ইতিহাসের কারিগর সিকদার আবুল বাশার

বাংলাদেশে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছিল কোম্পানি আমলে। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে এক প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে এ দেশে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইতিতহাসচর্চার নবযুগের সুচনা হলেও এ ধারাটি পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। ঊনিশ শতকে জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন জরিপ, গেজেটিয়ার ও বিবরণী প্রণয়নের মাধ্যমে ইংরেজ অফিসারগণ যে ধারাটির সূচনা করেন, তা পরবর্তীকালে অব্যাহত ছিল। ঊনিশ শতকের শেষ পর্যায় থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ সময়ে স্থানীয় ইতিহাস রচনার একটি স্রোতধারা প্রবলভাবে প্রবাহিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমাদের চোখে স্থানীয় ইতিহাসচর্চার সে বিষয়টি ম্লান হয়ে ধরা পড়ে।

যে জাতির ইতিহাস আছে, অথচ খোঁজ রাখে না, সে জাতি হতভাগ্য। স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাস ছাড়া কোনো জাতি তার জাতীয় পুর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করতে পারে না। সে ভাবনা থেকে হয়ত আমাদের ঐতিহ্য সন্ধানী ঐতিহাসিকরা স্থানীয় ইতিহাস সন্ধান ও নির্মাণ শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময় আমরা সে আদর্শ থেকে অনেকাংশে দূরে সরে পড়েছিলাম। সেটা হয়ত হয়েছিল অর্থনৈতিক কারণে। প্রেরণার দিকটিও একটি বিবেচ্য বিষয়।

সেই বন্ধ্যা সময় আমরা অতিক্রম করতে পেরেছিলাম ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। ভাষা আন্দোলন আমাদের গ্রন্থভিত্তিক জ্ঞানচর্চার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। একুশের গ্রন্থমেলা হয়ত এর একটি ঝলমলে প্রমাণ। কিন্তু সে অবস্থাতে আমরা অন্যান্য দিকে অগ্রসর হলেও, আমাদের স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তেমন তুলে আনতে সক্ষম হইনি, শুধু উদ্যোগের অভাবে।

দুই.

আমি মফস্বলের মানুষ। জন্ম থেকে সেখানেই বেড়ে ওঠা। অনেকে মফস্বল বলতে জেলা কিংবা উপজেলা শহরকে বুঝে থাকেন। আসলে আমি সে রকম মফস্বলের লোক নই। একেবারে পল্লীবাসী। যেখানে ক্ষেত, ফসল, বন আর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষজনের বসবাস। উপজেলা বা জেলাকে যারা বড় শহর বলে মনে করেন সেখান থেকেই আমি লিখতে চেষ্টা করি। কেমন লিখি সেটাও আমি জানি না। আমার প্রথম প্রকাশনা হয় গ্রামকেন্দ্রিক, ব্যক্তি উদ্যোগে। লেখার বিষয় নিজ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য,সংস্কৃতি। একুশের গ্রন্থমেলায় আমার যাওয়া-আসা আশির দশক থেকে। উদ্দেশ্য লেখার বিষয় সংক্রান্ত সহায়ক গ্রন্থের উদ্দেশ করা।

মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা আমার অঞ্চলের বিষয়। যা নিয়ে আমারা অহংকার করে বেড়াই। সে রকম বই খুজতে গিয়ে সন্ধান পাই গতিধারা নামক একটি প্রকাশনা সংস্থার। সেখান থেকেই পুণর্মুদ্রণ হয়েছে অনেক আগের প্রকাশিত দুষপ্রাপ্য ওই গ্রন্থগুলো। কেদারনাথ মজুমদারের ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণও সেই প্রকাশনী থেকেই পুণর্মুদ্রিত হয়েছে। তখন আমার একটি ধারণা জন্মেছিল গতিধারা প্রকাশনা’র স্বত্বাধিকারি হয়ত ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোক, সে কারণেই নিজ অঞ্চলের ওই দুষপ্রাপ্য গ্রন্থগুলো টাকা খরচ করে মুদ্রণ করেছেন। না হলে ময়মনসিংহের স্থানীয় ইতিহাস তিনি ছাপতে যাবেন কেন? এতে কত ব্যবসা হবে? ময়মনসিংহের কত পাঠক আছে, ওই বই কিনতে যাবে। পরের বছর অন্যান্য জেলারও দু-চারটি গ্রন্থ দেখি। আমার মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।

তিন.

আমার ধারনা ছিল ভুল। ডক্টর তপন বাগচী আমার সে ধারণা পাল্টে দিলেন। ইতোমধ্যে ডক্টর তপন আমার লেখা নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস গতিধারা থেকে পুনঃপ্রকাশের প্রস্তাব দিলেন। আমি এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। যেখান থেকে পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা, ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ প্রকাশিত হয়, সে প্রকাশনা থেকে আমার বই বের হবে, আমি রাজী না থাকারতো কোনো কারণ নেই। আমি লেখক হিসেবে নিজেকে কুলী ভাবতে শুরু করলাম।

সম্ভবত ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ফ্রেরুয়ারি মাসের কথা। ডক্টর তপন আমাকে তার বাংলাবাজারের কাছাকাছি বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে দুপুরের খাবারের পর নিয়ে গেলেন গতিধারা প্রকাশনা সংস্থার স্বত্বাধিকারী সিকদার আবুল বাশারের বাসায়। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। তখনো আমি বুঝতে পারিনি তিনিই সিকদার আবুল বাশার। ছিপছিপে গড়ন, মাথায় লম্বা চুল। প্রথম কথাটিই ঠেসদিয়ে বলা, ‘মর মতই না খাওইন্যা মানুষ।’ একেবারে বরিশালের আঞ্চলিক বাংলা। বুঝলাম বরিশালের মানুষ। আমি কথা কম বলতে চেষ্টা করছিলাম। কারণ লোকটাকে বুঝতে হবে। পাশের খাটে বসা মোটা করে একটি মানুষ। স্বভাবখানাও ভারী মনে হচ্ছিল। তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ডক্টর তপন বাগচী। তিনি রাজশাহীর শাহ মখদুম ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ ডক্টর তসিকুল ইসলাম রাজা। সহজেই রাজা ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে গেল। তিনিও আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা করেন।

পাশে বসে ‘ত্রয়ী নাটক’ নামের এটি গ্রন্থের প্রচ্ছদ করছেন সিকদার আবুল বাশার। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, একজন প্রকাশক নিজেই প্রচ্ছদশিল্পী? প্রচ্ছদের রঙের ব্যবহার আমাকে আরো মুগ্ধ করছিল। মনে হয়েছিল একজন পেশাদার শিল্পী কাজ করছেন। পরে জানলাম প্রচ্ছদে তার কৃতিত্ব আছে। একাধিক বার তিনি প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে জাতীয়ভাবে সম্মাননাও পেয়েছেন।

কাজের ফাঁকে আমার সঙ্গে কথাও বলছেন সিকদার আবুল বাশার। কথার ধরন এমন যেন তিনি আমার কত কালের চেনা-জানা মানুষ। জানলাম তিনিও স্থানীয় ইতিহাস চর্চা করেন। ঝালকাঠি জেলার ইতিহাস, পটুয়াখালী জেলার ইতিহাস তার লেখা গ্রন্থ। তিনি এইচ. বেভারেজ বিসিএস এর ‘দি ডিস্ট্রিক্ট অব বাকেরগঞ্জ’ গ্রন্থের অনুবাদও করেছেন। অনেক সম্পাদিত গ্রন্থও আছে তার। আমি মফস্বলের লেখক, তার কাছে এত সমাদর পাওয়ার তো কথা নয়?

কোনো লেখক নিজের টাকা খরচ করে দু’একটি গ্রন্থ প্রকাশ করতে পারলেই তো মফস্বলের লেখকদের লেখক বলে গণ্যই করেন না। বাংলাবাজার থেকে কোনো বই বের হলেতো কথাই নেই, একবারে কুলীন লেখক। মফস্বলের লেখক যেন তাদের সামনে নগণ্য। কিন্তু সিকদার আবুল বাশার আমার সঙ্গে কথা বলছেন, যেন আমি বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ, তিনি নির্মবর্গের। আমার বুঝতে আর বাকী রইল না সিকদার আবুল বাশার বড় মনের মানুষ। তিনি অন্যকে সম্মান দিতে জানেন। সুতরাং তিনি সম্মান পাওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

চার.

বাংলাবাজারের গতিধারা ঢাকায় আমার আড্ডাস্থলগুলোর একটি। একে একে আমার তিনটি বই গতিধারা থেকে প্রকাশিত। ঠোঁটকাটা সিকদার আবুল বাশার আমার বন্ধু। যা বলেন স্পষ্ট ভাষায় মুখের উপর। অনেক কথা বলার সময় বিশেষণ হিসেবে যে শব্দ তিনি চয়ন করেন, তা অনেকের কাছে শ্রুতিকটু হতে পারে। কিন্তু সত্যকথা নয় এ অপবাদ দিয়ে উঠতে পারবেন না। প্রতিটি মানুষের কথা বলার নিজস্ব একটি ভঙ্গি থাকে, হয়ত তার শব্দ চয়ন বা ভঙ্গির ভিন্নতা আছে। আমি বিষয়টি ওইভাবে গ্রহণ করি। শক্ত কথা বলার ওই মানুষটির মাঝে বিনম্র একটি ভাবের সঞ্চার আমি দেখেছি। মা প্রত্যেকের অতি প্রিয় একটি শব্দ তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মা শব্দটি সিকদার আবুল বাসারের কাছে যেন আরো অতি প্রিয় একটি শব্দ। তা আমি অনুভব  করেছি, এক দিনের ঘটনায়। যা আমি কোনো দিন ভুলব না। গ্রন্থ বাবদ সম্মানী দেয়ার সময় আমাকে তিনি প্রশ্ন করে ছিলেন- আইয়োব ভাই এ টাকাটা কোথায় খরচ করবেন। আমার উত্তর ছিল, প্রথমে মার জন্য একটা শাড়ি কিনব, বাকী টাকা কি করি পরে বুঝা যাবে। সিকদার আবুল বাশার যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন। হয়ত তার মাকে মনে পড়েছে। না হয় মা ও শাড়ি সংক্রান্ত কোন ঘটনা তাকে আবেগময় করে তুলেছে। আমি অনুভব করেছি তার হৃদয়ে মাতৃভক্তি তীব্র ভাবে কাজ করে। যে সন্তান তার মাকে সম্মান দিতে জানে, সে পৃথিবীর সকল মাকেই ভালবাসে।

পাঁচ.

সিকদার আবুল বাশার কি কখনো তার অঞ্চল থেকে নির্বাচন করে এম.পি হবেন? কিংবা ক্ষমতাবান হতে চান? তিনি পাঠাগার করেন, তিনি স্কুল করেন, দাতব্য চিকিৎসালয় করেন, সমাজের কথা বলেন। কেন? এটি আমার অনেক দিনের প্রশ্ন ছিল। তার উত্তর তিনি একদিন কথায় কথায় দিয়েছিলেন। জ্ঞানভিত্তিক একটি সমাজ তিনি দেখতে চান। সে থেকেই তার এত প্রয়াস। জীবনের একাংশে এসে তিনি সাহিত্য সংগঠন গতিধারা’র জন্ম দিয়েছিলেন। সে থেকে প্রকাশনা সংস্থা। সেখানেও সমাজের কথা তিনি ভেবেছেন। আমাদের হারিয়ে যাওয়া অতীতকে তিনি সামনে হলে এনে সমাজকে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন -আমারা এই ছিলাম, এই আমাদের হওয়া উচিৎ। তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে আমাদের ইতিহাসচর্চা একান্ত প্রয়োজন। আর তা শুরু করতে হবে স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে। গন্তব্য হবে জাতীয় পর্যায়ে। সে চেতনা থেকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাসের দুষপ্রাপ্য অধিকাংশ গ্রন্থ তিনি পুনর্মুদ্রণ করেছেন। নতুন লেখকদের তিনি উৎসাহিত করে অনেক জেলার ইতিহাস প্রণয়ন করিয়েছেন। তা সযত্নে প্রকাশও করেছেন। তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, একে একে প্রত্যেক জেলার ইতিহাস ছাপতে। সে কাজে সফলও হয়েছেন তিনি। প্রকাশকসহ শিক্ষিত সমাজকে বুঝাতে পেরেছেন তিনি, মানুষের নাড়ির টান বলতে একটি কঠিন শব্দ আছে। তা শুধু কথার কথা নয়। সাধারণ পাঠক কোনোনা কোনো জেলার মানুষ, তারা নাড়ির টানে জানতে চায় তার পূর্বপুরুষের কথা। তার জেলার ইতিহাস। সারাদেশে আজ স্বীকৃত যে কোআ সে্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থের প্রকাশক গতিধারা। সে কারণে বাংলাবাজারে গতিধারাকে বলা হয় ‘ইতিহাসের কারখানা’। সিকদার আবুল বাশার সে কারখানার কারিগর।

কোম্পানি আমলের শাসকশ্রেণি আমাদের জাতির অস্তিত্বর সন্ধান করতে স্থানীয় ইতিহাসচর্চার সূচনা করেছিলে। তার পূর্ণাঙ্গতা এনে দিলেন গতিধারার সিকদার আবুল বাশার। তাই তিনিও একদিন ইতিহাস হবেন এ বিশ্বাস আমার আছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বোরহান উদ্দিন

এলিয়েন বা ভিনগ্রহের মানুষ !

বোরহান উদ্দিন :: পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনো গ্রহে অন্য কোনো প্রাণী আছে কিনা ...