কবি ফরিদ আহমদ দুলাল’র ধারাবাহিক আত্মকথন ‘আত্মস্খলনের দায়’ পর্ব-০১

Kabi Farid Ahmed Dulal

আত্মস্খলনের দায়
-ফরিদ আহমদ দুলাল

কিছু অভিযোগ আছে নিজের এবং আমাদের সবার বিরুদ্ধে, আমরা যে প্রায়শ কাণ্ডজ্ঞানহীন, কথাটা রাখি না মনে কেউ, নাক কেটে নিজের পরের যাত্রাভঙ্গ করি, এতোটাই অসহিষ্ণু জননী-জন্মভূমিকে বিবস্ত্র করেছি বারেবারে, কখনো বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে কখনো আপন ঘরে জ্বালিয়ে আগুন সমাবেশ করে করতালি বাজিয়েছি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে কখনো বা মূর্খতায় অন্ধ হয়ে; আমি হয়তো দ্রুত মরে যাবো অথবা আমার কমে গেছে পৃথিবীর মায়া; যে কারণে আত্মঘাতি সত্য উচ্চারণে দেখাচ্ছি সহসা- বিপুল সাহস। বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কেবল নয় মৃত্তিকার ক্ষয়রোধের অন্তহীনআধার সুন্দরবন, যার সমস্ত আড়াল ভেঙে বেআব্রু করেছি আমরাই কেউ, আমরাই বিপর্যয় ডাকি পশু আর নিজেদের; নির্বিচার বৃক্ষনিধন কে ফিরাবে? যেখানে নিজেরাই অম্লজান কারখানা কলে বৃক্ষকুলের স্তুতি সেরে করাতকল গড়ি, বৃক্ষের শরীর পুড়িয়ে ইট বানাই দৃষ্টির আড়ালে; কে আমরা কাকে ফাঁকি দিই সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।
আমি হয়তো মরে যাবো তাই আত্মসমালোচনায় দাঁড়িয়েছি, আমার দুঃস্কর্মের সাথী ও সারথি যারা ছিলে এত কাল; আর যারা অশ্লিলতায় পৃথিবীকে ভরিয়ে দিতে নিজেদের প্রস্তুতিকাল কাটাচ্ছো মহা হুলুস্থুলে। যারা আগামী দিনের সেফোক্লিস-ইডিপাস হতে চাও; মাতৃশয্যায় যাদের সংকোচ নেই কোনো, যারা পিতৃঘাতীর উত্তরসুরী, সবাই অনুগ্রহ করো, আমার মতো পাতকের স্বীকারোক্তি শুনে যাও; মনে রেখো আমাদের সদাশয় স্নেহশীল পিতা, যিনি তর্জনীর মাথায় ধারণ করেছিলেন সাড়ে সাতকোটি বাঙালির আবেগ, আমাদের সুন্দর আগামী চেয়ে যিনি আলিঙ্গন করেছিলেন মৃত্যুকে, যিনি আমাদের সকাল আলোয় ভরে দিতে আলিঙ্গন করেছিলেন অন্ধাকার কারাগার; আমাদের অকৃতজ্ঞতা এতোটাই নির্মোহ, স্নেহান্ধ পিতার পাঁজরে বিদ্ধ করেছি মৃত্যুশলাকা-তপ্ত সীসা! আমাদের অনুতাপ কোন্ হাবিয়া দোযখের আগুন নিভাতে পারে? আমরা আমাদের কোন পাপকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অধিকার রাখি? আমাদের জীবনের যতো বলাৎকার প্রবণতা, যতো কুমারীর শ্লীলতাহানি হয়েছে আমার এবং আমাদের অন্ধতায়; কোন কারণে আমি এবং আমরা ক্ষমার অধিকার পাবো? পৃথিবীর সমস্ত থুথু যদি কোনো অতিবৃষ্টির মৌসুমে ভিজিয়ে দিয়ে যায় আমাদের পঙ্কিল কলংকিত জীবন, তবু কী আমরা শুদ্ধ হবার অবকাশ পাবো?
জীবনের শেষ স্বীকারোক্তি কেন দিয়ে যাবো জবানবন্দীতে ? আমি বাঁচতে চাই আরও একশ বছর, আমি দেখে যেতে চাই এ শ্যামল বঙ্গভূমির মানুষ শিষ্ট-সুসভ্য হয়েছে, আমরা সবাই পরমতসহিষ্ণু হয়েছি, পথে পথে আমরা সবাই ধৈর্যশীল বৃক্ষ, শিখেছি রিপুর নিয়ন্ত্রণ এবং আমরা সম্পন্ন মানুষ সবাই! আমাদের সাহসী পিতার দেয়া স্বপ্নগুলো নিরাপদ-নির্বিঘ্ন। সভ্যতার শত্রু যারা, পশ্চাদপদ-কূপমণ্ডুক যারা, যারা স্বপ্নযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে সর্বৈব পরাজিত, কিন্তু নিঃশ্চিহ্ন নির্বংশ নয়; যারা ষড়যন্ত্রী, মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখে প্রতিহিংসার আগুন, কৃতঘ্ন-নৃসংশ ওরা; সারল্যের সুডৌল স্তনাগ্র চুষে কামজাগাতে তৎপর; ষড়যন্ত্র এবং কামক্রিয়ায় বংশবিস্তারে বিশেষ পারঙ্গম। পিতৃহত্যায় ওরাই নেপথ্যচারী-অগ্রণী। আমি জানি আমাদের মতো তোমরাও ভালোবাসো পিতার সৌর্য-বীর্যের ইতিহাস, মাতৃপ্রেমে তোমাদেরও রয়েছে হৃদকম্পন; আত্মত্যাগের সাহস রয়েছে তোমাদেরও। তবু বিষক্রিয়া আর মিথ্যাচারে কলঙ্কিত আজ। নিজের অজন্তে যেনো অভিশপ্ত ইডিপাস!
প্রকৃতিকে আমরা ধর্ষণ করেছি বারবার, প্রকৃতির কোলে যারা নিরাপদ ছিলো লোকজীবনের সাথে, লুণ্ঠণ করেছি তাদের সারল্য, তাদের ভূমির অধিকারে করেছি অন্যায্য হস্তক্ষেপ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্পদ করেছি তছনছ। আমাদের সবকটি অপকর্ম অভিনন্দিত হয়েছে প্রত্যেকের কাছে; সুতরাং প্রত্যেকেই আমরা সমান অপরাধী! যারা কুমুদিনী হাজংয়ের নামে টিলা বরাদ্দ করেছে, রাশিমনির স্মৃতিতে সৌধ করেছে নির্মাণ, আর বরাদ্দের বারোআনা করেছে তসরুপ, ইতিহাসে অমরতা পেতে আন্তর্জাতিক বরাদ্দ সংগ্রহে সেজেছে সুবোধ-সুবেশ চাঁদাবাজ; তারা আমাদের কেউ কেউকেটা-বোয়াল। আমি ঘরে ঘরে জনে জনে সততার করি নিবিড় সন্ধান, আমার নিজের রক্তে প্রবহমান পিশাচ দণ্ডিত হবে কি আজ!?

 

(চলবে……)

 

লেখকের ই-মেইলঃ swatantro@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...