ওবায়দুল কাদেরের কাউয়া তত্ত্ব, কাউয়া রক্ষকদের চিহ্নিত করুন

রফিকুল আনোয়ার :: দেশে আলোচিত তত্ব যেন শেষ হচ্ছে না। বিরোধী দলের ঝাকুনিতে রানা প্লাজার ধ্বস কিংবা ‘আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’ এসব বক্তব্য এখনও জনগন ভুলেনি। এরশাদ সরকারের আমলে জাতীয় প্রেসক্লাবে হামলা প্রসঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ‘অন্ধকারে পুলিশ প্রেসক্লাব টাহর করতে পারেনি’। এ রকতম বাহারি বক্তব্য-বিবৃতি শুনে অভ্যস্ত জাতি যুগের পর যুগ। উল্লেখিত বক্তব্য বিবৃতি ছিল চলমান কোন ঘটনার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে।

ইদানিং ক্ষমমতাসীন দলের ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের কাছ থেকে আসছে বা বলা হচ্ছে তা নিজ দলকে কেন্দ্র করে। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ জাতীয় নেতা ওভায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেবার পর পরই উঠে পড়ে লেছেন দলকে সুসংগঠিত করতে। ইতিমধ্যে দলের কয়েকটি অংগ ও সহযোগি সম্মেলনও সম্পন্ন করেছেন ইতিমধ্যে। দীর্ঘ দিন দল ক্ষমতায় থাকার সুবাধে দলে অনুপ্রবেশ করেছে সুবিধাবাদী একটি গোষ্টি। এই অনুপ্রবেশকারীদেও দাপটে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোনঠাসা হয়ে পয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারীদের আচরনে তটস’ থাকেন দলের নেতা-কর্মীরা। এটা দলের সব পর্যায়ের উপলব্ধি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখাচ্ছেন না কেউ। মনে হয় যে বিড়ালের গলার ঘন্টা বাধার কেউ নেই।

ওবায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেবার পর পরই এই সকল হাইব্রিড নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেন। দলের যে কোন সভা-সমাবেশে তিনি প্রকাশ্যেই ঘোষনা করেন ‘দলে সুবিধাবাদীতে জায়গা হবে না’ সুবিধাবাদীদের দলের পদ-পদবী থেকে সওে যাওয়ার আহ্বান জানান। কিন’, দুঃখ জনক হলেও সত্য যে তার এই আহ্বান খুব বেশী কার্যকর হতে দেখা যায়নি। বরং দিনে দিনে মনে হচ্ছে তারাই দল নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছে। ওভায়দুল কাদেরের উপসি’তিতেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে হাইব্রিড নেতাদের বিশাল ফেন্টুন, বাহারি রংগের পোষ্টার টানিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে তাই প্রশ্ন ওভায়দুল কাদের কি হাইব্রিডদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন ? নাকি ওদের অস্তিত্ব দলে খুবই প্রভাবশালী এমনাটা বুঝতে পরেছেন ?

গত বুধবার সিলেটের আওয়ামী লীগৈর মতবিনিময় সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওভায়দুল কাদেরের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমত হইচৈ ফেলে দিয়েছে। ‘দলে কাউয়া ঠুকেছে’ তার এই বক্তব্য দলের ভিতর বাইওে গণমাধ্যমে এমনকি স্যোসাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। উড়ে আসা জুড়ে বসা রাজনৈতিক দোকানদারদের প্রতি এমন ইংগিত করে তিনি এমন বক্তব্য রেখেছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আবার রাজনৈতিক মহলে তার এই সাহসী বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিও উপস্থাপন করছেন কেউ কেউ। রাজনৈতিক মহলের ‘লীগ’ ‘বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে’ গড়ে উঠা রাঝনেতিক দোকানদারদের নিয়ে নানা সমালোচনা অনেক দিনের্‌ই। আওয়ামী লীগ নেতারা এই বিষয়ে কথা না বললেও দীর্ঘ সময় পরে ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য দলের ত্যাগী নেতা-কর্মী, সমর্থদেরই মনে কথার প্রতিধ্বনী হচ্ছে।

‘জয় ডিজিটাল মাতা শেখ হাসিনা আইসিটি লীগ’ নামে নতুন একটি সংগঠনের ব্যানার ও কার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এর আগে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী সজীব ওয়াজেদ জয় লীগ’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। আরও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু আদর্শ বাস্তবায়ন সংসদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ বাস্তবায়ন লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শিশু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু জাতীয় লেখক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা লীগ, বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ, চেতনায় মুজিব, আমরা মুজিব সেনা, বঙ্গমাতা পরিষদ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, জননেত্রীর সৈনিক, জননেত্রী পরিষদ, দেশরত্ন পরিষদ, রাসেল মেমোরিয়াল একাডেমি, শেখ রাসেল শিশু সংসদ, শেখ রাসেল শিশু পরিষদ, সজীব ওয়াজেদ জয় পরিষদ, ড. এম এ ওয়াজেদ ফাউন্ডেশন প্রভৃতি।

ওবায়দুল কাদেরের কাউয়া তত্ত্ব, ‘আওয়ামী’ ও ‘লীগ’ শব্দ ব্যবহার করে গড়ে তোলা সংগঠনগুলো হচ্ছে আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী হকার্স লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী শিশু যুব সাংস্কৃতিক জোট, আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী যুব স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী শিশু-কিশোর লীগ, আওয়ামী অভিভাবক লীগ, আওয়ামী কর্মজীবী লীগ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী প্রচার ও প্রকাশনা লীগ, আওয়ামী নবীন লীগ, আওয়ামী স্বাধীনতা লীগ, আওয়ামী বাস্তুহারা লীগ, আওয়ামী ইয়াং বাংলা লীগ, আওয়ামী সৈনিক প্লাটুন, মুক্তিযোদ্ধা লীগ, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, তরীকত লীগ, চলচ্চিত্র লীগ, মত্‌স্যজীবী লীগ, ছিন্নমূল মত্‌স্যজীবী লীগ, ক্ষুদ্র মৎ্‌স্যজীবী লীগ, রিকশা মালিক লীগ, রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্মচারী লীগ, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, ঘাট শ্রমিক লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও গণমুক্তি আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার কল্যাণ পরিষদ, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী, স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি প্রতিরোধ কমিটি, প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী সংগঠন, মুক্তিযুদ্ধ সমাজকল্যাণ যুব সংঘ, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংস্থা, আমরা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, স্বাধীনতা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পরিষদ, বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরিষদ প্রভৃতি। এর বাইরেও ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ সংগঠন দাবি করে গড়ে ওঠা বাহারি নামে আরও কিছু সংগঠনের অস্তিত্ব্বর খোঁজ পাওয়া গেছে।

এগুলো হচ্ছে আমরা নৌকা প্রজন্ম, নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী, নৌকার নতুন প্রজন্ম, ডিজিটাল আওয়ামী লীগ, ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিষদ, বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন, সাধনা সংসদ, জাতীয় মুক্তিবাহিনী ’৭৫, জনতার প্রত্যাশা, ২১ আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, পরিবর্তন ফাউন্ডেশন, সোনার বাংলা গঠন পরিষদ, সম্মিলিত যুব-পেশাজীবী পরিষদ, অরোরা ফাউন্ডেশন প্রভৃতি।

ওবাদুল কাদের রাজনৈতিক এই দোকানদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে উপসি’ত না হতে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধ করেছেন বার বার। গণমাধ্যম কর্মীদের তাদের সংবাদ যাতে প্রচার না করেন সেই অনুরোধ করেছেন। প্রয়োজনে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।

ওবায়দুল কাদেরের কাউয়া তত্ত্ব, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আওয়ামী রাজনীতিতে যাদের ছায়াও কখনো দেখা য়ায়নি তারা ক্ষমতার স্বাধভোগ করার জন্যই এই সকল রাজনৈতিক দোকান খুণে বসেছেন। এই ফাকে হয়তো ‘স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির এজন্টরাও এই সকল দোকানের মালিক যেজে বসেছেন। তারাও দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে নানাভাবে ব্যবহার করছেন এই সকল রাজনৈতিক দোকানগুলোকে। আর ওবায়দুল কাদের বিয়টি আঁচ করতে পরেছেন বলেই আবিষ্কার করেছেন এই ‘কাউয়া’ তত্ত্বের।

২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হবার পরে বিএনপি, জাসদ, জাতীয় পার্টি কোন কোন ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্নস্তরের নেতাদের আওয়ামী লীগে যোগদানের হিরিক পড়ে। আর এই সকল সুবিধাবাধিরা দলে প্রবেশ করেই দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের কোনঠাসা করার কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

বয়সে প্রবীণ হলেও ওবায়দুল কাদের তরুনের মতই কাজ করে যাচ্ছেন দলের জন্য। প্রায় প্রতিদিনই মন্ত্রনালয়ের বাইরেও একাধিক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যো দেয়া, প্রায় নিয়মিত অফিস করা এখন তার নিত্যদিনের বিষয়। তার মত সময় যদি দলের অন্যনেতারাও দলের জন্য দিতেন তাহলে আওয়ামী লীগ সেরা দলেই পরিনত হতো।

তবে রাজনৈতিক মহলে আরেকটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে। আর সেটি হলো লীগের নামে গঠিত বিভিন্ন ভ’ইফোড় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঢালাওভাবে কাউয়া উপাধি দেয়া সমুচিত হবে কি ? কারণ এই সকল সংগঠনগুলোর সাধারণ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা কিন্তু অন্ধ দল ভক্ত। তারা সুবিধাভোগি শ্রেণী নয়। তারা দলকে ভালবেসেই অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত হন। আবার অনেকেই রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকান্ডে থাকলেও হাইব্রিডদের কারণে দলে জায়গা করতে পারেননি বলেই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য দোকান খুলে বসেছেন। তাদের সংগঠন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তারা কিন্তু দলের ত্যাগি নেতা-কর্মী। কে তাদের এই দোকন খোলা এই বিষয়টিও ওবায়দুল কাদেরকে ভাবতে হবে।

রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করেন ‘কাউয়া’ নিজে থেকে দলে প্রবেশ করে নাই। নেতৃত্বের ব্যর্থতা বা নেতৃত্বের অবহেলার কারণেই তারা দলে প্রবেশ করেছে। এদরকে আগে চিহ্নি করতে হবে। কারা এরা ? কোথা থেকে এদের আগমন ? এদের প্রবেশের পিছনে কারা ?
এই সকল কিছু ভেবে দলকে সাজাতে হবে। কাউয়া মুক্ত দল গঠনে সফল হতে হবে। আর এটাই হলো ওবায়দুল কাদেরের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে তিনি বিজয়ী হলে দল মুক্ত হবে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, দেশের উন্নয়নের ধারাও অব্যাহত থাকবে।

ওবায়দুল কাদেরের কাউয়া তত্ত্ব,

লেখক, রফিকুল আনোয়ার

 

লেখক:  সম্পাদক, দৈনিক নোয়াখালী প্রতিদিন ও আহ্বায়ক, নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সমন্বয় কমিটি। ইমেইল: noakhalipratidin@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক নেই কেন?

স্টাফ রিপোর্টার :: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত ...