কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’

সমবায় দিবস ২০১৭সোহানুর রহমান: আমরা এখন স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ৪৬ বছরে দাঁড়িয়ে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ ও যোগ্য নেতৃত্বে সুদীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মাহুতির বিনিময়ে সূচিত হয়েছিল জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন লালন করেই স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ৯ মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। দীর্ঘদিনের মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন বাঁক অতিক্রম করে গড়ে ওঠা আজকের বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি ছিল একটি বৈষম্যমুক্ত, শোষণহীন সমাজ।

স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়তেই ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব সমবায় ভাবনা থেকে দিয়েছিলেন এক নয়া প্রস্তাব। বঙ্গবন্ধুর সাড়া জাগানো প্রস্তাবটি ছিল এ রকম- প্রতি গ্রামে গ্রামে হবে যৌথ চাষবাদ। আর ন্যায্যতার ভিত্তিতে ফসলের ভাগ যাবে মালিক, শ্রমিক ও গ্রাম তহবিলে। কিন্তু ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে পরিবর্তিত হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় আদর্শ। জাতির পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে গেলাম বাঙালি জাতি, অভিবাবকশুণ্য হয়ে পরলো আমাদের সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা গ্রামগুলো। সামরিক শাসনের ফলে দেশে সাংবিধানিক গণতন্ত্র বহাল থাকলেও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রের চেতনা হারিয়ে গেল আমাদের জাতীয় জীবন থেকে। ৭২’ এর মূল সংবিধানকে বার বার করা হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে করা হয়েছে বিকৃত। স্বাধীনতা বিরোধীয় যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে উড়িয়েছেন আমাদের প্রাণের লাল সবুজ পতাকা। এর সাথে সাথে দারুণভাবে জেকে বসে শ্রেণি বৈষম্য। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’ স্বপ্নই রয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’যদিও বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে বহু কাল ধরেই দারিদ্র্য বিমোচনের নামে মানুষকে নানা ধরনের সেবা ও সাহায্য প্রদানের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন হয়ে আসছে। এ সকল প্রচেষ্টায় গড়ে উেেছ বহু সংগঠন, খরচ হয়েছে ও হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হওয়ার পও আমাদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ হয়নি। দারিদ্র্যের হার কমলেও এখন এক বিশাল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। গতানুগতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় স্বল্পবিত্তের জনগণ উপকারভোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় হারিয়েছে আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদা। কালের পরিক্রমায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দেশের জনসংখ্যা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সব প্রতিকূলতা পাশ কাটিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেত্রীত্বে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। জিডিপি বৃদ্ধি, সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জণসহ নানা সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল। বিশ^ ব্যাঙ্কের মত ঋণ ব্যাবসায়ীদের টেক্কা দিয়ে নিজস্ব অর্থায়ণে বাস্তবায়িত হচ্ছে পদ্মা সেতুর মত মেগা প্রকল্প। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ^কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরার দেশ নয়।

এই বাংলাদেশ আর দান-খয়রাতের উপর নির্ভর করে চলেনা। যে যাই বলুক না কেন দেশ উন্নত হয়েছে, নাগরিক আইসিটির মাধ্যমে দোড়গোড়ায় বসে পাচ্ছে কাঙ্খিত সেবা। এ কথাটি যেমন সত্য, তেমনি পক্ষান্তরে আর একটি সত্য হচ্ছে আমাদের সমাজের মানুষের মধ্যে আয়-বৈষম্যও বেড়েছে বহুগুণে। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যায় বেঁচে থাকার সংগ্রামের তীব্রতাও বাড়ছে দিন দিন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বড়লোক আর বড়লোক হচ্ছে, গরীব আর গরীব হচ্ছে। শুধু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এ আয়-বৈষম্য বিচার করতে হবে না, তা খালি চোখেও প্রতীয়মান।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’এই ব্যাবধান কমিয়ে টেকসই উন্নয়ণ সাধনে যৌথ চাষাবাদ ও সমবায়ের চিন্তা বড় করে সামনে আসছে। আর এ বৈষম্য দূর করতেই দরকার এখন সমবায় গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও এমন স্বপ্নই ছিল। এতে গ্রামের ভেতর থেকেই গড়ে উঠবে নিজস্ব তহবিল গঠনের সংস্কৃতি। আমরাও বিদেশী ঋণ ও অনুদানের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসতে পারব। সোনার বাংলা গড়তে বঙ্গবন্ধু যে সোনার মানুষ খুজছিলেন সেই সোনার মানুষ হতে পারে সমবায়ীরা।

‘উৎপাদনমুখী সমবায় করি, উন্নত বাংলাদেশ গড়ি’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপিত হচ্ছে। দেশে এই মুহূর্তে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ৭৭০টি নিবন্ধিত সমবায় প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৭২৮ জন সমবায়ীর শক্তি আর তথ্য-প্রযুক্তির সমন্নয় ঘটিয়ে এক একটি জলবায়ু সহনশীল ‘সমবায় গ্রাম’কে আমরা পরিণত করতে পারি বাতিঘরে। যার ফলে বৃদ্ধি পাবে আমাদের উৎপাদনশীলতা, নিশ্চিত হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, চাঙ্গা হবে গ্রামীণ অর্থনীতি। আমাদের সামনে রয়েছে ভিশন ২০৪১ এবং মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার এক মিশন।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এ আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হতে পারে সমবায়ী ভাই-বোন বিশেষ করে নারী কৃষকরা।
ধান, নদী, খাল নিয়েই বরিশাল; যা ছিল বাংলাদেশের শস্য ভান্ডার। তবে বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে কমে গেছে আমন ধানের উৎপাদন। বর্তমান সরকারের অন্যতম সফলতা ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। কৃষিখাতে নানা ধরনের প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে আমাদের কৃষকরা এত ফসল ফলিয়ে ছিল যে আমরা প্রতিবেশি দেশ শ্রীলংকায় চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়ে ছিলাম।

কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’কিন্তু এ বছর আগাম বন্যায় সিলেটের হাওড় অঞ্চলের ফসল ভেসে যাওয়ায় আমরা এক খাদ্য সংকটে পরেছি। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। তারপরেও মাদার অব হিউম্যানিটি খ্যাত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জোড় গলায় বলেছেন ১৬ কোটি বাঙালীর খাদ্য জোগাড় করতে পারে রোহিঙ্গারা কেন না খেয়ে থাকবে? আমরা তাদের মুখেও খাদ্য তুলে দিচ্ছি। অন্যদিকে বড় শঙ্কার বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন যা দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলছে। নোবেল বিজয়ী জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তরাষ্ট্রীয় প্যানেল (IPCC) সহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, আগামী একশ’ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলসহ দেশের প্রায় ১৭% এলাকা ডুবে যাবে। যার ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে।

বর্তমানে যেখানে রাজধানী ঢাকায় যে পরিমান লোক বাস করে তা হয়ে যেতে পারে দ্বিগুণ, খাদ্যশস্য বিশেষ করে ধান ও গমের উৎপাদন কমে যেতে পারে ২৫-৩৫%, সাইক্লোন ও বন্যার তীব্রতা যে হারে বাড়বে তা উন্নয়ন বরাদ্ধের বড় একটা অংশ খেয়ে ফেলবে। শুধুমাত্র ঘুর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় আমাদের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যা আমাদের ২ বছরের উন্নয়ন বরাদ্দের চেয়েও বেশি। এই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জে রুপ নিয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণে একদিন কৃষিকে ঘিরে দেশে যে সমবায় কৃষি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, আবারো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষি পণ্যের বিপণনে এ আন্দোলন জোরদার করা একান্ত জরুরী হয়ে পরেছে।

বাংলাদেশের নারীদের একটি বড় অংশ বাস করেন গ্রামে। নারীর হাত ধরেই কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। আধুনিক যুগের কৃষিতে তাদের অংশগ্রহণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের কমপক্ষে ৩০ হাজার সমবায়ী বিভিন্ন ধরনের কৃষি ও অকৃষি জাত পণ্য উৎপাদন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে একটি বিশাল সংখ্য হচ্ছে কিষাণী। আবাদী-অনাবাদী দুই ধরনের কৃষি উৎপাদনেই নারীরা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।

কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’পশু প্রজনন, নতুন জাত উদ্ভাবন ও উৎপাদন বৃদ্ধি, মাছের জাত উন্নয়ন এবং কৃষি বিষয়ক উদ্ভাবনে তারা ঈষার্ণীয় সফলতা লাভ করছে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এক দশকে যেখানে কৃষিক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। মাঠভিত্তিক কৃষিকাজ ও গৃহভিত্তিক কৃষিকাজ এ দুটি পর্যায়েই নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের তেমন কোন মূল্যায়ন নেই।

কৃষিকাজে সম্পৃক্ত নারী কৃষক মজুরি প্রাপ্তিতে বৈষম্যেরও শিকার হন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নামমাত্র মজুরি দেয়া হয়। ফলে কৃষিকাজে পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করেও নারীর পরিচয় থাকছে কেবল গৃহিণী হিসেবে। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের ফলে একদিকে যেমন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ছে অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই কৃষিখাতকে গতিশীল করতে হলে নারী কৃষকদের দিতে হবে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সরকারি কৃষি প্রণোদনা। তা হলেই সামনের দিনে কৃষিতে নয়া বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়ে উঠবেন নারী কৃষিজীবিরা। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কৃষকরা ফসল ফলালেও এর সম্ভাব্য ব্যয় এবং সম্ভাব্য মূল্য সম্পর্কে তারা কিছুই জানতে পারে না। যে কারণে কৃষকরা অনেক সময় বেশি উৎপাদনে আগ্রহী হয় না। আবার আগ্রহী হয়ে বেশি উৎপাদন করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পণ্যের সঠিক দাম পায় না।

একটি প্রযুক্তি নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক বাজার কাঠামো না থাকায় সমবায়ী উৎপাদনকারীদেরকে স্থানীয় বাজার চাহিদার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। স্থানীয় বাজারে নানাধরনের সিন্ডিকেটের উপস্থিতি থাকায় উৎপাদনকারীগণ পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। বরং লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। উৎপাদন ও বিপণনে সমবায় ব্যবস্থা চালু হলেই এ পরিস্থিতি থেকে কৃষকরা পরিত্রাণ পেতে পারেন। তবে সেই সমবায় ব্যবস্থা অবশ্যই হতে হবে নিয়মমাফিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠের উন্নয়নে জন্য এবং তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর। পণ্য স্থানীয়ভাবে সমবায় ভিত্তিতে বাজারজাতকরণের পাশাপাশি কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সমবায় বাজার কনসোর্টিয়াম বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে অব্যবহৃত ভূমি ও অনুপস্থিত মালিকদের জমি সমবায়ের ভিত্তিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে ভূমি মালিক ও ভাগচাষি উভয়েই সমানভাবে লাভবান হতে পারে। এর ফলে ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’উন্নয়ন সংগঠকরা বলছেন, প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি নারী বিভিন্ন ধরনের কৃষি উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি তারা পাচ্ছেন না। জেন্ডার বৈষম্য দূর করে নারী কৃষকদের তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদে পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের সাথে অংশিদারিত্ব বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; যা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রার অনেক গোলের সাথে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

তবে এটি সরাসরি ক্ষুধামুক্তি; টেকশই কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জণ এসডিজি গোল দুইয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং এই গোলটি এসডিজি গোল ১ চরম দারিদ্র হ্রাস এবং সবার জন্য সুস্বাস্থ্য বিষয়ক গোল তিনের সাথে অঙ্গাআঙ্গিকভাবে জড়িত। ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্তির ভিশন ২০৪১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে সহায়ক হবে কিষাণী উদ্যোগটি।

বরিশালের বেশ কজন কৃষাণীর সাথে আলাপকালে জানা গেছে, নারীবান্ধব বাজার অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় তারা বিভিন্ন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বাজার কমিটিতে নারীদের অর্ন্তভূক্ত করতে না পারায় দোকান বরাদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী নারীদের বড় অঙ্কের জামানত জমা দিতে হয় দোকান মালিককে। এক শ্রেনীর মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারনে ন্যয্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বিবেচনার ভিত্তিতে সক্রিয় কৃষাণীদের ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের জন্য অনলাইন ব্যাকিংয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি আজও । ফলে কৃষিকাজে পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করেও নারীর পরিচয় থাকছে কেবল গৃহিণী হিসেবে। সামাজিক বাঁধা, বাজার উন্নয়নে অব্যবস্থাপনা এবং বাজারে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষি পণ্য বিক্রি করতে বাজারে টিকে থাকতে পারছেনা নারীরা ।

কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’প্রচলিত বাজারের চেয়ে ই-মার্কেটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সব প্রতিকূলতার মাধ্যমে নারীরা নিজ ঘর বা ফসলের মাঠে বসে তাদের কৃষিপন্য নায্যমূল্যে বিক্রি করতে সক্ষম হবেন। এমন এক অনন্য উদ্যোগ হতে পারে ই-মার্কেটিং ব্যবস্থা ‘কিষাণী’। এটি হবে তরুণদের সহযোগিতায় নারী কৃষকদের মাধ্যমে পরিচালিত ইন্টারনেটভিত্তিক কৃষি মার্কেট। এর মধ্যে থাকবে অনলাইনে পণ্য ক্রয় বিক্রয় সেবা চালুকরণ; মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সম্পন্নকরণ। যেখানে তারা অনায়সে প্রবেশ করে ভার্চুয়াল ক্রেতাদের কাছে মূল্যসহ তাদের কৃষিপন্যের ছবি তুলে ধরবেন। আগ্রহী ক্রেতারা সংশ্লিষ্ট কৃষানীকে ফোন করে কৃষিপন্যের অর্ডার করবেন।

এক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তর, সমবায় বাজার কনসোর্টিয়াম ও উৎপাদনকারীদের সমন্বয়ে এমনভাবে মুল্য নির্ধারণ ও বাজার কনসোর্টিয়ামের সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করা যেতে পারে যাতে ভোক্তা ও উৎপাদনকারী উভয়েই ন্যায্য দামে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেন। কৃষানীরা তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় কুরিয়ারের মাধ্যমে হোম ডেলিভারী করবেন এবং তার পরিবহন খরচসহ ন্যয্যমূল্য বুঝে নেবেন। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রেতা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া কম খরচে বিষ ও ফরমালিনমুক্ত কৃষিপণ্য কিনতে পারবেন। এ লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও যথাযথ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সংগঠিত নারীদের সমবায় সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তর কিংবা আইপিএম/ আইসিএম কৃষক ক্লাব সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। নারী কৃষকদের অনলাইনভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনার উপর তাদের উন্নত প্রশিক্ষনে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

জেলা/উপজেলা পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পণ্যের মান পরীক্ষাকরণের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য পণ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে দক্ষ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে। প্রশিক্ষিত নারীদের অনলাইনে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করে পন্যের মূল্যসহ বিজ্ঞাপন পোস্ট করতে স্বল্পসংখ্যক অত্যাধুনিক যন্ত্র (ট্যাবলেট) ও ইন্টারনেটে প্রবেশ করা যায় এমন মোবাইল ফোন সরবরাহ করতে হবে। এ কার্যক্রমকে সফল করতে একদল প্রশিক্ষিত তরুণ স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ে তুলতে হবে যারা নারী কৃষকদের অবদানকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে তাদের কর্মকান্ডে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীন নারীর ক্ষমতায়নে উদ্যোগী হবেন।

কিষাণীরাই গড়বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সমবায় গ্রাম’ধণী-দরিদ্রের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ‘সমবায় গ্রাম ’ প্রতিষ্ঠার কারিগর হতে পারে সমবায়ী ও নারী কৃষকরা। কিষাণী উদ্যোগটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এক একটি কৃষক সংগঠন হয়ে উঠবে কৃষকদের ইনকিউবেটর বা নীরব সবুজ বিপ¬বের আঁতুর ঘর। তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সমবায়ী নারী কৃষকরা যাতে বিনা বাধাঁয় অর্থাৎ সরাসরি বাজারে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারে তার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীন নারীদের ক্ষমতায়নে এক নব দিগন্তের উন্মোচন ঘটতে পারে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

 

 

লেখক: প্রধান নির্বাহী, প্রতীকি যুব সংসদ (Bangladesh Model Youth Parliament) প্রধান সমন্বয়কারী, ইয়ূথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস     .      kishanibd@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ক্রেন থেকে ভারি মালামাল মাথায় পড়ে ২ শ্রমিক নিহত

ষ্টাফ রিপোর্টার :: রাজধানীর শ্যামপুরে বড়ইতলা এলাকায় কাজ করার সময় একটি নির্মানাধীন ...