তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপ ‘মেঘ-পাহাড়-ঝর্ণা ও জলজীবনের কাব্যকথা’

মেঘ-পাহাড়-ঝর্ণা ও জলজীবনের কাব্যকথায় সিলেট ভ্রমন

তাহমিনা শিল্পী:: ছোট্ট একটি মফস্বল শহরে আমার জন্ম। সেই সুত্রেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা। তারপর বাস্তবতার রেসের ঘোড়ায় চেপে ভালো কলেজে পড়ার আকাঙ্খায় ঢাকাবাসী হয়েছিলাম। সেই থেকে অনেকগুলো বছর ঢাকাতেই কাটিয়ে দিলাম। তবু কেন জানিনা এখনও ঢাকার যান্ত্রিকতার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। হয়ত যাযাবর মনটাই এর জন্য দায়ী।

তাই যদি মিলে যায় একটুখানি অবসর অমনি পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ছুটে যাই প্রকৃতির কাছাকাছি। ছুটে যাই মাটির কাছে, সবুজের কাছে। কিছুটা সময় কাটাই নিজের মত করে। জীবনকে সতেজ রাখার ফুয়েল যোগাড় করে ফিরে আসি আবার ব্যস্ততার আস্তাকুড়ে।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপএবার গিয়েছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটে। ২৪ আগষ্ট ২০১৭ রাতের উপবন এক্সপ্রেসে চেপে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সাথে ছিলেন আমার স্বামী শামসুদ্দিন হীরা ও আমাদের একমাত্র ছেলে শারার যুহায়ের অর্পণ। সারারাত ঝুরঝুর করে ঝরছিল বৃষ্টি। ২৫ তারিখ ভোর সাড়ে ৬টায় গিয়ে যখন সিলেট স্টেশনে পৌঁছলাম তখনও টুপটাপ ঝরেই চলছিল বৃষ্টি। আশা নিরাশার দোলায় ধরেই নিয়েছিলাম এবারের ভ্রমন হয়ত হোটেল রুমেই কাটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু হঠাৎ ১০ টার দিকে ঝলমল করে রোদ হেসে উঠলো। আমরাও ফুরফুরে মেজাজে বেড়িয়ে পড়লাম রাতারগুলের উদ্দেশ্যে।

সিলেট এবার প্রথম নয়। তবে প্রথমবার ভ্রমনের সময়টা ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আবিষ্কার করা। আর এবার ছিল সেসব সৌন্দর্যকে নিবিড়ভাবে উপভোগ করা। সেকারনেই পারিবারিক বন্ধনে নির্ভেজাল অবকাশ যাপনে সিলেট ভ্রমন সবার সাথে শেয়ার করার অভিপ্রায় জাগলো মনে।

 

রাতারগুলঃ

ঝকঝকে রোদ্দুরমাথা নিস্তব্ধ দুপুরবেলায় এমনিতেই মন খানিকটা উদাসী হয়। তারউপর বৈঠার ছলাৎছলাৎ শব্দে কেমন যেন ঘোর লেগে গেলো। এমনই এক ঘোর লাগা দুপুরে ঘুরে বেড়েয়েছি বাংলার অ্যামাজন নামে পরিচিত সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের “ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট’ বা জলাবন রাতারগুলে।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপবনের ভিতর গাছের ফাঁকেফাঁকে রৌদ্র ছায়ায় যেন জলজীবনের অপরুপ এক কাব্য।ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার আড়ালে সূর্যের আলো বনের ভিতরে খুব একটা প্রবেশ করেনা বলেই কেমন যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন আর রহস্যময় মনে হল পুরো বনটা।

বর্ষায় অদ্ভুত এই জলের রাজ্য।বেশীরভাগ গাছ-ই কান্ড পর্যন্ত ডুবে আছে।উচ্চতায় যেসব গাছ একটু ছোট, সেগুলোতো প্রায় পুরো শরীর ডুবিয়ে আছে জলে।

মাঝেমাঝে গাছের ডালপালা আটকে দিচ্ছিল পথ।হাত দিয়ে সরিয়ে খুব সাবধানে চলতে হচ্ছিল। কারণ রাতারগুল হচ্ছে সাপ ও পানি জোঁকের আখড়া।বর্ষায় পানি বেড়ে যায় তাই সাপেরা আশ্রয় নেয় গাছের ওপর।আর পাতার গায়ে লেগে থাকে দীর্ঘাকার বিষাক্ত বিচ্ছু।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপবনের ভেতর দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোঁদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী। টেংরা, খলিশা, রিঠা, পাবদা, মায়া, আইড়, কালবাউস, রুইসহ আরো অনেক জাতের মাছ পাওয়া যায় এই বনে।পাখিদের মধ্যে আছে সাদা বক, কানি বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি,ঘুঘু, চিল ও বাজ।

হাওরের স্বচ্ছ পানিতে অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে শাপলা। বনের ঠিক মাঝখানে রয়েছে উঁচু ওয়াচ টাওয়ার।আরও আছে ভাসমান নৌকা রেঁস্তোরা। সেখানে সিগারেট, চা, সফট্ ড্রিংকস, চিপস্, বিস্কুট, পাউরুটি, কলা, পানি ইত্যাদি পাওয়া যায়।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপএটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি অনিন্দ্যসুন্দর এই জলধারের মূল উৎস।

রাতারগুল জলে ডুবে থাকে বছরে চার থেকে সাত মাস। আর বর্ষা পেরুলেই বনের অন্য চেহারা। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে মূর্তা ও জালি বেতের বাগান। বনের ভেতরের ছোট নালাগুলো পরিণত হয় পায়ে চলা পথে। সেই পথে হেঁটে অনায়াসে বনের ভিতরে ঘুরে বেড়ানো যায়।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপশীতকালে আবার রাতারগুলের ভিন্নরূপ। শীতে মাঝেমধ্যে আসে বিশালকায় শকুন।আর লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আসে বালিহাঁসসহ হরেক জাতের অতিথি পাখি। সে সৌন্দর্যের ভিন্ন আবেদন।

সিলেট শহর থেকে রিজার্ভ প্রাইভেট কারে দেড় ঘন্টা দুরত্বে রাতারগুল। বেহাল রাস্তার চরম দুর্ভোগ ভুলিয়ে দিয়েছিল চলার পথের দুইধারে দেখ উঁচু টিলা, সবুজ চা বাগান, বিস্তির্ন ধান ক্ষেত ও ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়ে। তবে সবকিছুর পরও নয়নাভিরাম এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই অপূর্ব।


লালাখালঃ

মাথার খুব কাছাকাছি নেমে আসা স্বচ্ছ নীলাকাশের সামিয়ানা।পুঞ্জিভূত সাদা মেঘের ভেলা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি নদী। দুই পাড়ে ঘন সবুজ গাছ। থরে থরে সাজানো টিলার ঢেউ আর টিলার ঢাল বেয়ে নেমে আসা চা বাগান। প্রকৃতি যেন তার অসীম সৌন্দর্যের অনেকটাই ঢেলে দিয়েছে এখানে।আর আমরা অবাক বিস্ময়ে ইঞ্জিল চালিত নৌকায় ঘুরে বেড়িয়েছি সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি লালাখালে। এখানে নৌকায় যেতে যেতে যে দিকে চোখ যায় কেবলই মু্গ্ধতা।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপএই খালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বাকরুদ্ধ সৌন্দর্য হচ্ছে হরেক রঙের পানি। খালের বিভিন্ন অংশে সবুজ,নীল,স্বচ্ছ ও ঘোলা পানি। পাশাপাশি অবস্থান করেও প্রতিটি রঙ আলাদাভাবে স্পষ্ট এবং দৃষ্টিনন্দন।

সৃষ্টিকর্তার অসীম মহিমায় এক রঙের পানি অন্য রঙের সাথে মিশে যায়নি এতটুকুও।সম্ভবত বাংলাদেশে আর কোথাও কোন জলরাশি এমন বর্নিল হয় না।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপসবচেয়ে বেশি খুশি ছিল আমার দুষ্টুরাজ। সে রীতিমত লাইফ জ্যাকেট ছেড়ে সেলফি স্যান্ড আর বাবার মোবাইল ফোন নিয়ে নৌকার ছাদে, গলুইয়ে দাঁড়িয়ে ফটাফট ক্লিক করে যাচ্ছিল। আর মুখে ছিল আনন্দের আলো।গুনগুন করে গানও গাইছিল।

লালাখাল মুলত সারি নদীর শাখা। সিলেট শহর থেকে জাফলং রোডে আধ ঘন্টার দুরত্বে জৈন্তাপুর উপজেলায় এর অবস্থান। ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত।সারি নদীতে রয়েছে অসংখ নালাখাল ও বাঁক।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপনদীর মধ্যভাগ থেকেই একপাশে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত অন্যপাশে বাংলাদেশ।নদীর যে ঘাট থেকে লালাখাল ভ্রমন করা যায় তা আঞ্চলিক ভাবে সারিঘাট নামেই পরিচিত।

সারি নদীর বাংলাদেশের শেষ সীমানায় যেতেই দেখলাম চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের গায়ে জমে আছে মেঘ।দল বেঁধে মেঘেরা পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে স্থীর হয়ে আছে।আবার কিছু মেঘ দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে অলক্ষ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপবাংলাদেশের সবোর্চ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান এই লালাখাল ও চেরাপুঞ্জি অঞ্চল।পাশের জেলে নৌকার মাঝির কাছে জানলাম আমরা পৌঁছাবার ক্ষানিক আগেই এখানে বৃষ্টি হয়েছে খুব। আবার আমরা যখন মেঘালয় সীমান্তে তখনও হালকা বৃষ্টির মিহিকণা গায়ে লাগছে। ফিরতি পথেই অঝোর বৃষ্টি যখন রোমাঞ্চিত করছিল।ঠিক তখনই প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত! শান্ত আকাশ কোন বিজলী নেই অথচ বিনা নোটিশে বজ্রপাত।

সত্যিই ভীষন ভয় পেয়েছিলাম।কিন্তু লালাখানের অসীম সৌন্দময়তার কাছে তুচ্ছ সব ভয় ও সংকা।

 

জাফলংঃ

দুর পাহাড়ের চূড়ায় মেঘেদের বাড়ি। ছোটবেলায় আমার এমন ধারনাই ছিল। কিন্তু খুব কাছ থেকে মেঘ দেখবো। মেঘ আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে। আমি খানিকটা ভিজবো, রোমাঞ্চিত হবো। এমন দৃশ্য কেবল কল্পনা করেছি। কিন্তু সত্যি হল এবার জাফলং গিয়ে।

মেঘালয়ের সবগুলো পাহাড় যেন ঢলে পড়েছে জাফলং-এর গায়ে। পাহাড়ের গায়ে জমে আছে থোকাথোকা মেঘ। খানিক বাদে বাদেই শোঁ শোঁ শব্দে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে জলসিঁড়ি।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপঅর্পণ তো মহা খুশি প্রায় কাছ থেকে মেঘ দেখে। আমাদের তখন একটু অন্যরকম অনুভূতি। ভালো লাগলো প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য। আবার কষ্ট হল খুব। সমস্ত পাহাড় ঝর্ণা ওপাড়ে। আমাদের কেবল মরিচীকার হাতছানি মত সৌন্দর্য দেখতে হয় দুর থেকে। আমাদের অদূরদর্শী পূর্বপুরুষদের রাজনৈতিক দূর্বলতার সুস্পষ্ট প্রমান পেলাম সীমান্তবর্তী এলাকা জাফলং-এ এসে।

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাপিয়ে এখানে পাথর ক্রেশার মেশিনের দৌরাত্ম বড় বেখাপ্পা লাগল। আগেরবার এসে আদিবাসি খাসিয়া পাথর শ্রমিকদের পাথর উঠাতে দেখেছিলাম। আর জাফলংয়ের অদূরে ছিল অল্প কয়েকটি ক্রেশার মেশিন। আর এখন সেখানে চলছে ক্ষমতার প্রদর্শন। যত্রতত্র উত্তোলিত হচ্ছে পাথর। আর রাস্তা তো নয় যেন মৃত্যু গহব্বর। পর্যটকদের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের উদাসীনতার জ্বলন্ত প্রমান এই জাফলং।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপআমরা আগেরবার খাসিয়া পল্লিতে গিয়েছিলাম। তখন বল্লাপুঞ্জি, নকশিয়া পুঞ্জি ও লামা পুঞ্জিতে গিয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের জীবন পদ্ধতি কাছ থেকে দেখেছিলাম।দেখেছিলাম খাসিয়া রাজার বাড়ি ও অসংখ পানের বরজ। তাই এবার আর ওদিকে না গিয়ে গেলাম পিয়াইন নদীর জিরো পয়েন্ট ও মেঘালয়ের সীমান্ত শহর ডাউকি’র কাছাকাছি।

সেখানে দুই দেশের পর্যটক নির্দিষ্ট সীমান্তরেখার দুরত্ব বজায় রেখেই সৌন্দর্য উপভোগ করছে। ঝর্ণা থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ শীতল জলের নীচে ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের পাথর।চারদিকে সবুজ পাহাড়।সত্যিই এ সৌন্দর্য অবর্ণনীয়।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপজিরো পয়েন্ট থেকে দক্ষিনে প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে দেখা পেলাম সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা।যা আঞ্চলিকভাবে মায়াবী ঝর্ণা নামেই পারিচিত। ঝর্ণাটা ভারত সীমানার হলেও সম্প্রতি এওয়াজ বদল রীতিতে বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

হেঁটেই তপ্ত বালু পার হয়ে পৌঁছাতে হয় সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণায়। কাছে গিয়ে নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না এখানকার অপার সৌন্দর্য। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বেড়ে ওঠা পাথুরে ঝর্ণা।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপপাহাড়ের চুড়া থেকে শুরু হওয়া জলপ্রপাত বড় পাথরের কারণে প্রথমে ভাগ হয়ে গেছে দুই ভাগে। তারপর দুই ভাগ থেকে চার ভাগে। এভাবে বিভিন্ন খণ্ডে ভাগ হয়ে শেষ হয়েছে কয়েকটি স্রোতে। বড় বড় পাথর এমনভাবে সাজানো যেন মনে হয় সিঁড়ি। পাহাড়ের গায়ে পাথুরে এই সিঁড়ি বেয়ে উঠাটা বেশ কষ্টসাধ্য।খুব সাবধানে ধাপে ধাপে উঠে ঝর্ণার মধ্য ভাগ পর্যন্ত গিয়েছিলাম।

ঝর্ণার জলে স্নান যেন এক শান্তির পরশ। স্নিগ্ধতায় মুগ্ধতায় অন্যরকম অনুভূতি। ফিরতে মন চাইছিল না কিছুতেই।কিন্তু তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে গেছে। নিরাপত্তার আশংকায় আর ফেরার তাড়া ছিল খুব। ঝর্ণা থেকে নৌকা পর্যন্ত ফেরার পুরোটা পথ বৃষ্টি আমাদের ভিজালো।সে এক স্বর্গীয় অনুভুতি।

ইস্সস্ কেন যে সময় এতো দ্রুত বয়ে যায়!

 

বিবিধঃ

এ পর্যায়ে আমাদের ঘোরাঘুরির অনেকটাই ছিল সিলেট মূল শহর কেন্দ্রিক। খুব গোছানো, নিরিবিলি, পরিচ্ছন্ন আর যানযট মুক্ত শহরটি সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত। চমৎকার একটি বিকেল ও সন্ধ্যা পার করেছি সুরমা নদীর পাড়ে।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপবর্ষায় সুরমা বেশ স্রোতস্বিনী। নদীতে ভাসছিল ছোট বড় নৌকা আর ছিল ভাসমান জাহাজ রেঁস্তোরা। আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল অসংখ গাঙচিল। সুরমার পাড় ঘেসেই মনোরম পরিবেশে সার্কিট হাউজ। মুগ্ধতায় গোধুলীর আকাশের সবটুকু আবীর লেগে গিয়েছিল আমাদের মনে।

মালনিছড়া, লাক্ষাছড়া সহ ছোট-বড় অনেক চা বাগানের সবুজ আলিঙ্গন করে রেখেছে সিলেটকে। বাগানে ছায়াবৃক্ষের রয়েছে ভিন্ন আবেদন। যেন স্বপ্নের কোন রাজ্য। তবে জোঁক ও সাপের উপদ্রব রয়েছে খুব। তাই সাবধানে বাগানে চলতে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ছেলের পায়ে জোঁক কামড় বসিয়ে দিল বলেই আগেরবারের মত পুরো বাগানটা আর ঘুরে দেখা হয়নি। কথা হয়নি চা শ্রমিক ও স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপপূর্ব জিন্দাবাজারে রয়েছে হাসন রাজা স্মৃতি যাদুঘর। সিলেট শহরে এসে হাসন রাজা তাদের বিরাট তালুকের যে বাড়িতে থাকতেন এবং গানের আসর বসাতেন। সেখানেই তার ব্যবহার্য পোশাক, বাদ্যযন্ত্র ও তৈজসপত্র রাখা আছে পর্যটনদের জন্য। মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে যাদুঘরটি পরিদর্শন করা যায়।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপশহরের মুল আকর্ষন বারো আউলিয়ার মাজার । হযরত শাহজালাল (র:), হযরত শাহ পরান (র:) মাজারসহ মোট চারটি মাজারে আগেরবার গিয়েছিলাম। তবে সময় স্বল্পতা ছিল বলেই এবার শুধু হযরত শাহজালাল (র:) এর মাজারে গিয়েছিলাম। সেখানে নির্বিশেষে সকল ধর্মের লোক মানত করে জিয়ারত করতে আসে। তবে প্রচন্ডরকম অব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ভন্ডদের দেখা মিলল।

শহরতলীতে রয়েছে স্টেডিয়াম ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দু’টোরই স্থাপত্যশৈলী চমৎকার। মনিপুরী পোশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনার জন্য রয়েছে লামাবাজার আদিবাসী মার্কেট। হতাশ হলাম কারন সবকিছুর দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হলেও মান কমেছে বৈ বাড়েনি এতটুকুও।

সবসময়ই কিছু আফসোস বোধহয় রাখতে হয়। যা পরবর্তীতে আমাদের তৃষ্ণা জাগায়। আমরাও আফসোস হিসাবে সাথে নিয়ে এলাম বিছনাকান্দি ভ্রমন। বিছনাকান্দির রাস্তার বেহাল অবস্থার ভোগান্তির কারনে অনেক পর্যটক মাঝরাস্তা থেকে ফিরে এসেছে জেনে আমরা আর এবার যাইনি। তাছাড়া ভরা বর্ষায় বিছনাকান্দির মুল সৌন্দর্য পাথরগুলো পানিতে ঢাকা পরে যায়।

তাহমিনা শিল্পীর ভ্রমন আলাপকোন এক অবসরে আমরা আবার সিলেট যাবো। বিছনাকান্দি যাবার জন্য তো অবশ্যই। তবে সম্ভবত রেড পয়েন্ট রেস্টুরেন্টের সাতরঙা চা আর বাহারী মসলা ও পানসী রেস্তোরায় মিষ্টি জর্দার খাসিয়া পানের লোভে।

আহা! কী যে স্বাদ! মুখে লেগে আছে এখনও।

টানা দুইদিনের বিরামহীন ঘোরাঘুরি শেষে ২৭ তারিখ সকালে ফের ফিরে এলাম নিজ শহরে।

 

 

লেখকের ইমেইল: tahmina_shilpi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

দিনের বেলায় নাইটি পরলেই জরিমানা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক অদ্ভুত আদেশ ও নিষেধাজ্ঞার কথা শোনা যায়। কোথাও ...