ব্রেকিং নিউজ

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে!

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে!
শৌল বৈরাগী ::ইতিহাস কিন্তু সব সময়ই আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায়। হয়তো বা আমরা তা কখনো গ্রহণ করি আবার কখনো গ্রহণ করি না বা মনে রাখি না বা ভুলে যায়। দেশের নব্বই ভাগ জনগণের নিশ্চয়ে মনে আছে ২০১৩ সালের শাহবাগের গনজাগরণ মঞ্চের কথা। সে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল স্বতঃষ্ফুর্ত ভাবে। কাদের মোল্লার ফাঁসি না হওয়াতে জনগণ রাস্তায় নেমে আসছে – জড়ো হয়েছে শাহবাগে। মানুষ প্রথম দিকে সেখানে নিশ্চিন্তে গেছে।
সেখানে ছিল না কোন ভয়, কোন পুলিশী লাঠি চার্জ, কোন বিপক্ষ দল।ছিল না কোন রাজনৈতিক নেতা বা তাদের কোন ঝাঁঝালো বক্তৃতা। যে যারমত বক্তৃতা করেছে, শ্লোগান দিয়েছে। কে কার আগে বা পরে দিল সে বিষয়ে কারো কোন প্রশ্নই ছিল না। সেখানে দেখেছি শিশুরা মায়ের হাত ধরে আসছে, মা-ও তার সন্তানকে নিয়ে সেখানে অংশগ্রহন করেছে বিনা টেনশনে কোন ভয়ভীতি ছাড়াই। সেখানে দেখেছি শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ লোক পর্যন্ত। সবাই ভয়হীন। সেখানে কোন রাজনৈতিক শ্লোগান ছিল না ছিল না কোন নেতা। যে যার মত আসছে, শ্লোগান দিয়েছে, আন্দোলনে শরীক হয়েছে ভয়ডরহীন ভাবে। সেখানে জনগণেরও কোন কমতি ছিল না। কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। এটা ছিল নিতান্তই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন।
কিন্তু জনগণ দেখেছে আন্দোলনের দিন যত বেশী হয়েছে ততবেশী বিভক্তি হয়েছে। দিন যত পার হতে থাকল আস্তে আস্তে রাজনৈতিক পোক ঢুকতে শুরু করল বা বলা যায় যে এক শ্রেনীর রাজনীতিবিদ বিভক্তি পোকা ঢুকিয়ে দিল। একদিন যে আন্দোলন ছিল একমুখী তা হতে শুরু করল বহুমুখী। দেখা দিল বিভক্তি। গনজাগরণ মঞ্জ আর এক থাকতে পারল না। রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কোণ থেকে তাদের আধিপত্ত বা সেই কুসংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিল। গণজাগরণ মঞ্চ (চেতনা) হয়ে গেল লীগ দল ইত্যাদি। ঢুকে গেল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, আওয়ামীলীগ, বিএনপি, আরো কতো কি! বিভক্ত হয়ে গেল মঞ্চ (ফিজিক্যালি)। এক এক মঞ্চ এক এক জায়গায়।
বদলে গেল শ্লোগানের ধরণ। অনেকের চরিত্রেই কালিমা মাখানো খেলা শুরু হয়ে গেল। জন্ম নিল কত গল্প, কত গুজব। সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ল বিভ্রান্ত। পারল না আস্থা রাখতে আর গণজাগরণ মঞ্চের ‍উপর। সৃষ্টি হলো হাজারো মতবাদ, হাজারে চিন্তা, হাজারো ক্ষুদ্র মঞ্চ। আর সবই সম্ভব হলো আমাদের দেশের অতীব চতুর ও বুদ্ধিবাম (?) সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বদৌলতে। গণজাগরণ মঞ্চ হয়ে গেল রাজনীতিকরণ! শেষ হয়ে গেল একটি চেতনা।
আজ ২০১৮ সাল। ঘটনার সূত্রপাত দু’জন ছাত্র/ছাত্রীকে জাবালেনূর নামক একটি পরিবহনের পাল্লপাল্লিতে নিহত হওয়া নিয়ে। ঘটনা যত ছড়িয়ে পড়ল ক্ষোভ তত বাড়তে থাকল। প্রথমে স্বল্প পরিসরে অবরোধ, মানব বন্ধন। কিন্তু আমাদের এক শ্রেনীর পুলিশের অতি প্রভূভক্তের কারনে কচি ছেলেমেয়েদের উপর অত্যাচারের ফলে ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এল। তাদেরও গণজাগরণ মঞ্চের মত কোন নেতা নাই। নাই কোন নেতৃত্ব। সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত।
তাদের হাতে নাই কোন লাঠি, কোন ইট পাটকেল, কোন আগ্নেয়াস্ত, কোন পেট্রোল বোম বা এ জাতীয় কোন কিছু। সম্পূর্ণ খালি হাতে বন্ধুকে ভাল বেসে রাস্তায় নেমে এল। এতো চেতনা, আন্দোলনের এত মিল কে কখন দেখেছে বলেন। আন্দোলনে কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলের কোন সামান্যতম উসকানি নাই। সম্পূর্নভাবে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন।
কিন্তু অতীব দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি যে ইতিমধ্যেই এ আন্দোলনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক খাতে প্রবাহিত করার পাঁয়তারা শুরু হয়ে গেছে। একটি দলতো সরাসরি জামাত শিবিরকে দোষারোপ করছে যে, তারা (জামাত-শিবির) নাকি ছাত্রদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করছে। কি অর্বাচীন কথা বা চিন্তা। সব কিছুর মধ্যেই যদি যুদ্ধাপোরাধী, জামাত-শিবির-বিরোধী দল এ ধরণের ইস্যু টেনে এনে জনগণকে বোবা করে রাখার পাঁয়তারা করা হয় তবে তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে।
আজ আবার দেখলাম নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বলছেন যে ‘বিএনপি’র কথায় তিনি পদত্যাগ করবেন না।’ বিষয়টা তো বিএনপি’র নয়। এটা এখন গন-দাবী। বিএনপি হয়তো অনুষ্ঠানিকভাবে কোথায়ও বলে থাকলে বলতে পারেন কিন্তু দাবীটা এখন কিন্তু গন-দাবী, দাবীটা কিন্তু গোটা ছাত্র সমাজসহ সব মানুষের। কই গত চারদিন যাবৎ রাজধানীর অফিসগামী জনগণ সকালে ও বিকালে পায়ে হেটে অফিসে যাচ্ছে আসতে তাদের কারো মধ্যেইতো কোন বিরক্তির ভাব নেই। প্রয়োজন হলে আরো একমাস পায়ে হেটে অফিস করবে কিন্তু একটা সুষ্ঠ নিয়ম ও সিষ্টেম প্রতিষ্ঠিত হোক – এটাই কিন্তু জনদাবী।
গত চারদিনে কি কোন অফিসগামী যাত্রী কোন মিডিয়ায় একবারও বলছেন যে অফিসে যেতে পারছেন না। কষ্ট হচ্ছে কিন্তু আন্দোলনকে কিন্তু সমর্থন করে যাচ্ছেন। তাই রাজনৈতিক ফায়দা কামানোর জন্য কোন অপ রাজনীতি বা অপ কূটচাল চালবেন না। কেন প্রধান মন্ত্রী যে আপনাকে ভৎর্সনা করছেন তাকি আপনার জন্য অপমান নয় – তা কি আপনার পদত্যাগের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই কোন ধরণের অপ কৌশল এর অবলম্বন করবেন না।
যাহোক, যা বলতে ছিলাম দেশ মেরামত’র একটি কাজ চলছে। আর অনেকেই এ বিষয়টাকে রাজনীতিকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাই সকল রাজনৈতিক দলকে বলব এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলবেন না। তারা খারাপ কিছুই করছেন না। বরং আপনার রাজনৈতিক ফায়দা যদি লুফতেই হয়ে তবে এখানে সত্যকে সত্য বলেই সমর্থন করুন। আপনাদের কারো কাজ করতে বা মাঠে নামতে হবে না।
কই আমাদের দক্ষ পুলিশবাহিনীর লজ্জা করে না। তারা কোনটি ফিটনেস ছাড়া গাড়ী, আর কার লাইসেন্স আছে কার নাই তাতো খুঁজে বের করতে পারছে না। অথচ আমাদের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা তা পুলিশের সামনেই বের করছে। বের করছে কোনটি ফিটনেস বিহীন গাড়ী। সবই ঘুষের উপর চলে তাই তারা বের করতে পারেন না। পুলিশের লজ্জা হওয়া উচিৎ। দায়িত্ব পুলিশ এবং যাদের নেয়ার কথা নেন তবেই ছাত্ররা ফিরে যাবে তাদের পড়ার ঘরে, ফিরে যাবে তাদের স্কুল কলেজে। যে পুলিশ অন্যের লাইসেন্স চেক করে তারতো নিজেরই লাইসেন্স নাই। তবে সে অন্যের লাইসেন্স চেক করার কি অধিকার রাখে। সরকারকে দলের উর্ধে উঠে দায়িত্ববোধ থেকে এবং জনগণের কথা চিন্তা করে এসব কিছু দেখতে হবে।
ঢাকার শহরের বাসগুলোর কন্ট্রাকটর, ড্রাইভার, হেলপারদের যে আচরণ তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ভাড়া তো বেশী নেয়-ই সাথে শিক্ষিত, ভদ্র, চাকুরজিীবিদের যেভাবে আর যে ভাষায় কথা বলে তা শুধু অপমানজনকই নয়। সুইসাইডও করতে ইচ্ছা হয়।
আন্দোলন যত দীর্ঘায়ূ হবে ততই রাজনীতিকরণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং রাজনীতি জড়াবে। ছাত্ররা যে মেসেজ সরকারকে এবং জনগণকে দিতে চেয়েছে তা সবাই খুব ষ্পষ্টভাবেই পেয়েছে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে সবগুলো দাবী মেনে নিবে এবং তা পর্যায়ক্রমে বা দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করবে। রাজনীতিতে জড়ানোর আগে আন্দোলন স্থগিত (১ মাসের জন্য) করতে হবে এবং ঠিক একমাস পরে হয মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাত্র-ছাত্রীদের কাজে জবাব দিহি করবে প্রমানসহ।
এরকম কিছু দাবীসহ ছাত্রদের এ মুহূর্তে রাস্তা/আন্দোলন ছেড়ে বইয়ে মনোযোগ দিতে হবে। ঠিক একমাস পরে যদি দাবী পূরণ লক্ষিত পর্যায়ে না হয় তবে আবার আন্দেলন করতে হবে। এখন আন্দোলন চলমান রাখলে রাজনীতিকরণ হবে এবং শেষে ছাত্ররা ফেঁসে যাবে। তাই আসুন রাজনীতিকরণ হওয়ার আগে আমরা আন্দোলনকে নিরপেক্ষ রাখতে ষ্ট্রাটেজি অনুযায়ী অগ্রসর হই। তা নাহলে সমূহ বিপদ। তখন ঐ ছাত্র/ছাত্রীদের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে অন্যেরা খেয়ে যাবে।
২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের মত রাজনীতি ঢুকে ২০১৮ সালের ছাত্রদের যৌক্তিকদাবীগুলো এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন তিন টাকার ছাগলে খেয়ে ফেলুক তা কখনোই চাই না।
লেখক: টিম লিডার (চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প), ডরপ। মেইল: saul_boiragee@yahoo.ca
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রহিমা আক্তার মৌ

‘জল ও জীবন’

রহিমা আক্তার মৌ :: আমাদের প্রাণপ্রিয় নগরী ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। অপ্রিয় ...