তোর জন্য একটা গিফট আছে…!

কামরুল হাসান মিতুল

কামরুল হাসান মিতুল

কামরুল হাসান (মিতুল) ::

খুব মন খারাপ ঈদের ছুটি কাটিয়ে আজই ঢাকায় চলে আসবো।
আমার একটা এলার্জি আছে সেই প্রথম দিক থেকেই ঢাকায় থাকলে গ্রামে যেতে খুব একটা ইচ্ছে হয়না আর গ্রামে থাকলে ঢাকায় আস্তে।
সন্ধ্যা আটটায় আমার ফ্লাইট।

ঘড়িতে সময় বিকেল তিনটা কি চারটা, আমি তখন আমাদের দোতলার ঘরটিতে। হঠাৎ করে সেল ফোনটি বেজে উঠে।
কলটি রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ..
ওপাশ থেকে (সিরিজ অব কোয়েস্চেন)
-তুই কই?
-যাবি কখন?
-তোর জন্য একটা গিফট আছে।

আচ্ছা ঠিক আছে যাওয়ার সময় আমার সাথে দেখা করিস (তখনও আমার থেকে তার দুরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার, আমার গাড়িটি এই পথ দিয়েই গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবে)
অবাক হলাম খুব..!!
আচ্ছা ঠিক আছে বলায় ফোনটি কেটে দিলেন।
এরপর থেকেই কেমন যেন এক অদ্ভুত কল্পকাহিনী কাহিনী মনে হচ্ছিলো ব্যাপারটা। এতে সময় ও বেশ খানিকটা উদাত্ত।

যাইহোক,
আমি নিচতলায় নেমে এসে সব কিছু ঘুচিয়ে নিচ্ছি সাথে হেল্প করছে আমার মা (মা কথাটা লিখতে গিয়ে কেন যেন বুকটা ধরপাকরে উঠলো), ভাবী,বড় আপু, রাবু, মুক্তা, ছোট্ট বোন রিয়া এমনকি কাক্কু ফারহানও।
কিছুক্ষণ পরপরই ঐ ব্যাক্তিত্ব মনের অজান্তেই আমার ভাবনায় এসে ভীড় করে।
সবকিছুই গোছগাছ এরইমধ্যে লাস্ট ঘন্টায় দাড়িয়ে আমি।
আমার বাসা খুব একটা শহরে না, স্থানীয় উপজেলা শহর থেকে একটু ভিতরে।

তাই বিদায় নিয়ে বাসা থেকে রিকশায় করেই রওয়ানা দিলাম স্থানীয় শহরের উদ্দেশে, ঐখানেই আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়িটি যা নিয়ে যাবে আমাদের নগর আর নাগরিকের ভিড়ে ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের শহরে।
এরই মধ্যে আবার ফোন বেজে উঠে,
জিজ্ঞেস করে কই কতটুকু আসলি?
জেনে লাইনটি কেটে দিলেন।

তার কিছুসময়ের পরই আমরা রিক্সা চেঞ্জ করে মাইক্রোবাসে উঠি।
আবার কল,ঐ নাম্বারটি থেকে!
আবারও একই প্রশ্ন?
ছুটে চলছে আমাদের গাড়িটি মাইলের পর মাইল।
কিছুক্ষণ পর আবারও কল.!
কই? কতদূর?
আমিও আস্তেছি পথে দেখা করে গিফট দিবো তোকে। একটা জায়গার নাম বলে বললো এখানে এসে দাড়াইতে আর মনে রাখিস গাড়ির নাম্বার কিন্তু ৯৪৪৯।

আমারাও এগুচ্ছি উনিও …..
আবার ফোন
তোরা কই?
তাহলে এখানে না (আরেকটু আগিয়ে )
এখানে থামিস।

নিশ্চয়ই বিরক্ত হচ্ছেন আর ভাবছেন কে এই লোকটি? সত্যি কথা বলতে আমি একটু বিরক্ত হইনি কিন্তুু উনার এত্তো বার কল করাতে আমি খুবই কষ্ট পাচ্ছিলাম, মায়া হয়েছিল ভীষণ, এইটা ভেবে সারাদিন এতো খাটাখাটনির পর কেন কষ্ট করে এতবার কল করে আমাকে গিফটি দিতেই হবে। এরমধ্যেই মিনিমাম ৩০/৪০ বার কল দিয়ে ফেলছেন, বললাম আচ্ছা কি দরকার এসবের কি এমন গিফট যা দিতেই হবে?
উনি কি বললো জানেন?

মনেকর,
আমি তোকে ভালবেসে আদর করে একটা চকলেট গিফট হিসেবে দিবো, প্ররিশ্রমতো জীবনে অনেক করেছি আরোও করবো এটাইতো জীবন। যাইহোক তুই এখানে এসে কল দিস।
আমি পুরাই হতভম্ব, আবেগ আর থামিয়ে রাখতে পারছিলাম না, অশ্রু গড়িয়ে পরবে ভাব। কোন ভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করে আচ্ছা ঠিক আছে বলে এইপ্রথম আমিই লাইনটি কেটে দিয়েছিলাম।

মিনিট পাঁচেক পর আমাদের গাড়ি এসে পৌছায় নির্ধারিত জায়গায়।
তার আগেই অবশ্যই ৯৪৪৯ নাম্বারের গাড়িটি পৌছায়।
নেমেই হতচকিয়ে দিলাম দৌড় দাড়িয়ে থাকা গাড়িটির দিকে।

কাছে আসতেই গাড়ির জানালা দিয়ে একটি লাল রংয়ের প্যাকেট বের করে হাতে দিয়ে বললো যা
আল্লাহ হাফেজ,
সাবধানে যাইছ
আর গিয়ে অব্যশই ফোন দিবি।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা নেই শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ঐ সময়টিতে আমি কি বলেছি কিছুই আমার মনে নেই।

খুব একটা সময় না নিয়ে,
মুহুর্তের মধ্যেই গাড়িটি চলে যেতে থাকে, আর তাতেই আমি কেন যেন নাড়ি ছেড়া খুবই অদ্ভুত একধরনের স্নায়বিক টান অনুভব করতে লাগলাম।
কারণ এতক্ষন ধরে যাকে কখনো ব্যক্তি আবার কখনো কখনো সে বলে সম্বোধন করেছি সেই লোকটি আমার কলিজার টুকরো “বাবা”।

সে যে আমাকে এতটাই ভালবাসে তা আমি কখনোই বুঝতে পারিনি। এই বয়সে এসে এতো বড় ছেলে আমি কান্না থামিয়ে রাখতে পারিনি। আসলে কোনদিন বুঝিনি তোমায় “বাবা”।
বাবা আজ বলতে ইচ্ছে করছে গলা পাটিয়ে তোমরা মত বাবা না হলে আমি জম্মই নিতে চাইতাম না। আমার জীবনের সেরা সারপ্রাইজটা আমাকে তুমি দিয়েছো। বাবা বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা এতটা খুশি এই জীবনে আমাকে কেউই করতে পারেনি।

বাবা তোমাকেও অনেক ভালোবাসি কিন্তু সেটা তোমাকে বার বার বুঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছি। বাবা আমি কেন পারিনা তোমাকে নিয়ে মনের আবেগ গুলো অনুভূতি গুলো শেয়ার করতে। কারও জন্যই পারি না। তাই সবাই বলে আমার নাকি কারও জন্য কোন মায়া দরদ নেই। আমি এরকমই।
এটা আমার ব্যার্থতা।
ক্ষমা করো বাবা
My father is the best father in that world.

 

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাবসা প্রশাসন, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।  01677849728,

ইমেইল: mktkamrul@gmail.com

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...