ব্রেকিং নিউজ

একটি মৃত্যু ও বেপরোয়া ছাত্রলীগ

বিজয় দিবসের প্রারম্ভে আমরা শুধু আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ভাই বোনদের, আমাদের ছেলে মেয়েদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। বিশ্ববিদ্যালয় যেন পড়া লিখা আর সংস্কৃতি চর্চার প্রান কেন্দ্র হয়, যুদ্ধ ক্ষেত্র নয় !

adsfadsaনূসরাত ইমা ::

দৈনিক পত্রিকা গুলোতে সুন্দরবন ছাড়া আর একটা শিরোনামে চোখ আটকে গেলো।এই ধরণের শিরোনাম এখন বলা যায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিছু দিন পর পরই এমন শিরোনাম আসছে পত্রিকাগুলোতে ।

ছাত্রলীগ নিজেদের মাঝে মারামারি করেছে আর প্রথম বর্ষের একজন তার বলি হয়ছে। ছেলেটার নাম তাপশ সরকার।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র । খুব বড় কোন বিষয় নিয়ে তাকে প্রান দিতে হয়নি ।

এমন একটা বিষয়ে ছেলেটার প্রান গেলো যে অবিশ্বাস্য মনে হয়। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ বেদীতে ফুল দেওয়া নিয়েই তাদের দুই গ্রুপের মাঝে বাকবিতণ্ডা । ফলাফল সংঘর্ষ । আর তাপসের মৃত্যু।

ভাবলে অবাক লাগে। এই এতো তুচ্ছ একটা ঘটনা নিয়ে কেন এরা এতটা উত্তেজিত  হয়ে ওঠে? প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত ছাত্রলীগ তাদের অসহিস্নুতার চরম দৃষ্টান্ত দিয়ে চলেছে। কিছুদিন আগে সিলেটের শাহাজালাল বিজ্ঞান প্রজুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই ঘটনা ঘটলো ।

একটা কথা আছে কাক কখন কাকের মাংস খায় না কিন্তু এরাতো কাক নয় । এরা নিজেরা নিজেদের খুন করতে পিছপা হয় না। এরা ঠাণ্ডা মাথায় নিজেরই সহকর্মীর বুকে গুলি চালায়।

তাপস সরকার । বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বেশিরভাগ ছাত্রের মতোই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে ছিল। বাবুল সরকার, অঞ্জলি সরকারের পাঁচ সন্তানের মাঝে তৃতীয় । তাপসের বড় ভাই বিক্রয় কর্মী হেসেবে কাজ করেন। তিনিই ভাইয়ের লেখা পড়ার খরচ চালাতেন । অপেক্ষায় ছিলেন ভাই একদিন পড়া লিখা শেষ করবে তারপর সংসারটা টেনে নিয়ে যেতে তাকে সাহায্য করবে।

এই কথা ভেবেই উদয়স্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। এই পরিবারটির কথা ভাবুন।কম বেশি একই অবস্থা যারা রাজনীতির বলি হন তাদের পরিবারের। অনেকের হয়তো অর্থ কষ্ট নেই কিন্তু সন্তান হারানোর বেদনা? ভাই হারানোর শুন্যতা ? কে পূরণ করবে?

প্রথম বর্ষের একটা ছেলে। হয়তো হলে সিট পেতেই যোগ দিয়েছিলো ছত্রলীগে । যেটা বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তে এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। আমি দেখেছি আমারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন মেয়েদের অনেকেই মেধানুসারে হলে সিট পেলেও ছেলেদের হলে এটা কখনই হতোনা।

আমাদের ছেলে সহপাঠীদের প্রায় সবাইকেই কোন না কোন দলের বড়ভাই কে ধরে দলে যোগ দিয়ে হলে উঠতে হয়েছে। আর হলে উঠলে দলের কার্যক্রমে থাকতেই হবে সেটা ক্লাস না করে হলেও । নাহলে সেই ছেলেকে হলে থাকতে দেওয়া হতো  না।

তাপসও হয়ত এই হল রাজনীতিরই স্বীকার। এই রাজনীতি থেকে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো কে মুক্ত করতে না পারলে আরও কত তাপস এর স্বীকার হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

গত ছয় বছরে ছাত্রলীগের নিজেদের মাঝে সংঘর্ষে ৪০ জন নেতা কর্মী প্রান হারিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ হয়েছে। ৪০ টি তাজা প্রান।ভাবা যায়?ছাত্রলীগ এতটাই বেপরোয়া হয়ে গেছে যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও তারা কানে তুলছেনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্রলীগের দুই পক্ষের মাঝে বেশ কয়েক মাস ধরেই সংঘর্ষ চলছিল।

এটা এতোটাই চরমে পৌঁছেছিল যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ গিয়েছে আর তাই প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে এই সংঘর্ষ বন্ধ করার এবং ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা আনার নির্দেশ দেন। তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়েই উশৃঙ্খল কর্মীদের দল থেকে বের করে দেওয়ার কথাও বলেন।

কিন্তু তার মাত্র ১ মাস ২ দিনের মাথায়ই ছাত্রলীগ তাদের আর একজন কর্মী কে হত্যা করল। তার মানে কি দাঁড়ালো ছাত্রলীগ খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেরও তোয়াক্কা করলনা?

ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের মেরুদণ্ড হতে পারতো। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা এবং ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীয় নেতা এই ছাত্রলীগ থেকেই উঠে আসার কথা ছিল। ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের শক্তি হতে পারতো । কিন্তু বর্তমান নেতারা সেটা করতে পারেননি। তাদেরকে নানান সময়ে হাতিয়ার হেসেবে ব্যবহার করেছেন।

এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের নিয়ন্ত্রন তো করতে পারছেনই না বরং তারা ছাত্রলীগের হাতেই জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আওয়ামীলীগের জন্যে যে এটা কত বড় হুমকি সেটা বুঝতে রাজনীতি বিশ্লেষক অথবা বড় রাজনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার মত সাধারণ মানুষই বলতে পারে।

এখনো সময় আছে যদি ছাত্রলীগ কে নিয়ন্ত্রন করতে না পারেন তাহলে শুধু আওয়ামীলীগই না এই দেশের সাধারণ মানুষও চরম বিপদে পড়বে। আর একজন সাধারন মানুষ হিসেবে, আমজনতার অংশ হিসেবে আমি ভীত-শঙ্কিত। আমি চাই না আমার কোন ভাই/বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরুক।

বিজয় দিবসের প্রারম্ভে আমরা শুধু আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ভাই বোনদের, আমাদের ছেলে মেয়েদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। বিশ্ববিদ্যালয় যেন পড়া লিখা আর সংস্কৃতি চর্চার প্রান কেন্দ্র হয়, যুদ্ধ ক্ষেত্র নয় !

লেখক: ফ্রিল্যান্স লেখক, ইমেইল: haider_nusrat@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

Tahmina Shilpi 01

আশ্রয় নয় নির্ভরতা চাই

আশ্রয় নয় নির্ভরতা চাই। না মানে ঠিক নির্ভরতা নয়, ভরসা চাই। না, ...