চিকিৎসকদের নিয়ে একান্তই ব্যক্তিগত মত

সেবিকা দেবনাথ

লেখক সেবিকা দেবনাথ

সেবিকা দেবনাথ :: কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের চারপাশে একটা ঐশ্বরিক আলো থাকে (যদিও সেটি দেখা যায় না)। যেমনটা মহা-মানব কিংবা অবতারদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিছু চিকিৎসককে আমার সেই রকমই (মানে অবতার) মনে হয়। ২০০৫ সালে বাবু যখন স্ট্রোক করলো তখন ল্যাব এইডে ভর্তি করা হলো। অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদের আকন্দের তত্ত্বাবধানে। তিনি তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসক। আমার দেখা প্রথম অবতার। উনি হাসপাতালের নিয়ম নয় রোগীর সুবিধাটাই দেখেছিলেন আগে।

১৯৯০ সালে ঠাকুমা মারা যাবার পর বাবু মাংস খাওয়া পুরাই বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থ হবার পর ডাক্তার বললেন মুরগির স্যুপ খেতে হবে। হাসপাতালের খাবার বাবু খেতে পারে না। আর বাইরের খাবার হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া যাবে না। আকন্দ কাকু (উনাকে স্যার নয় কাকু বলেই সম্বোধন করতাম। ঘোড়াশাল সার কারখানা তৎকালীন প্রধান চিকিৎসক ডা. নেয়ামুল কাসমি কাকুর বন্ধু হিসেবে।) বললেন, ‘আমার রোগীর জন্য বাসা থেকে খাবার আসবে। আমার কাছে আগে রোগী।’

বাবুকে সুস্থ করে তোলার জন্য উনার অক্লান্ত চেষ্টা আমি দেখেছি। অনেকেই বলবেন, প্রাইভেট হাসপাতাল উনি তো ভিজিটও নিয়েছেন। ফাও ফাওতো করেন নি। হ্যা। কথা সত্য। উনি তার প্রাপ্য টাকা নিয়েছেন। কিন্তু রোগীকে যে আন্তরিকতার সাথে উনি দেখেছেন তাওতো কম নয়। উনি চাইলে বাবুকে দিনের পর দিন আইসিইউতে রাখতে পারতেন। রাখেন নি। সব চেক-আপ করতে বাবুকে পাঠালাম কলকাতায়। আকন্দ কাকুর প্রেসক্রিপশনে একটা লাল কালির দাগও বসাতে পারেনি সেখানকার ডাক্তাররা।

বাবুকে রিং পড়ানোর কথা বলেছিলো। বাবু তাতে রাজি হয়নি। দেশে এসে যখন আকন্দ কাকুর কাছে আবার গেলো এবং কলকাতার সব প্রেসক্রিপশন দেখালো তিনি সানন্দে তা দেখেছেন। এনজিও গ্রামের সিডিও দেখলেন। উল্টে বাবুকে বললেন, ‘করিয়ে আসলে পারতেন তো’। আমার পরিচিত এমন লোকও আছে যারা কলকাতায় গিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন বলায় চিকিৎসক তার সাথে ‘ধুর ছার’ ব্যবহার করেছেন।

এখনও আকন্দ কাকুর কাছে বাবু গেলে উনি বাবুকে চিনে, হাসি মুখে কথা বলেন। পরের ঘটনাটা ঘটলো ২০১৩ কি ১৪ সালে আমাদের শাহেদ যখন এক্সিডেন্ট করলো। প্রায় সবাই শাহেদের আসা ছেড়ে দিয়েছিলো। ওই সময়টায় চিকিৎসকরাও অনেক নেতিবাচক কথা বলতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া স্যার সেই মৃত প্রায় শাহেদকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয় কনক কান্তি স্যার ঈশ্বরের আরেক রূপ।

বেশ কিছু দিন যাবৎ আমার মেরুদন্ডের সমস্যায় ডান পায়ে খুব ব্যাথ্যা হচ্ছিলো। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটতেও কষ্ট হতো। গতকাল গেলাম কনক কান্তি স্যারের কাছে। এর আগেও উনার ওষুধ খেয়ে সেরে উঠেছিলাম। ওষুধ খাওয়ার অনিয়ম আর নিজের অবহেলায় আবার ভুগতে হচ্ছে সেই কষ্ট। উনি নিজের রুমে বসে আমাকে বেশ কিছু উপদেশ দিলেন (অবশ্যই আমার স্বাস্থ্য বিষয়ক)। প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম লিখে দিলেন। তার পর কি মনে হলো বললেন, ‘চলো তোমাকে ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগে নিয়ে যাই।’ আমি বললাম, ‘স্যার আমাকে বলেন আমি চলে যাই।’ উনি বললেন, ‘আরে না। চলো তোমাকে নিয়ে যাই।’

লিফটের বাটনটা স্যারই চাপলেন। আমার খুঁড়িয়ে হাঁটা দেখে স্যার আমার সঙ্গে সঙ্গে হাটলেন। নিয়ে গেলেন অধ্যাপক ডা. মো ময়েনুজ্জামান স্যারের কাছে। উনি আরেকজন অমায়িক মানুষ। প্রথম দেখাতেই আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি। কনক স্যার বললেন, ‘দোস্ত আমার মেয়ে নিয়ে আসছি।’ ময়েনুজ্জামান স্যার চোখ তুলে তাকালেন। কনক স্যার বললেন, ‘ও সেবিকা দেবনাথ। সংবাদের সাংবাদিক। দেখ তো দোস্ত ওর সমস্যাটা।’

কনক স্যার আমেরিকা যাবেন এবং একটা মিটিং থাকায় তিনি কিছু সময় পর চলে গেলেন। ময়েনুজ্জামান স্যার আমাকে বেশ সময় নিয়ে দেখলেন। টেস্ট ও ওষুধ লিখে প্রেসক্রিপশন দিলেন। আগের করানো এমআরআই রিপোর্ট দেখতে চাইলেন। আজ তা নিয়ে যাবো সেই কথা বলে চলে এলাম। সন্ধ্যায় কনক স্যার আমাকে ফোন দিলেন। ময়েনুজ্জামান স্যার কী বললেন এবং ব্যাথ্যা কেমন তা জানতে চাইলেন। সব বললাম। তার মতো একজন ব্যস্ত মানুষ আমার মতো একজন চুনাপুটিকে ফোন করার কোন দরকার ছিলো না। শুধু তাই নয় তিনি যা যা করেছেন তার সবটা না করলেও খুব অস্বাভাবিক ছিলো না। কিন্তু তিনি তা করলেন।

আজ সকালে যখন ময়েনুজ্জামান স্যারের রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, (স্যার তখন রোগী দেখছিলেন) স্যারের চোখ পড়লো আমার দিকে। বললেন, ‘তুমি আসছো। আসো দেখি মা তোমার রিপোর্ট কি বলে।’ সব দেখলেন। বললেন, ‘সমস্যা নাই গো। তুমি পরীক্ষাগুলা করাও। সব ব্যবস্থা আমাদের এখানে আছে। তুমি রিপোর্ট নিয়া আসো। আর কোন চিন্তা নাই।’

অবাক হই, বেশ কয়েকদিন আগে বারডেম হাসপাতালে আমার মায়ের সঙ্গেই এক চিকিৎসক যে ভাষায় কথা বলেছেন এবং যে অসভ্য ব্যবহার করেছেন তা ভেবে। অনেকেই আমাকে বিএমডিসি এবং বারডেম কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে বলেছিলেন। লিখিত না হলেও আমি অভিযোগ জানিয়েছি।

চিকিৎসকদের উপদেশ দেয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে যে চিকিৎসকের হাতে রোগীর জীবন-মরন নির্ভর করে তাকে বোধ হয় ওই ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত হতে হয়। চারাল হলেই বরং বেমানান লাগে। আমাদেরও মানতে কষ্ট হয়। কেননা চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কে আদৌতে কোন বৈরিতার স্থান নেই।

 

 

লেখকের ইমেইল: sebikadebnath@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রহিমা আক্তার মৌ

‘জল ও জীবন’

রহিমা আক্তার মৌ :: আমাদের প্রাণপ্রিয় নগরী ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। অপ্রিয় ...