‘চলুন পাঠাগার গড়ার আন্দোলন করি’

ডেস্ক নিউজ :: গত ১৪ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি শিশু একাডেমিতে জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন আয়োজন করেছে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন স্কুলের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এই আয়োজনে স্থানীয় সহযোগিতা ছিল বেলকুচির মুকুন্দগাঁতি গ্রামের ‘আলোকিত সাহিত্য কেন্দ্র’ পাঠাগার। শিশুদের কাছে পেয়ে আনন্দিত ও উচ্ছ্বাসিত হয়ে ওঠেন জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আরিফ চৌধুরী শুভ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিশুদের নিয়ে তাঁর বক্তব্যের সংক্ষেপিত অংশ পাঠকের জন্যে তুলে ধরা হলো…

আরিফ চৌধুরী শুভ

আরিফ চৌধুরী শুভ

আমরা কথায় কথায় বলি আজকের শিশু আগামীর বাংলাদেশ। কিন্তু কথাটা কতভাগ সত্য? হ্যাঁ আর না ছাড়া অন্যকোন উত্তর যদি কারো জানা থাকে তাহলে আমিও শুনতে চাই। যদি হ্যাঁ বলেন, তাহলে আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, আপনার শিশুর ভবিষ্যত বাংলাদেশটি কে নির্মাণ করবে? আপনি, না আপনার শিশুটি। এখানে উপস্থিত শিশুদের অনেক পিতামাতাই সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, ব্যাংকার আরো কত কি বানানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এটা দোষের কিছু না। ভালো পরিকল্পনা থাকতেই পারে।

কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন সন্তানকে নিয়ে যে স্বপ্নটি আপনি দেখছেন, সেই স্বপ্নটা শুধু আপনারই। এই স্বপ্নটা আপনার সন্তানের নাও হতে পারে। তখন কি করবেন? জোর করবেন সন্তানদের উপর। বহু সন্তানকে বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে সারাজীবন একটি মানসিক পঙ্গুত্ব নিয়ে কাটাতে হয়। তারা বড় হয়ে বড় বড় চাকরি করে। গাড়ি হয়, বাড়ি হয়, কিন্তু তাদের ইচ্ছের পূরণ হয় না। কখনো কি শিশুদের স্বপ্নটা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি আমরা? চারদিকে শুধু প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা। মনের সাথে মনের প্রতিযোগিতা আর রূপের সাথে রূপের। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণ হয় বটে, কিন্তু হারিয়ে যায় কোমলমতি শিশুদের স্বপ্ন। যে শিশুর স্বপ্নই জানা হলো না কখনোই, সে শিশুকে দেখিয়ে আমরা দাম্ভিকতার সাথে বলি এই শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। এটা কি করে সম্ভব?

আমার সমানে আজ যে শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে, তারা কুয়াশা উপেক্ষা করে বিজয়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসেছে। তারা ৭১ এর বিজয় দেখেনি সত্য কিন্তু পবিত্র মনের রঙয়ে বিজয়কে এঁকেছে কত সুন্দর করে। স্বপ্নের তুলিতে আঁকা ছবিগুলো বিজয়ের আনন্দে হাসছে তাদেও অবুঝ মনের মতো। অসাধারণ প্রতিটি ছবি। আমি চাইলে এখন যেমন শিশু হতে পারবো না, ঠিক আমার আঁকা ছবিগুলোও তাদের মতো এত সুন্দর নাও হতে পারে।

বিজয় না দেখেও বিজয়কে মনের রঙ্গে এত সুন্দর করে আঁকতে পারে যে শিশু, সেই শিশুই আগামীর বাংলাদেশ। সঠিক পরিবেশ আর পরিচর্যা পেলে ছবির মতো বাংলাদেশকেও নির্মাণ করতে পারবে এই শিশুরা। আমরা যেন ভুলে না যাই, শিশুদের চোখে যে স্বপ্ন, সেটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও পবিত্র! সম্মান করতে হবে শিশুদের স্বপ্নকে। গুরুত্ব দিতে হবে শিশুদের চাওয়াকে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিশুদের প্রথমে গড়ে তুলতে হবে অভিভাবকদেরকেই। পরিবারই শিশুদের অন্যতম বিদ্যালয়। পরিবার থেকেই শিশুরা নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক হওয়ার মন্ত্র শিখবে।

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি আমাকে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা শিখিয়েছেন কিন্তু নিজের ইচ্ছা কখনো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তাহলে আজ আমরা করবো কেন? চাপিয়ে দেওয়ায় ইচ্ছায় আপনাদের সন্তানটি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যাংকার হবে, কিন্তু মানুষ কি হবে? সেই চিন্তাটা একটু করুন। দূর্নীতিগ্রস্ত এই সমাজটা আজ এই কারণেই তৈরি হয়েছে। তাই দূর্ণীতিমুক্ত আগামীর বাংলাদেশ গড়তেও শিশুদের স্বপ্নটা আবিষ্কার করা অভিভাবকদের নৈতিক দায়িত্ব।

আরিফ চৌধুরী শুভআজ আলোকিত সাহিত্য কেন্দ্রের নিমন্ত্রণে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে এসেছি আমি। সারারাত ট্রেনে জার্নি করে এখন প্রায় ক্লান্ত। কিন্তু শিশুদের মায়াভরা মুখের হাসিতে সব ক্লান্ত দূর হয়ে গেল। এত সুন্দর একটি আয়োজনে আমি অতিথি হতে পেরে সত্যি আনন্দিত।

জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন (জাপাআ) সারাদেশে কাজ করে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে পাঠাগার গড়ে তোলার জন্যে আপনাদের সহযোগিতা চাই আমরা। আপনাদের সন্তানদের জন্যে আমরা অন্তত একটি পাঠাগার গড়তে চাই গ্রামে গ্রামে। আমরা আবষ্কিার করতে চাই আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে। চলুন সবাই মিলে একটি সম্মিলিত আন্দোলন শুরু করি। এই মুহুর্তে আমাদের সত্যি একটি সম্মলিত আন্দোলন করা দরকার।

চলুন পাঠাগার গড়ার আন্দোলন করি। আমার বিশ্বাস আমরা সত্যিই পারবো। আপনারা সাথে থাকলে এই আন্দোলন পূর্ণতা পাবে। বই প্রিয় এবং সংস্কৃতমনা ব্যক্তিরা যেমন বিপথগামী হয় না, তেমনি পাঠাগারহীন সমাজ খুঁটিহীন ঘরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অহিংস-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হলেও আজ পাঠাগার আন্দোলনের বিকল্প নাই।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচির মুকুন্দগাঁতি গ্রামে ‘আলোকিত সাহিত্য কেন্দ্র’ পাঠাগারটি আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছি ২০১৭ সালে। এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা আল রাসেল সরকার এই সমাজের ব্যতিক্রমী তরুণদের একজন। সমাজকে আলোকিত করার জন্যে রাসেলের মতো তরুণরাই এগিয়ে আসলে পাঠাগার বিহীন কোন সমাজই থাকবে না। তরুণরা এগিয়ে আসলে যেন এগিয়ে যায় তারুণ্যেও বাংলাদেশ।

আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনাদের গ্রামে যদি কোন পাঠাগার না থাকে, তাহলে একটি পাঠাগার গড়ার উদ্যোগ নিন। আমরা আপনাদের সাথে থাকবো। একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরই হয়ে ওঠবে এক একটি পাঠাগার। ‘বই পড়ি পাঠাগার গড়ি’ স্লোগানে পাঠাগারে পাঠাগারে ভরে ওঠবে দেশ। নিজে বই পড়ুন, অন্যের পড়ার জন্যে পাঠাগার গড়ে তুলুন।

উল্লেখ্য, ইঞ্জিনিয়ার আরিফ চৌধুরী শুভ, জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন (জাপাআ) এর পাশাপাশি- নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও অন্যতম সংগঠক এবং শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (মাস্টার্স), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।arifcenstamford@hotmail.com

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

সোহেল মেহেদী ও উপমার ‘ভালোবাসি বলবো তোকে’

স্টাফ রিপোর্টার :: ‘ভালোবাসি বলবো তোকে/ দিন যায় বলি বলি করে’ এমন ...