কবি ফরিদ আহমদ দুলাল’র ধারাবাহিক আত্মকথন ‘আত্মস্খলনের দায়’ পর্ব-০৫

Kabi Farid Ahmed Dulal

আত্মস্খলনের দায় : ৫
ফরিদ আহমদ দুলাল

স্বজনপ্রীতির ধারনা আমাদের সমাজে নতুন কোনো কথা নয়, কেবল আমাদের সমাজে কেন, স্বজনপ্রীতি পৃথিবীর সর্বত্র। স্বজনপ্রীতি তো থাকাই সঙ্গত; যেখানে স্বজনপ্রীতি থাকবে না তাকে কি সুস্থতা বলা যায়? মা তার সন্তানের জন্য আকুল হবেন, সন্তান তার মায়ের জন্য ব্যাকুল হবে, ভাই ভাইয়ের জন্য উদ্বিঘ্ন হবে, বোন ভাইয়ের জন্য চিন্তিত হবে, বাবা তার সন্তানের জন্য চঞ্চল হবেন, সন্তান পিতার জন্য যত্নশীল হবে, সেই তো প্রাকৃতিক। প্রেমিক যদি প্রেয়সীর জন্য উচাটন না হয়, প্রেয়সী যদি তার প্রেমিকের জন্য নির্ঘুম রাত না কাটায়, তাকে কি আমরা স্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করতে পারি? অর্থাৎ স্বজনপ্রীতি মানবজীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ। প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও স্বজনপ্রীতি চর্চা আছে, তবে তা আমার আলোচ্য নয়; মানবজীবনে স্বজনপ্রীতি অনিবার্য অনুষঙ্গ মান্য করেই স্বজনপ্রীতি বিষয়ে আলোচনা। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির মতোই অনিবার্য এবং স্পর্শকাতর ‘স্বজনপ্রীতি’ অভিধাটি। আমার সব করার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতা বিপন্ন করার অধিকার নেই; একইভাবে স্বজনপ্রীতির চর্চা আমি করতেই পারি, কিন্তু অন্যের স্বজন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তেমন কোনো কাজ আমি করতে পারি না। এতো গেল ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের কথা, কিন্তু রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক এবং সর্বজনীন প্রেক্ষাপটে বিষয়টা কি একই রকম হবে? একই আচরণ ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে গ্রাহ্য মনে হলেও রাষ্ট্রীয় বা সর্বজনীন প্রেক্ষাপটে অগ্রহণীয় হয়ে যায়। স্বজনপ্রীতি ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে আবশ্যিক হতেই পারে কিন্তু স্বজনপ্রীতি যখন মূল আয়োজনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তখন সে স্বজনপ্রীতির অপরাধ কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। আপনাকে সবার পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেয়া হলো সিদ্ধান্ত নেবার, সেখানে আপনি স্বজনপ্রীতি করবেন তেমনটি কেউ প্রত্যাশা করে না; মনে রাখবেন আপনার উপর প্রদত্ত দায়িত্ব সবার পক্ষ থেকে দেয়া আমানত। আরও একটা কথা, স্বজন কে, ‘স্বজন’ হবার ‘সূত্র’টিও চিহ্নিত হওয়া আবশ্যক। কে কার স্বজন কেনো হলো সেটিও চিহ্নিত হওয়া আবশ্যক; কেনো না স্বার্থসংশ্লিষ্ট ‘স্বজন’রাই যতো বিপত্তি ঘটায়। দ্বিতীয় কথা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলছেন, “তোমরা মিথ্যার সহিত কখনো সত্যের মিশ্রণ ঘটাইও না, এবং জানিয়া শুনিয়া সত্য গোপন করিও না।” কিন্তু আমাদের পরিপার্শ্বে কী ঘটছে? আমরা কি প্রতিদিন প্রতিটি কাজে আমানতের খেয়ানত করার মতো অপরাধ আর সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ এবং সত্য গোপনের মতো পাপ করছি না? পবিত্র কুরআনের এ আয়াত অনুযায়ী কেবল মিথ্যা নয়, সত্য গোপন করাও অন্যায়। আপনি যখন অযোগ্যকে যোগ্যের স্থলাভিষিক্ত করছেন, সেটা অন্যায়। উদযাপন পর্ষদের আহবায়ক নির্বাচন থেকে ‘বিশ্ববাংলা কবিতা’ সংকলনে যখন বাস্তুবণিকের সদর্প উপস্থিতি দেখি তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, ওখানে অন্যায়ভাবে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। এই বাস্তুবণিক একটা উদাহরণ মাত্র; এভাবেই কখনো বড় আমলা, কখনো কাস্টমসকর্তা, কখনো বা রাজনৈতিক লুটেরা এধরণের অনৈতিক পন্থায় চেয়ার পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে এসব অনৈতিকতায় কি আমাদেরও কারো কারো হাত নেই? আমরা কি আমাদের ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে নিজেরাই টাউটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছি না? এসব স্বজনপ্রীতি আমাদের সবার স্বার্থ বিপন্ন করছে, সামাজিকভাবে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করছে, প্রভাববিস্তারকারী লেখক-শিল্পীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, পাশাপাশি আমাদের সবার নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। একথা মানতেই হবে সমাজের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যখন স্খলন হয় তার প্রভাব সর্বস্তরে পড়ে এবং সে স্খলনের প্রভাবে সমাজের সর্বস্তরে অনাচার-বিশৃঙ্খলা-অনিয়ম-অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়ে। টাউট শেণীর জন্ম হয় প্রতিটি আঙিনায় সংক্রমণ হয় দ্রুত; সে সংক্রমণের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় না সৃষ্টিশীল আঙিনাও।

(চলবে…….)

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘অপরাধী’র পর ‘নেশা’য় মাতাবেন আরমান আলিফ

‘অপরাধী’র পর ‘নেশা’য় মাতাবেন আরমান আলিফ

স্টাফ রিপোর্টার :: জাদুর কাঠিতে মুহূর্তের মধ্যে চমক সৃষ্টি করা কিংবা রূপকথার ...