিযোগ কেন্দ্রের ইনচার্জের মুঠোফোনে কল দিলে ফোনটি ধরেন অফিসের সিকউরিটি গার্ড মঞ্জরুল আলম। ফোনটি ইনচার্জকে দিতে বললে তিনি জানান, ইনচার্জের এই নাম্বার আমার কাছে থাকে। পাইকগাছা জোনাল অফিসের (ডিজিএম) হাওলাদার ফজলুর রহমান বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল করে, অভিযোগ পেলে পরবর্তী মাসের বিদ্যুৎ বিলে সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে, আর দুর্নীতি রোধে আইনগত ব্যবস্থাতো রয়েছেই।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

উপকূল দিবস উপলক্ষে কলাপাড়ায় শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা

উপকূল দিবস উপলক্ষে কলাপাড়ায় শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা

মিলন কর্মকার রাজু কলাপাড়া(পটুয়াখালী) প্রতিনিধি :: ‘উপকূলের জন্য হোক একটি দিন, জোড়ালো ...