তোমরা ভালো থেকো নিসর্গের চেয়েও সুন্দর কোনো স্বর্গে

তোমরা ভালো থেকো নিসর্গের চেয়েও সুন্দর কোনো স্বর্গে

নাজমুন নাহার :: গতকাল থেকে মনটা ভীষণ খারাপ! কিছুতেই যেন মন বসে না! বার বার মনে হচ্ছে বিমান দুর্ঘটনার স্বীকার ওই যাত্রী গুলোর কথা! যারা প্রাণ হারিয়েছেন, যারা বেঁচে থেকেও যুদ্ধ করছেন হাসপাতালের বিছানায়! যারা বেঁচে এসে ওপাশের প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে নির্বাক!

কে ফিরিয়ে দিবে মায়ের ওই সন্তানকে, কে ফিরিয়ে দিবে হারিয়ে যাওয়া বাবা মাকে! যারা মৃত্যুমুখে তাদের কষ্টের ভাগ কে নিবে! চোখের কোনে পানি, বুকে জমাট কষ্টের পাহাড়! মনে অনেক প্রশ্ন! হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরিয়ে দেয়া যাবে না! তবে আমাদের বিবেককে ঠিক করতে হবে!

যদি সতেরো বছরের পুরনো ইঞ্জিন প্রাণ হানির ঘাতক হয়, যদি রানওয়ের কোনো ত্রুটি থাকে, যদি কন্ট্রোল রুম থেকে ভেসে আসা কোনো তথ্য ভুল থাকে তাহলে আমরা এই সব মানুষের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করবো! ফিরিয়ে দিতে পারবো কি তাদের জীবন! আমাদের মনুষত্বকে ঠিক করা আজ বড়ই প্রয়োজন!

আহা কত আনন্দ, কত উচ্বাস বুকের ভেতর নিয়ে তারা যাচ্ছিলো নেপালের ওই শহরে! মানুষ যখন ঘুরতে যায় কিংবা বাড়ি ফিরে তখন বোধয় তাদের মন খুব বেশি উৎফুল্ল থাকে! সেই হৃদয়ের উৎফুল্লতা, দু’চোখে নিসর্গ দেখার আকুলতার মাঝে হারিয়ে যাওয়া জীবন প্রদ্বীপ ওপারের কোনো এক স্বর্গের ভেতর ঠাঁই হলো আজ!

তাদের চোখে ভরা ছিলো আনন্দময় স্বপ্ন! কেউ হিমালয় দেখতে গিয়েছিল, কেউ হয়তো কাঠমুন্ডু শহরের ডাউনটাউন স্ট্রিট ধরে প্রিয়ার হাত ধরে মায়াবী এক সন্ধ্যা পার করতে চেয়েছিল, কেউ হয়তো নাগরকোটের সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে প্রথম এনিভার্সারিতে বলতে চেয়েছিলো- ভালবাসি তোমায় অনন্তকাল! আমরা আমৃত্যু একসাথে থাকতে চাই! কেউ হয়তো চেয়েছিলো তাদের প্রথম হানিমুনে প্রিয়ার চোখে আঁকিয়ে দিবে ভালোবাসার প্রিয় স্বপ্নগুলি!

হয়তো ওই মধ্য বয়সী বাবা মা চাকরির অবসরে কিছুটা ক্লান্তি ঝরাতে গিয়েছিলো, হয়তো পাহাড়ের কোল ঘেষা নিরিবিলি কটেজে কিছুটা সময় কাটাতে কাটাতে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি চারণ করতে চেয়েছিলো! হয়তো ওই ভ্রমণপ্রেমী তরুণ শিক্ষার্থীরা পাহাড়ে দল বেধে যেতে যেতে গান গাইতে চেয়েছিলো…’চলো না হারিয়ে যাই…অজানাতে!

হয়তো ওই একাকী ভ্রমণপ্রেমী ভাইটি অচেনা মানুষের ভিড়ে হারিয়ে দেখতে চেয়েছিলো কাঠমুন্ডু শহরের রূপ! হয়তো কোনো বোনের ইচ্ছে ছিল পরিবারের সবার জন্য কিনে আনবে কাঠমুন্ডু থেকে ছোটো ছোটো কোন উপহার! আর ওই ছবিয়াল ভাইটি প্রিয়ান হয়তো চেয়েছিলো নিসর্গের কোনো ছবি তুলে ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশান পাঠাবে! তার ছোট্ট শিশুটিকে কোলে নিয়ে হয়তো সুন্দর কিছু মুহূর্তের ছবি তুলতে তুলতে সুখের স্মৃতি বানাবে!

উড্ডয়ন প্রেমী সাহসী বীর সেই বৈমানিক মেয়েটি হয়তো আরো যুগ যুগ ধরে উড়তে উড়তে ইতিহাস গড়তে চেয়েছিলো! সেই উচ্বাস, দু’চোখের সেই প্রাণময়ী আনন্দে ভরা মানুষ গুলো নিমিষেই ওই আবদ্ধ বিমানটির ভিতর কিভাবে যুদ্ধ করেছিলো একটু বেঁচে থাকার জন্য! হয়তো চিৎকার করেছিলো বিধ্বস্ত বিমান ধ্বংস্তূপের ভেতর! হয়তো একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল!

নাজমুন নাহার

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার এন্ড মোটিভেশনাল স্পীকার নাজমুন নাহার

জীবন বাঁচাতে যুদ্ধ করতে করতে যারা আজ ওপারে তোমরা হেরে যাওনি ! নিসর্গের চেয়েও সুন্দর কোনো স্বর্গে বিধাতা তোমাদেরকে রেখেছেন! তোমরা অনেক ভালো থেকো ওপারে! ভয় নেই, আমরা সবাই তোমাদের সাথে আছি! তোমাদের ডানামেলা ইচ্ছে গুলো, স্বপ্ন গুলোর হাত ধরে আমরা শিখবো! আমাদের ভুল গুলো শুধরে নিবো! কোনো পুরনো ইঞ্জিন, কোনো ভুল তথ্য, কোনো রিস্কি রানওয়ে যেনো কেড়ে নিতে না পারে আর কোনো জীবন! সবাইকে এই শোক সামলানোর শক্তি দিন বিধাতা! যারা বেঁচে আছেন, তাদেরকে সুস্থও করে দিন বিধাতা!

 

 

লেখক: ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার এন্ড মোটিভেশনাল স্পীকার।email: lubdhok@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হুমায়ূন আহমেদ?

কতটা অতীত হুমায়ূন আহমেদ?

আরিফ চৌধুরী শুভ :: প্রতিটি ভোরে সূর্য ওঠে স্বপ্ন নিয়ে। প্রতিটি দিনে ...