এ অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অচল হয়ে পরেছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারছে না। এ অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়? বাংলাদেশের শিক্ষাসূচি অনুযায়ী নভেম্বর-ডিসেম্বরেই পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার মৌসুম এটা। কিন্তু টানা হরতাল-অবরোধে সব ভেসেত্ম যাচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পরেছে দেশের শিক্ষাজীবন। হরতাল-অবরোধ সহিংসতায় দেশের পুরো শিড়্গাব্যবস্থা থমকে দাঁড়িয়েছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের চলমান বার্ষিক পরীক্ষা রাজনৈতিক কর্মসূচীর কারনে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্তরে ৪ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এর বাইরে এই চার কোটি শিক্ষার্থী আজ চরম অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমরা জানি শিক্ষাই সমৃদ্ধির চাবি কাঠি। এটিই ব্যক্তি ও জাতির ভাগ্য-পরিবর্তনে এটিই শ্রেষ্ঠ ও সহজতর পথ। শিক্ষা এজন্যই জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু পরীক্ষ বারবার পেছানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বষের্র পরীক্ষা একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। আটকে থাকছে বিভিন্ন বষের্র ভাইভা পরীক্ষা। উপরন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। তারা এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে চলে পরীড়্গা দেওয়ার জন্য। সার্বিকভাবে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই সংকট দূর করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান সংকটের মূলে আমাদের দেশের কু-রাজনীতি। আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশের চেয়ে ড়্গমতাকে বেশি ভালোবাসেন। মানুষের জীবনের মূল্য যেখানে নেই সেখানে তাদের কাছে শিড়্গাতো গৌণ হবেই। শিক্ষার্থীরা পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হওয়ার ভয়ে আজ ঘর থেকে বের হয় না। ইতোমধ্যে আগুনে পুড়ে মারা গেছে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী। এ অবস্থায় শিড়্গার্থীরা রাজনীতিবিদদের ওপর বেশ বীতশ্রদ্ধ। আমাদের রাজনীতিবিদদের ভূলে গেলে চলবে না যে এরাই একদিন আগামী দিনের ভবিষ্যত। বাংলাদেশের এই চার কোটি শিক্ষার্থীই একদিন ভোটার হবে। এদের কাছেই একদিন আপনাদের ভোট চাইতে যেতে হবে। কোন মুখে ভোট চাইতে যাবেন আপনারা?

এ সময়টাতেই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়।  ডিসেম্বরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরন করা হয়। সময়টা কেন রাজনীতিবিদদের বিবেচনায় নেই। রাজনীতি কি তাদের কাছে মুখ্য। শিড়্গা আর শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে বিবেচ্য নয় কেন? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষার্থী পর্যন্ত প্রত্যেকেই এক মহাসংকটকাল অতিক্রম করছে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবিতে এবং সমঝোতা ছাড়াই তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বিরোধী দলের ডাকা একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচির কবলে পড়ে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের এই বেহাল দশা। পরীক্ষার এই মৌসুমে বারবার পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করেও দিশা পাচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন। ফলে ছুটির দিনেও নিতে হচ্ছে ক্লাস-পরীক্ষা। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার দিন স্কুলে বা কলেজে গিয়ে জানতে পারছে, পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এঅবস্থায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ের মধ্যে উত্‌কণ্ঠা কাজ করছে। দেশ ও জাতির উন্নতির বেশিরভাগ নিভর্র করে শিড়্গিত সমাজ ও মানুষের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকার কতটা সচেতন দেশের মানুষকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে? কিন্তু আমরা শিড়্গা প্রসারে কতটা সচেতন তা অবরোধআর  হরতালে একের পর এক পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়াতেই বুঝতে পারি। আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে শিক্ষার বিষয়টি কেন মুখ্য হলো না। শিক্ষা এতটাই গৌণ যে সপ্তাহের ৬ দিনই কোমল মতি শিড়্গার্থীদের পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে কতটা হোচট খাচ্ছে শিড়্গার্থীরা। রাজনৈতিক কর্মসূচির জাঁতাকলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোও যুক্ত হওয়ায় ঠিক কবে পিছিয়ে পড়া পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হবে সে নিশ্চয়তা শিক্ষাসংশিস্নষ্ট কেউও দিতে পারছেন না। এতে করে খুদে শিক্ষার্থীদের ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবে পুরো জাতিকেই একদিন ভুগতে হবে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে দুরে সরে আসে। এ অবস্থায় বিদ্যালয় থেকে ঝড়ে যাবে অনেক শিক্ষার্থী। দেশ-জাতিকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি গুরুত্বে নিয়ে তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সব ধরনের সংকট থেকে মুক্ত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন এটিই সবার প্রত্যাশা।

অভিভাবক, সচেতন মহল এবং শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা চলাকালীন এই মৌসুমে আশা করেছিলেন, বিরোধী দল শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে তারা বিবেচনাপ্রসূত কর্মসূচি আহ্বান করবেন। শিড়্গা ব্যবস্থাকে বিপর্যসত্ম করে তোলার মতো নীতিবিরুদ্ধ দায় হয়তো তারা নেবেন না। কিন্তু সর্বসাধারণের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।  বরং হরতাল, অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির কারণে পরীক্ষার নির্ধারিত সময়সূচি শুধু পরিবর্তনই হয়নি, কবে নাগাদ তা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। কেবল স্কুল পর্যায়ে নয়, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা ও পরীড়্গার কাজ দারম্নণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বাথের্র প্রশ্নে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কখনই বিবেচনা পায় না। তারা শিক্ষা জায়গাটাতেও নুন্যতম ছাড় দিতে নারাজ। তা না হলে অন্ত জেএসসির প্রথম দিনে শত আপত্তিতেও হরতাল দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দায়ীত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। রাজনীতিবিদদের এই খামখেয়ালী কর্মকান্ডের মারপ্যাঁচে পড়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রায় ৩০ লাখ শিশু। শিক্ষা খাতের যে বিপর্যস্ত নেমে এসেছে তা কোনোভাবেই আশাব্যঞ্জক নয়। ধিক্‌ সেই রাজনীতিকে। দুর্ভাগ্যের এখানেই কিন্তু শেষ নয়। সামনে অবধারিতভাবেই রয়েছে সেশনজট এবং তা কত দীর্ঘায়িত হবে, কেউ বলতে পারে না। এর দায় কে নেবে? একান্তই রাজনীতিকদের এ দায়। কিছুতেই তারা এ দায় এড়াতে পারেন না। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে চলতি বছর বার্ষিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কিনা তা একটি প্রশ্নের বিষয়। অতীতে কখনো কোনো রাজনৈতিক সংকটকালে এমন কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। আমরা এই অনভিপ্রেত ও অকাম্য পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মান্যবর নেতানেত্রীদের কৃপা প্রার্থনা করছি এবং আশা করছি ৪ কোটি শিক্ষার্থীর প্রতি তাদের কৃপা প্রদর্শিত হবে এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করতে অনত্মত এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। নিদেন পক্ষে ছুটির দিন অর্থাৎ শত্রু ও শনিবার সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে রেখে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি দয়া দেখানো হবে বলে ধারা করা হচ্ছিলো। রাজনৈতিক কর্মসূচি কয়েকটি দিনের জন্য স্থগিত রেখে স্কুলের বার্ষিক পরীড়্গা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেওয়া কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু যারা জেনেশুনে পরীড়্গার দিনে হরতাল-অবরোধ ডাকে, তাদের আছে এমন আবেদন অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছুই নয়।

দেশের নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে দেশের শিড়্গা ব্যবস্থা আজ বিপর্যস্ত। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এ ধরনের অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেন না সহসা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচির কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে পড়ালেখা, বন্ধ থাকছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পিছিয়ে যাচ্ছে নির্ধারিত পরীক্ষা।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেখা দিচ্ছে সেশনজট এবং দুশ্চিন্তা-দুর্ভোগ বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নভেম্বর-ডিসেম্বরে চারটি বড় পাবলিক পরীক্ষা যথাক্রমে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি), প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীড়্গা রয়েছে। এই চারটি পরীক্ষায় প্রায় ৫০ লাখ শিড়্গার্থী অংশ নিচ্ছে। ইতিমধ্যে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা যদিও শেষ হয়েছে, কিন্তু তা বার বার অবরোধ-হরতালের কবলে পড়ে। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীর পরীড়্গার সিডিউল তিন দফায় পরিবর্তন করতে হয়েছে।

একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নভেম্বরের মাঝামাঝি মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা এবং ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রাথমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেয়ে অনেকেই পরীক্ষা এগিয়ে আনেন। কিন্তু এটাও পড়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে। কবে নাগাদ এসব পরীক্ষা শেষ করা যাবে তা কেউই বলতে পারছেন না। এ অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...