ইলিশ ধরা পড়ছে: জেলেদের স্বস্তি

 ইলিশ ধরা পড়ছে: জেলেদের স্বস্তিমুজাহিদুল ইসলাম সোহেল. নোয়াখালী প্রতিনিধি :: মেঘনা নদীতে দস্যুদের উপদ্রব এমন নেতিবাচক খবর ভারাক্রান্ত করলেও দু-তিন বছর ধরে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে পাল্টেছে নোয়াখালীর চিত্র। মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা, বঙ্গোপসাগর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বামনিয়া ও মেঘনা নদীতে। মহাজনের দাদনে জর্জরিত জেলেদের আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি সমৃদ্ধ হচ্ছে জেলার অর্থনীতি। প্রতি মৌসুমে গড়ে ২০ হাজার টনেরও বেশি ইলিশ আহরিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য নূন্যতম ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।

নোয়াখালী জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ অঞ্চল থেকে ইলিশ আহরিত হয়েছে ২০ হাজার ৭৬৯ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৫৫৮, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২০ হাজার ৬৫ দশমিক ৭৪ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ হাজার ২১০ দশমিক ২৫ টন। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ২০ হাজার টনের বেশি ইলিশ আহরিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরেই মূলত বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের বামনিয়া ও মেঘনার আংশিকেও পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য দপ্তরের হিসাবে, নদী ও সাগরে ইলিশ ধরার ইঞ্জিনচালিতসহ নৌকা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০টি। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩১ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাতিয়ায়। এছাড়া মৌসুমি পাইকারি ব্যবসায়ী, নিয়মিত আড়ৎদার, ক্ষদ্র ব্যবসায়ী ও নৌকার মালিক তো রয়েছেনই।

জেলা মৎস্যজীবী সমিতি ও বোট মালিক সমিতির তথ্যমতে, জেলে, বোট মালিক, পাইকারি-খুচরা ও আড়তদার মিলিয়ে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এ মৌসুমে নিবন্ধিতসহ দুই হাজারেরও বেশি নৌকা নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ করছে। তাদের দাবি, মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে ইলিশ আহরিত হচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যমানের।

মৎস্য দপ্তর জানায়, জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস ইলিশ আহরণের মৌসুম। তবে ভাদ্র-আশ্বিন সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। প্রায় দুই হাজার খোপে (বিচরণক্ষেত্র) মাছ আহরণ করা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ছোট নৌকাগুলো ৫০-৬০ মণ ও বড় নৌকাগুলো ১০০ থেকে ৪০০ মণ পর্যন্ত মাছ শিকার করে ঘাটে ভিড়ছে।

ইলিশের মোকামগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হাতিয়ার জাহাজমারা, চেয়ারম্যান ঘাট, নিঝুমদ্বীপ, লইড্ডার ঘাট, কাজীর বাজার, টাংকির ঘাট, ঘোপটাখালী, বৌবাজার, নলচিরা ঘাট, তমুরদ্দী ঘাট, চেঙ্গার ঘাট, চেয়ারম্যান বাজার, বাংলাবাজার, সূর্যমুখী, বুড়ির দৌন, রহমত ঘাট, কোম্পানীগঞ্জের চরলেংটা ঘাট, মুছাপুর ঘাট ও সুবর্ণচরের সাবা চৌধুরীর ঘাট।

ইদানীং ইলিশ আহরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে, বোট মালিক, পাইকারি-খুচরা ও আড়ৎদাররা বেশ লাভবান হচ্ছেন। জেলার ইলিশের অর্থনীতি দিন দিন বড় হচ্ছে। বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। বিশেষ করে জেলেরা ঋণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন।

হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাটের মাঝি আলী আকবর বলেন, ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় পাঁচ বছর ইলিশ তেমন ধরা পড়েনি। দুই মৌসুম আগেও প্রায় ১ লাখ টাকা ঋণ ছিল তার। গত মৌসুমে তিনি ঋণমুক্ত হয়েছেন। চলতি মৌসুমেও বেশ ভালো ইলিশ ধরা পড়ছে। যদিও মাছের আকার ছোট। তার পরও ভালোই লাভ থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।

সুবর্ণচর উপজেলার চরমজিদ এলাকার বোট মালিক নিজাম উদ্দিন মিয়া বলেন, তার আটটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলছে মেঘনায়। তার অধীনে কাজ করেন ১২০ জন জেলে। চলতি মৌসুমে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ব্যবসা করার আশা করছেন তিনি। গত কয়েক বছরে এই ইলিশ ব্যবসা তার ভাগ্য ফিরিয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে সুবর্ণচরের জেলেদের মধ্যে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন।

তবে এই অবস্থা ধরে রাখতে নিয়মিত নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা ঠিক রাখার দাবি জানিয়েছেন হাতিয়া বোট মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ নবির উদ্দিন।

এদিকে নোয়াখালী মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নাহিদ বলেন, প্রজনন মৌসুমে জেলেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাবে। গত দু-তিন বছর জেলেরা সরকারি সহযোগিতা পাওয়ায় এ বছর ইলিশ আহরণ হচ্ছে ভালো। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও তৎপরতা ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোতালেব হোসেন বলেন, জেলেরা একটু সচেতন হলে বা প্রজননের সময় ইলিশ ধরা বন্ধ রাখলে নদীতে ইলিশের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এতে জেলেরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। বন্ধ মৌসুমে জেলেদের জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সম্প্রতি নোয়াখালীতে মৎস্য প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন। তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

তবে সাগর ও নদীতে এখনো দস্যুদের উৎপাত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। ইলিশ মৌসুমে এক ডজনেরও বেশি দস্যু বাহিনী সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের কারণে অনেক বোট মালিক নিঃস্ব হয়ে গেছেন। শত শত জেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও চলতি মৌসুমে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে।

এ বিষয়ে র‌্যাব-১১ এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (সিনিয়র এএসপি) জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, র‌্যাব নদী ও সাগরে দস্যু নির্মূলে হাতিয়া ও হাতিয়ার বাইরেও একাধিক অভিযান চালিয়েছে। পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও সহযোগিতা করেছে। একাধিক দূধর্ষ বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার ও প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার সুফল চলতি মৌসুমে পাওয়া যাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বৃহত্তর ঐক্যের যাত্রা শুরু

ষ্টাফ রিপোর্টার ::  জামায়াতসহ কয়েকটি ইস্যুতে মতপার্থক্যের মধ্যেই অবশেষে এক মঞ্চে আসলেন ...