চরাঞ্চলে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বাদম চাষ

চরাঞ্চলে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বাদম চাষকলিট তালুকদার, পাবনা প্রতিনিধি :: পদ্মা ও যমুনা সংলগ্ন জেলা পাবনা। পাবনায় রয়েছে বিশাল বিশাল চর। এসব চর বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাবনার ঈশ্বরদী, পাবনা সদর, সুজানগর, বেড়া ও সাথিঁয়া- ৫টি উপজেলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ চিনাবাদাম চাষ করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। লাভজনক হওয়ায় চিনাবাদাম চাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্র জানায়, পাবনার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বাদাম চাষ। গত বছর রবি মৌসুমে জেলায় ১৫’শ ৫৪ হেক্টর জমিতে বাদম চাষ হয়েছি। এবছর রবি মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ১৪’শ ৫৪ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্র ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে।

১৮’শ ৭১ হেক্টর জমিতে বাদম আবাদ হয়েছে। সব চেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে বেড়া উপজেলায়। এ উপজেলায় ১১’শ ৫৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। এছাড়াও পাবনা সদর উপজেলায় ২’শ, সুজানগরে ৩’শ ৫০, ঈশ্বরদীতে ১’শ ৫৬ ও সাঁথিয়া উপজেলায় ১০ হেক্টার জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে।

বাদাম চাষিরা জানান, প্রতিবছর বর্ষার পানিতে চরাঞ্চলে বাদাম ক্ষেত তলিয়ে যায়। সেজন্য একটু আগে-ভাগেই বাদম রোপন করা হয় যাতে করে পানি আসার আগেই বাদাম ক্ষেত থেকে তোলা যায়। সাধারণত আষাঢ় মাসের মধ্যেই বাদাম তোলা শেষ হয়ে থাকে।

পাবনা সদর উপজেলার শুকচর, দাসপাড়া, নতুন গোহাইলবাড়ী এলাকার বেশ কয়েকজন বাদাম চাষি বলেন, গত কয়েক বছর যাবত চিনাবাদাম চাষ করছে তারা। বাদাম লাগানোর ৯০ দিনের মধ্যে তা তোলা শুরু হয়। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১৫ মন বাদাম পাওয়া যায়। লাভের অঙ্ক ভালো হওয়ায় দিন দিন বাদাম আবাদের পরিধিও বাড়ছে।

কৃষকেরা আরো বলেন, বাদাম চাষে ভালো ফলনের সাথে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে তারা। যে কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর আরও বেশি জমিতে চিনাবাদাম চাষ করেছে তারা।

সদর উপজেলার শুকচর গ্রামের আদর্শ কৃষক আলাল শেখ বলেন, বাদাম আবাদে চরাঞ্চলসহ কিছু এলাকায় কৃষক ভালো সাফল্য পাচ্ছেন স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু মানুষ।

পাবনা সদর উপজেলার আশুতোষপুর চরের কৃষক আজগর আলী জানান, তিনি এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে বাদাম আবাদ করেছিলেন। এ বছর বাদামের বাম্পার ফলন পেয়েছেন। পাঁচ বিঘা জমির বাদাম তুলে পাওয়া গেছে ১২০ মন। রোদে শুকানোর পর তিনি পেয়েছেন মোট ৮২ মন। অন্যান্য ফসল আবাদের চেয়ে বাদাম আবাদে পরিশ্রম ও খরচ অনেক কম হওয়ায় লাভ পেয়েছে বেশ ভাল।

শুধু কৃষক মহাম্মদ আলী নয়, কৃষক আকবর আলী, মিয়া চাঁদ, সাগর সরকারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর তারা বাদাম আবাদ করে ভালো ফলন ও দাম পেয়েছেন।

বেড়া উপজেলার চরপেচাকোলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা জমি থেকে বাদাম তুলছেন। কৃষাণি ও কিশোর-কিশোরিরা গাছ থেকে বাদাম ছাড়িয়ে স্তুপ করে রাখছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা জমি থেকে বাদাম হাটে নিয়ে বিক্রি করছে। বিত্তবান চাষিরা বাদাম শুকিয়ে গোলাজাত করে রাখছেন। স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বললেন,বাদাম চাষ করে চরাঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষক পরিবারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। দুর হয়েছে তাদের নিত্য অভাব-অনটন। মলিন মুখে ফুটেছে হাসি।

আর এই বাদাম চাষকে ঘিরে বেড়া উপজেলার নাকালিয়া ও নগরবাড়িতে গড়ে উঠেছে বাদাম বিক্রির পাইকারি মোকাম এবং বাদাম কারখানা। প্রতিদিন চরের কৃষকরা নৌকায় করে নাকালিয়া ও নগরবাড়ি মোকামে বাদাম বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা বাদাম কেনার জন্য এই মোকামে আসছেন। বাদাম কেনা-বেচার জন্য দু’টি মোকাম ২০-২২টি আড়ত গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা স্থানীয় আড়তদারের মাধ্যমে বাদাম কিনে এখান থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু কিছু বড় ব্যবসায়ী বাদাম কিনে মেশিনে খোসা ছাড়িয়ে সরবরাহ করছে দেশের বড় বড় কারখানা গুলোতে।

বেড়া উপজেলার কাশিনাথপুর বাজারের পাইকারি বিক্রেতা ইদ্রিস আলী বলেন, তিনি নগরবাড়ি মোকাম থেকে বাদাম কিনে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকে। তিনি এই ব্যবসা করে আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার মতো অনেকে নগরবাড়ি ও নাকালিয়ে মোকাম থেকে বাদাম কিনে বিভিন্ন জেলাতে সরবরাহ করে তার মতো স্বাবলম্বী হয়েছে।

ঢাকার বাদাম ব্যবসায়ী আজাহার জানান, গুনগত মান ভাল হওয়ায় এ অঞ্চলের বাদামের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তিনি নগরবাড়ি ও নাকালিয়ায় হাট থেকে বাদাম কিনে আড়তদারের গুদামে রাখেন। পরে আড়ত থেকে নৌপথে বাদাম ঢাকা নিয়ে বিভিন্ন চানাচুর তৈরির কারখানায় পাইকারি সরবরাহ করেন। এই ভাবে তিনি প্রতি সপ্তাহে ৫শ’ থেকে এক হাজার মন বাদাম ঢাকায় পাঠান।

পাবনা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষন সরকার বলেন, পাবনা জেলার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি বিভাগের কর্মীরা সব সময় কৃষকদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের পরার্মশ দিয়ে থাকে। উন্নত উন্নত জাতের বাদ চাষে উদ্ভুদ্ধ করা হচ্ছে। বাদাম চাষে লাভ হওয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ অঞ্চলে বাদম চাষ।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘রামগতি উৎসব’

পারস্পরিক ভালোবাসার অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে রইল ‌‘রামগতি উৎসব’

সুলতান মাহমুদ আরিফ :: উৎসাহ, উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুক্রবার (২১ সেপ্টেম্বর) সফলতার সাথে ...