‘একজন মায়াবতী’ ‘মানবী’ ‘মৃন্ময়ী’ বলছি

ব্‌ববকতাহমিনা শিল্পী :: ‘বাদশাহ নামদার’ (হুমায়ূন আহমেদ)’! আজ আমি কোথাও যাব না’। কি ভাবছ ‘আজ হিমুর বিয়ে?’। কিন্তু না, আজ সেইদিন যেদিন তুমি ‘উড়ালপঙ্খি’ হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলে ‘অনন্ত নক্ষত্র বীথি’-তে। ‘দেখা না দেখা’ ‘লিলুয়া বাতাস’ যদিও তোমাকে করেছে ‘নীল মানুষ’। যদিও তুমি এখন ‘অচিন পুরের বাসিন্দা’। আর ‘রাবনের দেশে আমি এবং আমরা’। তবুও তোমাকে শুভেচ্ছা পৌঁছাবার ‘হিজিবিজি’ ভাবনায় ‘দেয়াল’ তুলেছি ‘আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি’। আচ্ছা কি দেব তোমায়? ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’! নাকি ‘ম্যাজিক মুন্সি’ কে ডেকে কিছু ম্যাজিক দেখাব তোমায়? জানি তোমার ‘এখন মেঘের ওপর বাড়ি’। তবুও ‘মাতাল হাওয়া’-য় কান পেতে থাকি ‘কে কথা কয়?’ কিন্তু না ‘কোথাও কেউ নেই’। ‘লীলাবতী’-র ‘পারাপার’ সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে ‘দিনের শেষে’ ‘একা একা’ তাকিয়ে থাকি। ভাবি ‘দিঘির জলে কার ছায়া গো?’। ‘যখনি নামিবে আঁধার’ ‘তেঁতুল বনে জোছনা’ ছড়াবে চাঁদ। তবুও ‘সে সময়’ কেউ বলবে না ‘আমিই মিসির আলী’। ‘যদিও সন্ধ্যা’ তবুও আমি ‘মধ্যাহ্ন’-ই ভাবছি। ‘এই শুভ্র এই’ ‘আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রন’। ‘বৃষ্টি বিলাস’-এ ‘ব্যাঙ কন্যা এলেং’ তোমায় ডাকছে যে। সে তোমায় ‘রূপার পালংক’ পেতে দেবে। ‘কুটুমিয়া’ তুমি আসবে তো? নইলে যে ‘এই বসন্তে’ ‘নক্ষত্রের রাতে’ ‘হিমুর নীল জোছনা’-য় ‘লীলাবতীর মৃত্যু অবধারিত’।

আজ ১৯ জুলাই প্রয়াণ দিবসে প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ তোমাকে সশ্রদ্ধ সালাম। বহুদিনের ইচ্ছে পুরোণ করতেই সেদিন বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের স্বপ্নের স্বর্গ নুহাশ পল্লীতে। সারাদিন গানে-গানে, হৈ-হুল্লোরে কেটেছিল সবার। কিন্তু কোথায় যেন বারবার ছন্দপতনের একটা সুর পাচ্ছিলাম থেকে থেকে। আমার মত বাকি সবাই পাচ্ছিল কিনা জানি না। তবে আমার কাছে ছন্দহীন সে সুরটা যে কতটা করুন আর স্পষ্ট হয়ে বেজেছিল, তা কেবল আমিই অনুভব করেছিলাম। সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে দেখলাম নুহাশ পল্লী। সত্যিই এক সবুজের শান্তিময় স্বর্গ যেন এটি।

বুিৃককৃুতকতনুহাশ পল্লীর সর্বত্র হুমায়ুন আহমেদকেই অনুভব করেছিলাম। আকাশে-বাতাসে, প্রতিটি গাছের নিশ্বাসে শুনতে পাচ্ছিলাম তাঁরই নাম। আমার মনে হয়েছিল নুহাশ পল্লীর কোথাও না কোথাও থেকে তিনি তাঁর এই ভক্তকে ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন। এভাবেই অদ্ভুত এক ভাললাগায় কেটে গেল দিন। তারপর সন্ধ্যা হতেই বাজল বিদায় ঘন্টা। বুকের ভিতর কেন যেন সুক্ষ একটা ব্যাথা অনুভুব করছিলাম।মনে হচ্ছিল যেন খুব প্রিয় কিছু এখানে ফেলে যাচ্ছি। তাই সবাই যখন গাড়িতে মালপত্র উঠাতে ব্যাস্ত। আমি তখন নুহাশ পল্লীর এক কোণে বসে আমার পড়া হুমায়ুন আহমেদের কিছু বইয়ের নাম দিয়ে একটা চিঠি লিখে ফেললাম। আর চুপিচুপি রেখে এলাম যেখানে ঘুমিয়ে আছেন প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ। অবুঝ ভক্তের লিখা এই চিঠি নিশ্চই পৌঁছে যাবে তাঁর কাছে।

হুমায়ুন আহমেদ নামটার সাথে যখন আমার পরিচয় হয় তখন আমি অষ্টম শ্রেনীতে। আমাদের বাসায় বরাবরই বই পড়ার প্রচলন ছিল। আমার বাবার ছিলো ছোট আলমারী ভর্তি বই ।কিন্তু সেসব বই ছিল কঠিন কঠিন ভাষায় লিখা, আর ভারী ভারী বক্তব্যে ঠাঁসা। তার বেশীর ভাগই বোধগম্য হয়নি আমার। আর ছিল কিছু ধর্মীয় বই।এমনকি একটা ইঞ্জিল শরীফ ও সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল। তাই বাবাকে দেখেই বোধ হয় বই পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছিল।

কিন্তু বাসা থেকে বলা হতো- পাঠ্য বইয়ের বাইরে গল্পের বই (নভেল) পড়া নিষেধ। নিষেধ উপেক্ষা করে বই গল্পের বই (নভেল) পড়তে সাহস হয়নি কখনো। কিন্তু নিষেধই বোধহয় ইচ্ছেটাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার এক সহপাঠীর অনেক গল্পের বই ছিল। একদিন তার কাছ থেকে হুমায়ুন আহমেদ-এর একটা বই নিয়ে পড়লাম । “আয়নাঘর” খুব ভালো লাগলো। বই ফেরত দেয়ার শর্তে তার কাছ থেকে বই নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। পাঠ্যবইয়ে তখন আর মন বসে না। কখন গল্পের বই শেষ করবো সেই চিন্তা ঘুরপাক খেতো সারাক্ষন।এখন ভাবতেই অবাক লাগে, একদিনে আমি তাঁর লেখা চারটি বই পড়েছিলাম।

যাইহোক হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েই, আমার বই পড়ার প্রতি ভালবাসা জন্মায়। তাঁর বই পড়েই আমি ভালোলাগা-মন্দলাগা, ভালোবাসা-মন্দবাসা, খারাপ এবং ভালোর পার্থক্য জানতে পেরেছিলাম। নারীত্বের প্রতি বোধদয় হয়েছিল। আর নারীত্বের প্রতি মমতাও জন্মেছিল তাঁর বই পড়েই। হুমায়ূন আহমেদের লেখনীতে কি যে এক আর্কষণ, মুগ্ধতা আর আবেশ সে কেবল তাঁর ভক্তরাই বুঝতে পারে। ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে জোছনা রাতে ঘুরতে যাওয়া, তাকে নিয়ে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া, মনের ভেতর ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সুপ্ত স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলা। কিছু না বলেও ভালোবাসাকে গভীর ভাবে বোঝানো সত্যিই ‘অতিব সুন্দর’।

সত্যি বলতে কি, হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে সেইসময় একটু একটু করে ভালোবাসার অনুভূতি জেগেছিল। তখন ভাবতাম আমিও নীল শাড়ি, নীল টিপ পড়ে রূপা সাজবো। মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়বো, জোছনার আলোয় স্নান করব, চাঁদ দেখব। সাথে থাকবে ভালবাসার মানুষ হিমু। সে থাকবে খালি পায়ে, হলুদ পাঞ্জাবী পরে। হাতে নিয়ে আসবে কদম ফুল। যখন সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসবে, তখন আমি সেই ফুল খোঁপায় পরে জলভরা কোন এক মাঠে তাকে নিয়ে নাচব।

লেখকের ইমেইল :  tahmina_shilpi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আরিফ চৌধুরী শুভ

বই পড়ার মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র ৬০ পয়সা!

আরিফ চৌধুরী শুভ :: একুশ শতকের গ্রন্থাগার এখন আর কেবল জ্ঞানের সংগ্রহশালাই নয়, ...