ব্রেকিং নিউজ

ছেলেমেয়ে কেন দরজা আটকে রাখে?

ছেলেমেয়ে কেন দরজা আটকে রাখেএস এম মুকুল :: আমরা জানি মানুষের নৈতিকতার বিকাশ শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। কিন্তু অনেকের ধারণা, নৈতিকতার বিকাশ ঘটে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। নৈতিকতার চর্চা ও বিকাশের অন্যতম স্থান হলো পরিবার। মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সহযোগিতার কেন্দ্রস্থলও পরিবার।

মানুষের ভেতরে ক্রমেই বিকশিত হওয়া মৌলিক বিশ্বাস, অবিশ্বাস, চেতনার সূতিকাগার আমাদের পরিবার। কিন্তু সেই পরিবার থেকে কী শিখছে আমাদের শিশুরা? এজন্য বাবা-মায়ের সচেতনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিকতা, দায়বদ্ধতা, সততা এবং দেশপ্রেমের চেতনা সন্তানের জন্য অন্যতম নিয়ামক শক্তি হতে পারে।

কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হলো_ আমরা বাবা-মায়েরাই সন্তানের কাছে আদর্শের মডেল হতে পারছি না। আমাদের নিজেদের মূল্যবোধ ও চেতনার জায়গাগুলোই নড়বড়ে। আমরা বাবা-মা হয়ে সন্তান মানুষ করব কীভাবে_ যেখানে নিজেরাই নিজ নিজ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধের কথা ভুলে গেছি।

ব্যস্ততার নাম করে আমাদের সুপরিসর সামাজিক সম্পর্কগুলোকে সুবিধাবাদের সম্পর্কে পরিণত করে এক ধরনের একক সমাজ ও পরিবারের অবয়বে একাকিত্বতার ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছি। এর নাম কি সভ্যতা? এর নাম কি আধুনিকতা?

আমরা বাবা-মায়েরা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে পারছি না। কারণ আমাদের সময় নেই। সন্তানের চাহিদা পূরণ করছি অর্থ দিয়ে। সে যা চায়- তাকে তা দিয়েই মনে করছি আমাদের দায়িত্ব পালন হচ্ছে। কিন্তু আমরা ভাবছি না যে সন্তান বাবা-মায়ের কাছে কি শুধু জিনিস চায়? নিশ্চয়ই নয়। সন্তান চায় বাবা-মা হোক বন্ধু এবং ভরসারস্থল।

যার সঙ্গে প্রাণ খুলে, অসঙ্কোচে, নির্ভয়ে সবকিছু শেয়ার করা যাবে। আমাদের সমাজে বাবাদের মানসিকতা হলো_ ছেলেমেয়েকে পরিপালন করবে শুধুই মা। বাবা শুধু টাকার জোগান দেবে। বাবা মানেই ভয়ের কিছু। এটা বলা যাবে না তো ওটা করা যাবে না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই মানসিকতা বাবাদের পরিহার করতে হবে। সন্তানের পরিচর্যায় দায়িত্ব-কর্তব্য মা-বাবা উভয়ের জন্য সমান। কিন্তু মা হলেন সন্তানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মায়ের অকৃত্রিম মমতার মায়াজালে সন্তানকে বন্দি করতে পারলে পৃথিবীর আর কোনো জাদুশক্তির ক্ষমতা নেই সন্তানকে বিপথে নিয়ে যাবে। তবে তারও কিছু পারিপাশ্বর্িকতা রয়েছে তো বটেই।

একবার ভেবে দেখুন তো, আমাদের পরিবারের ঘরে-বাইরে সমাজে কী ঘটছে, কেন ঘটছে? কারণ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা। বিলুপ্ত হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের শেকড়ের শক্তি। অগোচরে, অবহেলায়, অবলীয়ায় ক্রমাগত ভুলের মাসুল দিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা। অতি আদর অথবা অতি শাসন কিংবা অনাদরে পথহারা হচ্ছে সন্তানরা। ব্যস্ত দম্পতির দীর্ঘশ্বাসেরর মতো কাজের লোকের অজ্ঞান, অস্নেহে বড় হচ্ছে প্রিয় সন্তান। কী শিখবে সে এই কাজের লোকের কাছে? কী শিখবে দামি খেলনা আর প্রযুক্তির রঙিন প্রলোভনে?

আমরা খবর রাখি না_ রাত জেগে পড়ার নামে প্রিয় সন্তান মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে কথা বলে? অনলাইন চ্যাটিংয়ে মেতে ওঠে কার সঙ্গে? একই বাসায় থেকে ছেলেমেয়ে কেন দরজা আটকে রাখে? কেন আমরা ভাবছি না এগুলো_ এসব দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে সন্তানদের বিরত রাখা নয়, সে যেন প্রযুক্তির ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আর মোবাইল কোম্পানিগুলো করছেটা কী এসব? রাত ১২টার পর থেকে লোভনীয় অফার দিয়ে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে তারুণ্যের সম্ভাবনাকে। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ ব্যাপারে নির্বিকার কেন? মিডিয়ার ভূমিকা কী?

আবারো পরিবারের কথা বলি। আমাদের পরিবারগুলোয় আদি বন্ধনের ঐতিহ্য ধ্বংস হতে চলেছে। দাদা-দাদু, নানা-নানু, বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু, ফুফা-ফুফুর চিরায়ত পারিবারিক সম্পর্কগুলো ঘনিষ্ঠতা হারাচ্ছে। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে শেয়ার করে না তাদের সংগ্রামী ব্যক্তি ও সংসারজীবনের গল্প। সন্তানের কাছে তাদের দাদা-নানাদের ঐতিহ্যের কাহিনী শোনানো হয় না।

সন্তানকে বলা হয় না সন্তানের কাছে বাবা-মা হিসেবে তারা কী চায়। তাদের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐহিত্য এবং সংস্কৃতির রীতিনীতির কথা অনেক বাবা-মায়ের সন্তানরাই জানে না। অর্থাৎ সন্তানের মধ্যে আমরা স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে পারছি না। আমরা সন্তানদের শেখাতে পারছিনা, প্রত্যেকটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পারিবারিক সংস্কৃতির ধারা এবং কিছু মূল্যবোধ।

শেকড় গ্রামে হলেও গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক নেই_ তাই প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। প্রকৃতির আলিঙ্গন হৃদয়ে মায়া জন্মাবে কেমন করে? প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শৈল্পিকতার আলিঙ্গন।

আমাদের পারিবারিক বিনোদনের জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসছে। বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে একসঙ্গে টিভির অনুষ্ঠান দেখা হয় না। যাওয়া হয় না সিনেমা হলে। সেখানে নেই পরিবেশ। নেই ভালো সামাজিক ছবি। তারপরও কিন্তু কিছু কিছু ছবি ভালো হচ্ছে। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির এসব বিনোদন শেয়ার করা হচ্ছে না। যাওয়া হয় না নাট্যমঞ্চে। পারিবারিক ভ্রমণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তো আছেই। আত্মীয়দের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়া এবং তাদের দাওয়াত খাওয়ানোর রেওয়াজটাও আধুনিকতার নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আটকে গেছে।

এ কারণে আত্মীয়তার সামাজিক বন্ধনগুলো কাছে টানছেনা সন্তানদের। অভিভাবকরা সন্তানদের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তারা অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করছেন না, আলাপ-আলোচনায় সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না। সন্তানরাও অভিভাবকদের প্রত্যাশার কথা আমলে নিতে চাচ্ছে না। খোলা মাঠে শিশুদের সামাজিকীকরণ ঘটছে না। শিশুরা বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, অভিভাবকরা জানতে পারছেন না। তাহলে কেমন হবে ভবিষ্যৎ?

আমাদের সন্তানদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দূরন্ত শৈশবের গল্প। আমাদের শহুরে সন্তানরা মাছের নাম জানলেও, সেই মাছটি চেনে না। ফল খায় ঠিকই কিন্তু গাছ চেনে না। গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার কারণে তারা গাছে চড়তে জানে না। গাছের ডালে বসে আম খাওয়ার তৃপ্তির তারা কি বুঝবে? তারা সাঁতার জানে না। কালবৈশাখীর ঝড় কী জিনিস তা সে গ্রামে না গেলে কী করে বুঝবে। ‘ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে সুখ’_ শুধু বইতে পড়লে হবে না। নদীর জলে ওদের ডুবাতে হবে। কৃষকের কৃষি কাজের নৈপুণ্যতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দিতে হবে।

আর এসবের জন্য_ ‘ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়, দামাল ছেলের মতো’ কাব্যকথার সেই গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের মতে, এর ফলে প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

তরুণ বয়সেই তারা ব্যয়বহুল-অভিজাত জীবনযাপনের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনসংগ্রাম এবং তাদের বাবা-মা-স্বজন-সহোদর ও পূর্বপুরুষদের জীবনযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাবে। চকিং পৌর প্রশাসন বলছে, গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কারখানায় কাজ করতে হয়। চীনে এই প্রক্রিয়ায় স্নাতক পড়া প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থীকে গ্রাম কর্মকর্তা হিসেবে ভাড়া করা হয়েছে।

তাদের ধারণা_ এসব শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হবে মানবীয়। তারা জীবনের কঠিন সংগ্রামকে শক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে পরিশ্রম করে জয় করতে সমর্থ হবে। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি সরকার ও এনজিওদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্কুল, কলেজ পর্যায়েও চীনের মতো এমন ইটার্নশিপ প্রশিক্ষণ কোর্স সিলেবাসের আওতায় নিয়ে আসা দরকার।

আমাদের পারিবারিক, সমাজ এবং শিক্ষাজীবনে মানবিকতার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। সন্তানদের দান করতে শেখানো, সহমর্মী এবং সহযোগী হতে শেখানো সম্ভব পরিবার থেকেই। সামাজিক সম্পর্কগুলো বাড়ানো দরকার। এই আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারের অদ্ভুত এ সভ্যতা বিরাজ করছে। কেউ কারো খবর রাখে না। যাওয়া-আসা হয় না। ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ছোট্টমণিরা একসঙ্গে খেলতে পারে না। গল্প ও আড্ডায় মেতে উঠতে পারে না। কেমন যেন একটা রিজার্ভ সংস্কৃতির কবলে একক পরিবারের একাকিত্বতা পেয়ে বসেছে শিশু-কিশোরদের জীবনে। এ শেকল ভাঙতেই হবে। এই অসভ্য রেওয়াজ বদলাতে হবে।

অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বাসায় বাসায়, ঘরে ঘরে সহপাঠী ও খেলার সাথীবন্ধুদের জম্পেস আড্ডার সুযোগ না থাকলে ওদের বোধের পরিব্যাপ্তি বাড়বে না। অভিজ্ঞতা বিনিময় না হলে ওদের মনন ও জ্ঞানের জগৎ বড় হবে না। মানবিক সম্পর্ক তৈরি হবে না। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে তাদের সৃজনশীলতা দৃষ্টান্ত উপহার হিসেবে দিতে পারবে না। ঘরে যদি খেলা, মেলা-মেশা আর আড্ডার পরিবেশ থাকে তাহলে তারা বাইরের অজানা সংসর্গে জড়াবে না। কাজেই সচেতনভাবে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।
ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। এসব অনুশাসনের চর্চাটা কমে যাচ্ছে। বাবা-মা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে পরিবারে ধর্মীয় আচারের আবহ তৈরি হয়। সন্তানরা সেসব দেখে জেনে শিক্ষা নেয়। বাবা-মায়ের পথ ধরে ছেলেমেয়েরাও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়, কখনো বাধ্য হয়। শিষ্টাচারের শিক্ষা পরিবার থেকেই পাওয়ার কথা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজ ও মনোবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকরা এমন মন্তব্যই করেছেন, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের স্খলনের কারণেই সমাজে হত্যা-খুন বাড়ছে। পাশাপাশি মাদকের অবাধ প্রাপ্তি ও ব্যবহার, যান্ত্রিক জীবনে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসার অভাব এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন পদ্ধতিও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।
মাদকের কুফল-ক্ষতির বিষয়ে ছোটকাল থেকেই সন্তানদের ভালো করে জানাতে হবে। শুধু পরিবারই নয়, বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মাদকের ভয়াবহতা বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র যদি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদকের ব্যবহার-প্রসার বন্ধ করতে পারবে। তাহলেই দেশের মানুষ সুফল পাবে।

 

লেখক : উন্নয়ন গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। ইমেইল: writetomukul36@gmail.com

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...