দুই মেয়ের ভালো ফলাফলের পরেরও উৎকন্ঠায় মা

 দুই মেয়ের ভালো ফলাফলের পরেরও উৎকন্ঠায় মামোনাসিফ ফরাজী সজীব, মাদারীপুর প্রতিনিধি :: রেজাল্ট শোনার পর থেকে চোখে পানি ঝরছে মা কল্পনা বেগমের। এক সাথে দু’ মেয়ে এস এস সি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পরেও তার স্বস্তি নেই। চোখে আনন্দাশ্রু নয়, মেয়েদের ভবিষ্যত চিন্তায় উৎকন্ঠিত। মেয়েরা ভালো ফলাফল করছে এখন ভালো কলেজে ভর্তি করাতে পারবে কিনা এ নিয়েই দুশ্চিন্তা ভর করছে কল্পনা বেগমের।

কবিতা আর মোহনা। আপন দুই বোন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারিয়েছে নয় বছর আগে। এরপর মায়ের ক্লান্তিহীন চেষ্টা ও নিজেদের অদম্য মানসিক শক্তিকে সম্বল করে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার উৎরাইল এমএল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে কবিতা ও মোহনা। এর আগে একই বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পায় তারা। তাদের মা কল্পনা বেগম সেলাইয়ের কাজ করেন। এছাড়া বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমিতে বছরকালীন ফসল হয়, সেগুলো দেখাশোনা করেন।

তাদের বাবার বাড়ি ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের দেওড়-আটরাভারসা গ্রামে। যখন ওদের বাবার মৃত্যু হয়, তখন কবিতার বয়স ছয় আর মোহনার সাত। আর্থিক অনটনের সংসারে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সাহস ওদের মায়ের ছিল না। কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি দুর্বার টান ও স্বপ্নজয়ের মানসিকতাই লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

একমাত্র চিন্তা লেখাপড়া করতেই হবে, এ ধারণা মনে পুষে নিজ গ্রাম থেকে ২০০৯ সালে নানাবাড়ি শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের গুয়াগাছিয়া গ্রামে এসে আশ্রয় নেয় দুই বোন।

আলাপচারিতায় পরিবারের সদস্যরা জানান, অভাব-অনটনের সংসারে টানাপড়েন লেগে থাকলেও তা নিয়ে কখনোই মন খারাপ করেনি তারা। ভালো পোশাকের জন্য মাকে চাপ দেয়নি। সামর্থ্য অনুযায়ী যা পেয়েছে তাতেই ছিল সন্তুষ্টি। তবে লক্ষ্য ছিল ভালো রেজাল্ট করার মধ্য দিয়ে জীবনে ভালো কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকরি করে আর্থিক অনটন ঘুচানো। সেই লক্ষ্য থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে জিপিএ-৫ ও বৃত্তিপ্রাপ্তি ওদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। এরপর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাতেও সব বিষয়ে ৮০ নম্বর নিয়ে জিপিএ-৫ পায় এই দুই শিক্ষার্থী।

স্বপ্নটা বেড়ে যায় আরো। এসএসসিতেও একই ধারা বজায় রেখে ভালো একটা কলেজে লেখাপড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে কবিতা-মোহনা। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৮ সনের এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করে স্বপ্ন জয়ের

পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলো দুইবোন। তবে জিপিএ-৫ পেয়েও কেন যেন স্বতঃস্ফুর্ততা নেই ওদের মনে। একদিকে রেজাল্টের কথা মনে এলে আনন্দে আÍহারা হয়ে উঠছে অন্যদিকে ভালো একটি কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা এ শঙ্কায় মুহূর্তেই সেই আনন্দ উবে যাচ্ছে। আর্থিক অনটনই যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরের ভালো একটি কলেজে ভর্তির।

জানতে চাইলে মেধাবী শিক্ষার্থী কবিতা বলে, ‘ডাক্তার হবার ইচ্ছা থেকেই সায়েন্স নিয়ে পড়া। ডাক্তারই হতে চাই। পড়তে চাই শহরের ভালো একটি কলেজে। কিন্তু পারবো কিনা তা এখনো নিশ্চিত নই। শহরে পড়ানোর মতো আর্থিক অবস্থা যে আমাদের নেই। ছোট বোন অপর মেধাবী ছাত্রী মোহনা বলে, ‘বাবা মারা যাওয়ার পরেই আমাদের নিয়ে মায়ের যুদ্ধ শুরু হয়। আমরা ভালো কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে লেখাপড়া করে যাচ্ছি। কিন্তু আর্থিক অনটনের কাছে শেষ পর্যন্ত হারতে হবে কি না বুঝতে পারছি না।

ওদের মা বলেন, ওর বাবা যখন মারা যান তখন ওদের বয়স ৬/৭ বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার মেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নিই। টানাটানির সংসারে কোন মতে ওদের নিয়ে বেঁচে আছি।

তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক থেকে এ পর্যন্ত দুই বোনই ভালো রেজাল্ট করে আসছে। স্বপ্ন বড়, কিন্তু ভালো কোন কলেজে পড়ানোর মতো আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল নই আমরা। ভাগ্যে কি আছে জানি না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশ্রাফুল আলম বলেন, ওরা মেধাবী এবং দরিদ্র। এ কারণেই বিদ্যালয়ের বেতন, টিউশন ফি, ফরম পূরণের টাকাসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। ওরা আমাদের গর্ব।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হুমায়ূন আহমেদ?

কতটা অতীত হুমায়ূন আহমেদ?

আরিফ চৌধুরী শুভ :: প্রতিটি ভোরে সূর্য ওঠে স্বপ্ন নিয়ে। প্রতিটি দিনে ...