দুই বছরে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব গচ্ছা

এনামুল হক কাশেমী, বান্দরবান প্রতিনিধি :: বন অধিদপ্তর ও স্থানীয় বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রহস্যজনক কারণে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা বন বিভাগের মাতামুহুরী রেঞ্জের বাঁশমহাল ২বছর ধরে নিলামে বিক্রি করায় সরকার নিশ্চিত রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ২কোটি ৪০ লাখ।

দুইবছর ধরেই বাঁশমহালগুলো থেকে বাঁশ সরবরাহের ক্ষেত্রে দাখিলা প্রথা বন্ধ রাখা হয়েছে রহস্যজনক ভাবে। শ্রমিক-ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর জোর দাবি সত্বেও অসাধু বন কর্মকর্তারা ‘দাখিলা’র (টিপি) বদলে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে নামে মাত্র নিলামেই বিক্রি করে আসছে সংরক্ষিত বাঁশমহালগুলো।

ফলে সরকার গত ২বছর ধরে প্রতিবছরই ১কোটি ২০ লাখ টাকা করে নিশ্চিত রাজস্ব হারাচ্ছে। নিলামে বাঁশমহাল বিক্রি করায় প্রতিবছর ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব পাচ্ছে সরকার। তবে দাখিলা প্রথা চালু থাকলে প্রতিবছরই গড়ে ১কোটি ২০ লাখ টাকা বাঁশ সরবরাহ বাবদ রাজস্ব আদায় হয় বলে ক্ষুদ্র বাঁশ ব্যবসায়ী ও বাঁশ শ্রমিকরা জানিয়েছেন।

ক্ষুদ্র বাঁশ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, দাখিলা পদ্ধতির মাধ্যমে রাজস্ব কয়েকগুন বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও বাঁশ আহরণ,সরবরাহ ও ব্যবসার সাথে জড়িত কমপক্ষে ২০ হাজার লোকের কর্ম ও অর্থসংস’ান বজায় থাকবে।

লামা বন বিভাগের সুত্র জানায়, আলীকদম উপজেলার মাতামুহুরী বনরেঞ্জের আয়তন ১ লাখ ২ হাজার ৮৫৪ একর। বিশাল এই বনভূমিজুড়ে রয়েছে প্রাকৃতিক বাঁশবাগান। বিশাল এ বনভূমির নানাস’ানে প্রায় ২৫০বছর ধরে বসবাস রয়েছে ম্রো,মার্মা,ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী। এসব জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙ্গালীরাও মাতামুহুরী বনরেঞ্জের বাঁশশ্রমিক হিসেবে কাজ করে তাদের পরিবার-পরিজন পরিচালনা করে আসছেন সেই যুগ-যুগ ধরেই।

স্থানীয় বাঁশ-বেত ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, মাতামুহুরী বনরেঞ্জে প্রতিবছর অন্তত ৫০ লাখ বাঁশ উৎপাদন হয়। বন বিভাগ এলাকাভিত্তিক বাঁশমহাল নিলাম দেয়। এতে সরকার মাত্র ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব পায়।

নিলাম না দিয়ে ‘দাখিলা’র মাধ্যমে (টিপ)বাঁশ সরবরাহের অনুমতি দেয়া হলে সরকার কমপক্ষে ১কোটি ২০ লাখ টাকা প্রতিবছরই নিশ্চিত রাজস্ব পাবে,   বাঁশনির্ভর হাজার হাজার শ্রমিক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন। বাঁশমহাল নিলামের ফলে কার্যত মাতামুহুরী বনরেঞ্জের বাঁশসম্পদ একটি প্রভাবশালী মহলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

বাঁশ ব্যবসায়ী আবুল হাসেম বলেন,প্রচলিত বাঁশমহাল নিলামের ক্ষেত্রে কঠিন শর্তজুড়ে দেয়ায় ক্ষুদ্র বাঁশ ব্যবসায়ীরা অংশ নিতে পারে না।

এতে কয়েক ব্যক্তি লাভবান হয়। নিলাম না দিয়ে দাখিলা (টিপি)’র মাধ্যমে বাঁশ সরবরাহ করা হলে সরকার কয়েকগুন বেশি রাজস্ব পাবে।

দুর্গম এলাকার বাঁশ শ্রমিক কাইরী মুরুং,ধুংশো মার্মা ও লক্ষিজন ত্রিপুরা বলেন,পাহাড়ে বেশিরভাগ লোক বনসম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাঁশ মহাল নিলামের নামে বাঁশ শ্রমিকরা নিলাম গ্রহীতাদের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়ে। নিলাম না দিয়ে দাখিলার মাধ্যমে বাঁশ সরবরাহ করা হলে তারা উপকৃত হবেন।

বন বিভাগ জানায়, গত ২০১২-২০১৩ অর্থবছর মাতামুহুরী বনরেঞ্জে বাঁশমহাল নিলাম দিয়ে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার ১৬ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। প্রতি চার বছর পরপর বাঁশমহাল নিলামের জন্য বন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। ২০১৩ সালের জুন মাসে ৪ বছর মেয়াদ শেষ হয়েছে। মহাল নিলামে মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে বাঁশমহাল নিলাম দেয়া সম্ভব হয়নি।

মাতামুহুরী বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, নিলামের বদলে দাখিলা পদ্ধতির মাধ্যমে বাঁশ সরবরাহের নিয়ম চালু করার ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আজ পবিত্র আশুরা

ডেস্ক নিউজ ::  পবিত্র আশুরা আজ। আরবী শব্দ আশরুন তথা দশ শব্দটি ...