তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র ভাঙ্গছে

 তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র ভাঙ্গছেআসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট প্রতিনিধি :: সফিয়ার মুন্সি, বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের চর হলদি বাড়ী গ্রামে। তার ২২ বিঘা জমি ছিলো । তার বাড়িতে ওই এলাকার ২-৩ জন প্রতিদিন দিনমজুরীর কাজ করতো । তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে গত ৪ বছরে তার ২২ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে ।

এখন পারুলিয়া বাঁধে আশ্রয় নিয়ে ভাড়ায় অটো রিক্সা চালিয়ে ৩ ছেলে মেয়েকে নিয়ে ৫ সদস্যের সংসার চলছে। তার বড় ছেলে সাদেকুল ইসলাম পারুলিয়া বাজারে চায়ের দোকানে কাজ করেন। এ অবস্থা শুধু সফিয়ার মুন্সির নয়। তার মত হাজার হাজার মানুষ বাপ-দাদার বসত বাড়ি হারিয়ে এখনে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের বেশি ভাগ একটি অংশ ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবন ও জীবিকার জন্য চলে গেছে।

লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে নদ-নদী গুলোর পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামের ভাঙ্গনসহ ৩ জেলার অন্তত ১০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ হাজার হাজার বসত বাড়ি, স্কুল কলেজ, মসজিদ মন্দির ও আবাদী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপেজলার গোবর্দ্ধন স্প্যার বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দেয়ার পাশাপাশি ওই জেলার হাতীবান্ধা উপেজলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ধবুনী গ্রামে শহর রক্ষা বাধেঁর ৮ টি স্থানে ভেঙ্গে গেছে।

হুমকির মুখে পড়েছে ধরলা নদীর তীরবর্তী সদর উপজেলার কুলাঘাটে শহর রক্ষা বাঁধ ও হাতীবান্ধা উপজেলা তিস্তা নদীর তীরর্বতী গড্ডিমারী ইউনিয়নের তালেব মোড় এলাকার বাঁধ। লালমনিরহাট সদর উপজেলার শীবের কুঠি ও চর শীবের কুঠি এলাকাতেও ধরলা নদীর ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। তবে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ দাবী প্রতিটি ক্ষতিগ্রস’ পরিবারকে পুর্ণবাসন করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামেও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গনে জেলার সদর উপজেলা রৌমারী, রাজিবপুর ও তিস-ার ভাঙ্গনে রাজারহাট উপজেলার হাজার হাজার বসত বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের বামতীরের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার প্রায় অর্ধ শতাধিক গ্রামে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনে বসত-বাড়ি, সড়ক, মসজিদ, মন্দির, স্কুল কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলিন হতে শুরু করেছে। ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙ্গনে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ফারাজীপাড়া, বলদিয়াপাড়া, গারুহারাসহ পাশ্ববর্তী গ্রামের বেশ কিছু বসত বাড়ি নদের গর্ভে বিলীন হয়েছে। রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের বেশ কিছু বসত বাড়ি তিস-া নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে।

তবে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সুত্রে মতে, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার ব্যাপী স’ায়ীভাবে ব্রহ্মপুত্রের বামতীর সংরক্ষনের কাজ এবং ২৫ কিলোমিটার ড্রেজিংসহ সাড়ে ৭শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

নীলফামারীতেও তিস্তা নদীর গর্ভে বিলিন হচ্ছে হাজার হাজার একর আবাদি জমি। কেড়ে নিয়েছে শত শত পরিবারের বসত বাড়ি। তিস্তা নদীর এই ভাঙ্গন চলছে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখরিবাড়ি, ঝুনাগাছচাঁপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা ভেন্ডাবাড়ি। তিস্তা নদীর দফা দফায় বন্যার ধকল সইতে না সইতেই আবারো ভাঙনের কবলে পড়েছে ওই সব এলাকার লোকজন।

অপর দিকে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাঁপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা ও ভেন্ডাবাড়িতে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ফলে তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের শিকার অসহায় মানুষজনের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি করে তুলছে। ওই এলাকার নদী ভাঙ্গণের শিকার লোকজন তাদের পুর্নবাসনের দাবী জানিয়েছেন।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রেজ্জাকুল ইসলাম কায়েদ জানান, তার ইউনিয়নে পূর্ব ডাউয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ ডাউয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিস্তা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া গত ১ মাসে ৩ শতাধিক বসত বাড়ীসহ অসংখ্য আবাদী জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলো বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর সাথে জীবন যাপন করছে। ওই উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শফিউল আলম রোকন জানান, তার ইউনিয়নে পশ্চিম হলদিবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় তিস্তা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া তার ইউনিয়নে ৪ শতাধিক বসত বাড়ীসহ অনেক আবাদী জমি নদী গর্ভে চলে গেছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা গুলো হলো, ইটালুকান্দা, সাহেবের আলগা, চর গেন্দার আগলা, চরঘুঘুমারী, ঘুঘুমারী, খেরুয়ারচর, পূর্বখেরুয়ারচর, পূর্ব খেদাইমারী, উত্তর খেদাইমারী, পশ্চিম পাখিউড়া, পাখিউড়া, পশ্চিম বাগুয়ারচর, বাগুয়ারচর, বাইসপাড়া, বলদমারা, পূর্ব বলদমারা, ধনারচর, ধনারচর নতুন গ্রাম, দিগলাপাড়া, তিনতেলী। রাজিবপুর উপজেলার শঙ্করমাদবপুর, সাজাই, চরসাজাই, বল্লাপাড়া, উত্তর কোদালকাটি, নয়ারচর, নয়ারচর বাজার, মাঠের ভিটা, লাউশালা, টাঙ্গইলাপাড়।

নদের ভাঙ্গনের ফলে গ্রামের পর গ্রামের বসত বাড়ি আবাদি জমি স্কুল কলেজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ তাদের বাব দাদার ভিটে মাটি হারিয়ে পরিনত হচ্ছে ভূমিহীনে। এ সব পরিবার সব কিছু হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন উচুঁ বাঁধ, অন্যের জমি ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন রোধে জরুরী কোন পদক্ষেপ না নিলে অদুর ভবিষৎতে রৌমারী উপজেলা পরিষদ ভবনসহ সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

লালমনিরহাট জেলার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা গুলো হলো, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিঙ্গিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নসহ কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার ৩০ টি গ্রাম।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার তিস্তাপাড়ের চরখড়িবাড়ি গ্রামের সাদেকুল ইসলাম জানান, ২ বার বসত বাড়ি সরিয়ে নদী থেকে বেশ দুরে টিনের বাড়ি ঘর নির্মান করে ছিলো। সেটি এখন ভাঙ্গনের মুখে তাকে পুনরায় অন্যত্র সরিয়ে নিতে হচ্ছে। ওই এলাকার শতাধিক পরিবারের বসত বসত বাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। যেভাবে তিস্তা ভাঙ্গছে তাতে পুরো এলাকা শেষ করে দিবে।

লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নবেজ উদ্দিন সরকার জানান, তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় ৪ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এ ছাড়া লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ৪টি, আদিতমারী উপজেলায় ৪টি ও হাতীবান্ধা উপজেলায় ১১টিসহ মোট ১৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ বিদ্যালয় গুলো হলো, হাতীবান্ধা উপজেলার কিসামত নোহালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডাউয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম হলদীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব হলদীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পার শেখ মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিন্দুর্ণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর গড্ডিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর হলদিবাড়ী শিশু কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবুদারু কাশিয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধুরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন ইসমাইলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোবর্দ্ধন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাহাদুর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোবর্দ্ধন চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

কুড়িগ্রাম জেলার নদী ভাঙ্গরে শিকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার পরিবার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে। ওই সব পরিবারের একটি বড় অংশ ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বস্তিতে বসবাস করছে। ওই পরিবারের পূর্নবাসন ও নদী ভাঙ্গন রোধ না করলে অল্প কিছু দিনের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে রৌমারী ও রাজিবপুর নামের দুটি উপজেলা বিলীন হয়ে যাবে।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপেজলার মহিষখোচা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নে গোবর্দ্ধন স্প্যার বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু পরিবার ইতোমধ্যে নদী গর্ভে চলে গেছে। ভাঙ্গন রক্ষায় জরুরী ভাবে ব্যবস্থা নিতে তিনি ইতোমধ্যে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছেন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ঈদ্রিস আলী জানান, ধরলা নদীর তীরবর্তী শহর রক্ষা বাধঁটি হুমকির মুখে রয়েছে। এছাড়া শীবের কুঠি ও চর শীবের কুঠি এলাকায় আবাদী জমিসহ বসত বাড়ি ধরলা নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে প্রতি নিয়ত।

হাতীবান্ধা উপজেলার পশ্চিম হলদিবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিলুল ইসলাম জানান, মুহুর্ত্বের মধ্যে নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়ে বিদ্যালয়টি। পরে স’ানীয় লোকজনের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের ঘর গুলো খুলে ফেলা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারী জেলার ডালিয়া-দোয়ানী’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নদী ভাঙ্গন রোধে প্রকল্প তৈরী করে উচ্চ পর্য়ায়ে প্রেরণ করা হয়েছে। বরাদ এলে নদী ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের সংসদ সদস্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র সভাপতি মোতাহার হোসেন বলেন, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর তীরবর্তী এলাকা গুলোতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকতাদের ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের সাথে সমন্বয় করে নদী ভাঙ্গনে তালিকা তৈরী করা হয়েছে। প্রতিটি নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবারকে পুর্ণবাসন করা হবে।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নৌবাহিনীর বার্ষিক ক্বিরাত ও আযান প্রতিযোগিতা সমাপ্ত

নৌবাহিনীর বার্ষিক ক্বিরাত ও আযান প্রতিযোগিতা সমাপ্ত

আইএসপিআর :: বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বার্ষিক ক্বিরাত ও আযান প্রতিযোগিতা-২০১৮ আজ শুক্রবার (১৬-নভেম্বর) ...