এবারও বড় অংকের লোকসানের আশঙ্কা জয়পুরহাট চিনিকল

৯০ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে গত ২৫নভেম্বর দেশের বৃহত্তম চিনিকল- জয়পুরহাট সুগার মিলস্‌ লিমিটেডের ৪৯তম আখ মাড়াই আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরম্নর মাত্র ৫দিনের মাথায় গত ৩০নভেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে হঠাৎ চিনি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফ্যাক্টরীর শ্রমিক-কর্মকর্তাদের অক্লানত্ম চেষ্টায় অবশেষে  ১ডিসেম্বর দুপুর যান্ত্রিক ত্রুটি সাড়ানোর পর পুনরায় শুরম্ন হয় এ চিনিকলের আখ মাড়াই। একদিকে প্রয়োজনীয় আখ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে এমনি ভাবে চালুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আকস্মিক মিল বন্ধ হওয়ার এই ঘটনাটিকে চলতি মৌসুমে চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন সংশিস্নষ্টরা।

আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা ২ লাখ মেট্রিক টন হলেও অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখের মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার কারনে জয়পুরহাট চিনিকল নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকায়(জোনে) আশঙ্কাজনক ভাবে আখ চাষ কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে এ চিনিকলের আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে মাত্র ৮০হাজার মেট্রিক টন। যা  বিগত বছর গুলোর চাইতে সবচেয়ে কম সময়।তারপরও মাড়াইরে জন্য এ চিনিকলে উলেস্নখিত পুরো ৮০হাজার মেট্রিক টন আখের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কিনা- তা নিয়ে শঙ্কিত মিল কর্তৃপক্ষ। এমনি অবস্থায় প্রয়োজনীয় আখের অভাবে এবারও এ চিনিকলে চিনি উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর তাতে বিগত কয়েক বছরের ন্যায় চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে আবারও জয়পুরহাট চিনিকলকে বড় অংকের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।

চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, এবার ৬ হাজার আখ চাষির মাঝে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১ হাজার ৮শ ৫ একর জমিতে উন্নত পদ্ধতিতে (এসটিপি) আখ চাষের জন্য ৫ হাজার আখ চাষির মধ্যে ৮৩ লাখ টাকা ভূর্তকি প্রদান করা হয়েছে। সরকার আখের মূল্য বৃদ্ধি করায় এবার আখ চাষীদের মধ্যে আখ চাষে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারের মাড়াই মৌসুম থেকে এ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছে বলে চিনিকল কর্তৃপক্ষ জানান ।

জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদ উলস্ন্লাহ্‌ জানান, সরকার এবার মিল গেটে প্রতি কুইন্টাল (১০০ কেজি) আখের মূল্য ২শ ৫০ টাকা ও মিল গেটের বাইরে বহিঃ কেন্দ্রে ২শ ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে ছিল মিল গেটে ২শ ২২ দশমিক ৩৭ টাকা ও বাইরে ২শ ১৭ টাকা। চলতি মৌসুমে আখের অভাবে এবার মিল চলবে ৫০ থেকে ৫৫ দিন। তবে সরকার এবার আখের মূল্য বাড়ানোর ফলে আগামী মৌসুমে প্রায় দ্বিগুন আখ পাওয়া যাবে এবং লোকশানের পরিমানও অনেক কমে আসবে। চিনিকল কর্তৃপক্ষ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে ইতিমধ্যে লিফলেট বিতরণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০১১-২০১২ রোপন মৌসুমে ১৪ হাজার একর জমিতে আখ রোপনে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২শ ৫০ হেক্টর জমিতে আখ রোপন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

চলতি ২০১১- ২০১২ইং আখ মাড়াই মৌসুমে এ চিনিকলে ৮০হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৬ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। এবার আখ থেকে চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছে ৭দশমিক ৫০ শতাংশ। আখ চাষ হয়েছে মাত্র ১০হাজার হেক্টর জমিতে। ফলে গতবারের মতই এবারও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আখের অভাব হবে। আর এ আখ সংকটের কারনে প্রাপ্ত আখে এই মিল চলবে দুই মাসেরও কম। এমনি অবস্থায় আখের অভাবে এ চিনিকলে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যহত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আখের অভাবে এবারও এ চিনিকলে চিনি উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত আখে বড়জোর মিল চলতে পারে  ৫০থেকে ৫৫ দিন,তাই গত কয়েক বছরের মত এবারও জয়পুরহাট সুগার মিলস্‌ লিমিটেডকে  বড় অংকের লোকসানের গুনতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশিস্নষ্টরা। ফলে এবারও যে বিশাল অংকের লোকসান প্রায় নিশ্চিত। গত মাড়াই মৌসুমে ১লাখ মেট্রিক টন আখমাড়াই করে চিনি উৎপাদন হয়েছিল ৬হাজার মেট্রিক টন। গত বছর ১২হাজার একর জমিতে আখের চাষ হয়েছিল।তাই নির্ধারিত আখের আগেই মিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।মাড়াই হয়েছিল মাত্র ৬৭ দিন। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় লোকসান হয়েছিল প্রায় ১২কোটি টাকা।এর আগের অধিকাংশ বছর গুলোতেও একই কারনে লোকসান করেছে মিলটি।

আশঙ্কাজনক ভাবে আখ চাষ কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে মাত্র ৮০হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। চিনিকল নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকায়(জোনে) যতটা আখ চাষ হয় তার মধ্যে এ চিনিকল নিয়ন্ত্রনাধীন নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর, মান্দা এলকাার আখ পুরোটাই চলে যায় গুড় তৈরিকারকদের কাছে।কারণ তারা বেশি দামে আখ কিনে থাকে।কিন্তু আখের দাম বৃদ্ধির কারনে হয়তো বা সে ক্ষেত্রে  অধিকাংশ চাষীরাই এখন চিনিকলের আখ সরবরাহে উৎসাহী হবে।যদি আখচাষীরা বেশি পরিমানে আখ চাষ করতো এবং তার সবটাই চিনিকলে সরবরাহ করতো, তবে ওই আখ মাড়াই করে এ চিনিকলের লোকসান অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

জয়পুরহাট চিনিকল আখচাষী কল্যাণ সমিতির সাধারন সম্পাদক খাজা নাজিম উদ্দিন বলেন,‘সরকার এবার আখের মূল্য ৮৮টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৯৮টাকা (মিলগেটে)করায় আখ  চাষের প্রতি কিছুটা উৎসাহীত হলেও এই মূল্য বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, আখের চাষ বাড়াতে চাইলে অবশ্যই আখের মূল্য আরও বাড়াতে হবে। নতুবা নায্য দাম না পাওয়ায় আখচাষ থেকে চাষীরা পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিবে,তারপরও যতটুকু আখচাষ করবে-বেশি দাম পাওয়ায় তার সবটুকু দিয়ে দিবে গুড় উৎপাদনকারীদের। ফলে আখের অভাবে এক সময় দেশের এই বৃহৎ ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর এ ভাবে লোকসান গুনতে গুনতে এক সময় বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য । তাই এ শিল্পটিকে বাঁচাতে এর একমাত্র কাঁচামাল- ‘আখের চাষ’ বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। আর সে কারনেই সময় থাকতেই আখের মূল্য আরও বাড়ানো  সহ উন্নত জাতের আখের বীজ উদ্ভাবন সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি এ অঞ্চলের সকল আখচাষীদের।’ এ দিকে এ চিনিকলটি অনেক পুরনো হওয়ায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে- এমন  আশঙ্কা সংশিস্নষ্ট শ্রমিক-কর্মকর্তাদের।

১৯৬২ সালে জয়পুরহাট চিনিকল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে মোট ৪৮ টি আখ মাড়াই মৌসুম পার করেছে জয়পুরহাট চিনিকল। গত ৪৮ বছরের মধ্যে চিনিকল কর্তৃপক্ষ লাভ করেছে মাত্র ১৫ টি মাড়াই মৌসুমে আর লোকসান করেছে ৩৩ টি মাড়াই মৌসুমে । বর্তমানে চিনিকলের মোট দায় রয়েছে ৯০ কোটি টাকা। প্রতি মৌসুমে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা- কর্মচারীদের পাওনা এবং ব্যাংক সুদ বাবদ মিলকে গচ্চা দিতে হচ্ছে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ফলে চিনিকল চালু থাকলে প্রতি বছর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ১০ কোটি টাকা করে লোকসান দিতে হয়। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে জানা গেছে, উন্নতজাতের আখের বীজ উদ্ভাবন না হওয়ায় আখ চাষে লাভ কম হয় তাই এলাকার কৃষকরা আখ চাষের প্রতি খুব একটা আগ্রহী নয়। এছাড়া প্রতিবছর মেইনটেনেন্সের নামে বিপুল পরিমান অর্থ লোপাট, চিনি ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারনে অবিক্রিত চিনি থাকার ফলে মিলটিতে লাভ না হয়ে লোকসান হচ্ছে । এ ব্যাপারে সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এলাকাবাসী ।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/এস এম শফিকুল ইসলাম/জয়পুরহাট

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকা

ষ্টাফ রিপোর্টার :: দেশে বর্তমানে ঋণখেলাপির সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ ...