ব্রেকিং নিউজ

একজন বাদল স্যার এবং আমার সংগীত অনুরাগী হয়ে উঠা!

তাহমিনা শিল্পীতাহমিনা শিল্পী :: আজ সকালে অচেনা নম্বর থেকে একটি ফোন এলো আমার মুঠোফোনে। নিয়ম মাফিক যথেষ্ট ভদ্রাচিত ভাবে সালাম দিয়ে রিসিভ করলাম। অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ এলো-‘শিল্পী? আমি বাদল স্যার’। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, খুশিতে কেঁদে ফেললাম। বহুদিনের কাঙ্খিত ছিল ফোনটি। কিন্তু সত্যিই কখনো আসবে ধারনা করিনি। সেই থেকেই আবেগের বন্যায় ভেসে যাচ্ছি! উড়ে বেড়াচ্ছি ভালো লাগায়। এতটাই আনন্দিত, আর এতটাই আপ্লুত আমি যে, বুহুদিন পর আজ প্রাণ খুলে গাইতে ইচ্ছে করছে- ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী/আমি অবাক হয়ে শুনি/কেবল শুনি…’। কিম্বা- ‘সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে/শোন শোন পিতা/কহ কানে কানে/শোনাও প্রাণে প্রাণে/মঙ্গল বারতা’

জহিরুল হক বাদল। আমার অতি প্রিয় বাদল স্যার। অসাধারন বাচনভঙ্গীতে গোল গোল করে,সুন্দর,শুদ্ধ উচ্চারনে কথা বলেন।অসম্ভব সৎ,পরিশ্রমী আর মেধাবী মানুষ তিনি। শান্তি নিকেতন থেকে রবীন্দ্রসংগীতে পড়াশুনা করেছেন। কলকাতার বীরভূম জেলার পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী বসবাস শুরু করেছিলেন প্রায় তিন যুগ আগে। আমার সুযোগ হয়েছিল এই অসাধারন মানুষটির কাছে গানের তালিম নেয়ার।

আমি যখন মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডামীর একজন অতি ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থী। প্রতিদিন রেওয়াজ তো দূরে থাক, একাডামির ক্লাসের পর বাড়ীতে করতে দেয়া গানটাও অনুশীন করি না। শুধুমাত্র মায়ের বকুনির ভয়ে আর মাকে খুশি করতেই হারমোনিয়াম ধরি। তখন বাদল স্যার তাঁর ভালবাসার যাদুতে আমাকে গানের অনুরাগী করে তুলেছিলেন। শুধুমাত্র তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় আমার পক্ষে রবীন্দ্রসংগীতের তৃতীয় বর্ষের দোড় পেরুনো সম্ভব হয়েছিল।

অসাধারন মায়া ছিল স্যারের কণ্ঠে। তাঁর সুরে মুগ্ধ থাকতাম আমরা সবাই।প্রতিটি গান স্যারের গলায় এমনভাবে বসে যেত,যেন মনে হতো এই গানটা বাদল স্যার ছাড়া অন্যকেউ গাইলে বোধ হয় ভালো লাগত না। অদ্ভুত একটা ব্যাপার খেয়াল করতাম। সেসময়ে স্যারের বেশ বয়স হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গান গাওয়ার সময়ে তাঁর সুরে কিম্বা গায়কীতে বয়সটা কোনভাবেই বোঝা যেত না। অসম্ভব বিনয়ী আর আর প্রচার বিমুখ ছিলেন বাদল স্যার। বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী হওয়া সত্তেও কোন এক অজানা অভিমান থেকে কখনো গান গাইতেন না। গানের শিক্ষকদেরকে গুরুজী কিম্বা ওস্তাদজী বলে সম্বোধন করার প্রচলিত নিয়ম থাকলেও স্যার আমাদেরকে গুরুজী অথবা ওস্তাদজী বলতে দিতেন না। বরং বলতেন- ‘গুরু কিম্বা ওস্তাদ হওয়া বিশাল ব্যাপার! আমি এখনো অতোটা বড় হতে পারিনি। তোমরা আমাকে স্যারই বলবে’

বাদল স্যার মনে মনে আমাকে তাঁর কন্যা ভেবে নিয়ে সাধনার সবটুকু আমাকে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি নিতে পারিনি। ক্ষমা করে দিবেন স্যার। সময়, সুযোগ, ইচ্ছে, নানা পারিপার্শ্বিকতা আর বাস্তবতার টানাপোড়নে সেভাবে আর চর্চাও রাখতে পারিনি। হারমোনিয়ামটা ঘুন পোকায় কেঁটেছে। টিউনটাও ঠিক আগের মতো নাই। কিন্তু আমার ঘরে, আমার মনে সারাবেলা গান বেজে চলে।

তাহমিনা শিল্পী

ছবিতে বাদল স্যার পিছনের সারিতে সবার বামে বসে আছেন

গানের প্রতি এ অসম্ভব ভালবাসাটা বাঁচিয়ে রেখেছি আজও, শুধু মাত্র স্যারের ভালবাসার কথা মনে করেই। বাদল স্যার যেমন আমাকে কন্যাতুল্য স্নেহ করতেন। আমারো তেমনি ভালবাসার কোন কমতি ছিল না স্যারের প্রতি। কিন্তু সময়ের দাবীতে যেমন অনেক কাছের মানুষদের থেকে আমরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাই। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু আমার শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় স্যার আছেন সবসময় পিতার আসনে। আগে ফোনে কথা হত। কিন্তু স্যারের ফোন নম্বর ও ঠিকানা পরিবর্তন হওয়ায় অনেকদিন দেখা হয়নি, কথাও হয়নি।

কিন্তু মনে মনে একটা আশা ছিল, বিশ্বাসও ছিল স্যার নিজেই কোন একদিন আমাকে খুঁজে নিবেন। আজ স্যার ঠিকই আমাকে ফোন করলেন। বললেন- এখন তাঁর বয়সটা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।তাই উত্তরা থেকে মিরপুর আসতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু আমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কত কথা বলার ছিল, কত কথা জানানোর ছিল। কিন্তু আবেগ আর ভাললাগায় আমি বলতে পারলাম না তার কিছুই।

সত্যিই কিছু কিছু অনুভুতি থাকে যা যত ভাবেই বুঝানো হোক না কেন, মনে হবে তা যথার্থ হয়নি। কিছু কিছু ভালবাসা থাকে যার সবটুকু প্রকাশ করার পরেও মনে হয় এখনো কিছুই বলা হয়নি। এটা আমার তেমনি এক ভালবাসা, তেমনি এক অনুভুতি। ভাল থাকবেন স্যার, খুব ভাল। সশ্রদ্ধ সালাম আর অফুরান ভালবাসা আপনাকে। কথা দিচ্ছি স্যার দেখা হবে শীঘ্রই এবং অবশ্যই আপনার প্রিয় গানটি শুনিয়ে আসব এবার- আমার সকল দুঃখের প্রদীপ/ জ্বেলে দিবস, গেলে করব নিবেদন-/ আমার ব্যাথার পূজা হয়নি সমাপন !

লেখকের ইমেইল: tahmina_shilpi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...