ব্রেকিং নিউজ ❯
Home / Featured / তাহমিনা শিল্পীর বর্ষার বিশেষ অনুগল্প: “অপ্সরী”

তাহমিনা শিল্পীর বর্ষার বিশেষ অনুগল্প: “অপ্সরী”

অপ্সরীতাহমিনা শিল্পী :: সারাদিন ধরে বিরামহীন বৃষ্টি ঝরেছে। সন্ধ্যায় খানিক বিরতীর পর রাতে আবার শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। আষাঢ়ী পূর্ণিমার ঝকঝকে জোসনায় বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা স্পষ্ট।

দোতলা কাঠের বাড়ির উপর তলায় সুমন্তর শোবার ঘর। মাঝরাতে টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির নৃত্য অনেকটাই ঘুমের ঔষধের মত কাজ করছে কিন্তু একটা রিনিঝিনি শব্দে সুমন্তর ঘুম ছুটে যাচ্ছে বারবার।

অগ্যতা বিছানা ছেড়ে শব্দের উৎস খুঁজতে জানালার বাইরে তাকাতেই ভিতর বাড়ির পুকুরঘাটের দিকে তার চমকিত দৃষ্টি থেমে গেল।

সানবাঁধানো সিঁড়িতে বসে একটি মেয়ে চিকন অথচ মিষ্টি সুরে গান গাইছে। সুরের তালে তালে তার হাত উঠানামা করছে। বৃষ্টিতে ভিজছে যাচ্ছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই মেয়েটির।

কে মেয়েটি? বৃষ্টিতে ভিজে এতো রাতে পুকুরঘাটে বসে গান গাইবার কি প্রয়োজন হলো তার! উল্টো দিকে মুখ কর বসে আছে বলে তার মুখটা কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না। কৌতুহলী মন বারবার পুকুরঘাটে যেতে তাগাদা দিতেই দরজা খুলে বেরিয়ে পরল সুমন্ত।

সুমন্তর শোবার ঘরের সাথে পরিপাটি করে সাজানো একটি বারান্দা। দোতলার বারান্দা থেকে কাঠের পাটাতন সিঁড়ি সোজা নেমে গেছে পুকুরঘাটের পাশে। সানবাঁধানো ঘাটের এক পাশে হিজল গাছ। গাছের তলায় অনেকটা জায়গা জুড়ে পরে আছে কার্পেটের মত হিজল ফুল। অন্যপাশে বহুবছরের পুরনো একটি কদম গাছ। গাছটিতে তারার মত অজস্র ফুল ফুটে আছে। গাছটির একটি বড় ডাল পুকুরের জল ছুঁই ছুঁই করছে। খানিকবাদে বাদেই টুপটুপ করে কদমফুল পরে ভেসে বেড়াচ্ছে পুকুরের জলে।

মাঝ পুকুরে থরে-থরে ফুটে আছে লাল পদ্মফুল। পুকুরের পাড়গুলোতে ঘন দেবদারু ও মহুয়া বন। বৃষ্টির রাতে মহুয়া ফুলের মাতাল ঘ্রানে যে কারোরই মন উদাস হবে। সুমন্তরও হল।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে হিজল তলায় পরে থাকা লাল ফুলের গালিচা পেরিয়ে সুমন্ত মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো –

– কে তুমি? এতো রাতে বৃষ্টিতে ভিজে কি করছো পুকুরঘাটে?

হঠাৎ কারো আগমনে মেয়েটির চমকে যাবার কথা কিন্তু সে চমকালো না! বরং মনে হলো সে যেন কারো আসার অপেক্ষাতেই ছিল। গান থামিয়ে পিছন ফিরে চাইলো। মেয়েটি অসম্ভব রূপবতী। পটল চেরা চোখে গাঢ় কাজলের প্রলেপ। মেঘকালো চুলগুলো তার ছড়ানো খোলা পিঠের পরে। ডান পাশের কানে গোঁজা একটি বড় লালপদ্ম।

চোখে দুষ্টুমী নিয়ে গোলাপি ঠোঁটের ফাকে মুক্তার মত দাঁতগুলো বের করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। তার হাসি অনুরণিত হলো আকাশে বাতাসে।

মেয়েটির ঠিক পাশে বসে তার দিকে হাত বাড়াতেই এক ঝটকায় সে উঠে দাঁড়াল। রিনিঝিনি পায়ের তোড়ামল বাজিয়ে সুডৌল কোমর বাঁকিয়ে হেলেদুলে দারুন ছন্দের দোলায় একের পর এক সিঁড়ি ভেঙে পুকুরের দিকে নেমে গেল। শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একবার সুমন্তর দিকে জ্বিভ বের করে ভেঙচি কেটে ঝাঁপ দিলো পুকুরের জলে।

তারপর সাতার কেটে সোজা  মাঝপুকুরে পৌঁছলো যেখানে পদ্মফুল ফুটে আছে। এমন অপরূপ দৃশ্যে সুমন্তর মনে হলো অতোগুলো পদ্মের মাঝে মেয়েটিও যেন একটি ফুটন্ত পদ্ম।

সুমন্ত মন্ত্রমু্গ্ধের মত উঠে দাঁড়ালো। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। তার পিছন পিছন সিঁড়ি দিয়ে নেমে পুকুরের জলের খুব কাছে আসতেই মেয়েটিও দু’হাতে জল কেটে কেটে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো। অমন মোহনীয় সৌন্দর্য যেন আগে কখনও দেখেনি সুমন্ত। সব ভুলে অপলক তাকিয়ে রইল। দেখতে লাগলো তার ডুব-সাতার খেলা।

হঠাৎ মেয়েটি আজলা ভর্তি শীতল জল ছুঁড়ে দিলো সুমন্তর দিকে। দু’হাতে মুখটা ঢাকলো সে। অমনি মেয়েটি আবার হেসে উঠলো খিলখিলি করে। এবার যেন তার হাসি থামছেই না। বরং প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সবখানে। সে হাসিতে দিশেহারা হয়ে পরছে সুমন্ত।

মুখ থেকে হাত সরাতেই সুমন্ত দেখতে পেলো তার বিছানার পাশের খোলা জানালা দিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আঁচ এসে তার মুখে লাগছে। কানে তখনও সেই হাসিটি বাজছে। কান থেকে তরঙ্গিত হচ্ছে মগজে।

সুমন্ত বিছানা ছেড়ে উঠে খোলা জানালার বাইরে উঁকি দিয়ে পুকুরঘাটে মেয়েটিকে খুঁজতে লাগলো…. কিন্তু কাউকে দেখতে পেলো না। কিছুটা হতাশ মনে ঘুরি বিছানার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো।

তার বউ টুপুর জানালার দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছে। জানালা গলে আষাঢ়ী পূর্ণিমার চাঁদের সবটুকু রূপালী আলো উছলে পরেছে টুপুরের মুখে। মোহনীয় জোসনার আলোয় ঝাপসা বৃষ্টির ছোঁয়া লেগে টুপুরের মুখটা এতো মিষ্টি দেখতে লাগছে। যেন কোন ঘুমন্ত অপ্সরী। ঘুমের মধ্যেও টুপুর ঠোঁটের কোণে এমন সরল একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখে দেখলেই ভীষন মায়া লাগে। ভালোবাসা উথলে ওঠে মনে।

আস্তে আস্তে বিছানার কাছে এসে টুপুরের পাশে বসে ওর চুলে হাত বুলালো সুমন্ত। পরম আদরে ঠোঁট ছোঁয়ালো ওর কপালে।

আচমকা আদরের স্পর্শে চোখ খুলে মিটমিট করে তাকালো টুপুর। অবাক হয়ে জানতে চাইলো,

– কি ব্যাপার!

– একটা অপ্সরী। সুমন্ত বললো।

– অপ্সরী! কোথায়?

– আমার ঘরে। আমার বিছানায়।

– ধ্যাৎ কি যে বলো না তুমি! আমি আবার অপ্সরী হলাম কি করে! বুঝেছি সন্ধ্যায় খিচুড়ি আর গরুর মাংসের সাথে দু’পেগের ঘোর কাটেনি এখনও?

বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল টুপুর।

তার হাসি বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়লো সারা ঘরময়। সে হাসি পুকুরঘাট থেকে জানালা দিয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাসে কদম আর মহুয়া ফুলের বিভোর গন্ধে মিশে প্রেমের জলোজ্জ্বাস ডেকে উঠলো সুমন্তর মনে।

 

লেখকের ইমেইল: tahmina_shilpi@yahoo.com

http://www.unitednews24.com/wp-content/uploads/2016/08/Untitled-1-copy-1.jpg

About ahm foysal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*