আহা, আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে

কানেকটিকাটআহা, আজি এ বসন্তে/কত ফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়…।ঋতুরাজ বসন্তের উদ্দেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ গানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বিদায় নিতে চলেছে ধুলট ফসলের কাল, প্রকৃতির রুক্ষতম ঋতু শীত।   

শীতের আগমণের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি বসন্তের অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে। এক সময় শেষ হয় সেই অপেক্ষা। প্রকৃতির সারা বছরের কলঙ্ক যে ঘুচে যাওয়ার পালা এবার। শীতের রুক্ষতায় সব কমনীয়তা হারিয়ে প্রকৃতি এখন রুক্ষ। বৃক্ষরাজির পাতা ধারণ করে হলুদ বর্ণ। পুরানো পাতারা ঝরে পড়ে ধুলায়। গায়ের মেঠো পথে পথিকের পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে শুকনো পাতারা মর্মর ধ্বনি তোলে। সে ধ্বনি পথিকের‌ কানে এসে বাংলা মাসের হিসাব মিলিয়ে দেয়। উদাসী হাওয়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলে বসন্ত যে এসেছে, আমাদের প্রিয় বসুন্ধরায়।  
  সব ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ছুঁয়ে চলে বাসন্তী পাগলা হাওয়া। শীতের রেখে যাওয়া পাতাশূন্য গাছে গাছে প্রাণচঞ্চল নতুন পাতারা পসরা মেলতে শুরু করেছ। পাতাশূন্য শিমুল বৃক্ষ ডালে ডালে ফুল সাজিয়ে এক অকৃত্রিম ফুলদানিতে রূপ নেয়।বৃক্ষলতা-পশুপাখি, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবে মায়াবী এক আবেশ। মনের সুখে বাজবে একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি/তাই নিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী।ঋতুচক্র যেন এখন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানতে চায় না। আজ ফাল্গুনের প্রথম দিন।ফুল ফুটুক আর না ফুটুক/আজ বসন্ত। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা জনপ্রিয় একটি লাইন, আবহমান বাংলার প্রকৃতিতে ফাগুনের ছোঁয়া, আগুনরাঙা বসন্তের মোহময় সুর। তরুণ-তরুণীরা আজ বাসন্তী রঙের পোশাকে নিজেকে রাঙাবে। প্রকৃতির ছোঁয়া নিতে প্রজাপতি মন নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। উৎসব আয়োজনে রাঙিয়ে দেবে নিজেকে। মিলেমিশে একাকার হওয়ার দিন আজ। বিভেদ-বিদ্বেষ, মান-অভিমান নয়। বসন্তের আগমনে পৃথিবীজুড়ে বাজবে আশাজাগানিয়া সুর। মধুর সুরে কোকিল গান গেয়ে উঠবে। শোক-তাপ ভুলে সবাই মেতে উঠবে বসন্ত আবাহনে। নগরজীবনেও বসন্ত ছন্দ তোলে মৃদু হিল্লোলে। ইট-পাথরের নাগরিক জীবনের যানজট, কোলাহল ছাপিয়েও যেটুকু প্রকৃতি খুঁজে পাওয়া যায়, তাকেই অতি আপন করে নেয় কর্মব্যস্ত মানুষ। নেচে ওঠে তাদের মন। যেন হারিয়ে যেতে আজ নেইকো মানা। ষড়ঋতুর আমাদের দেশে গ্রাম-বাংলার প্রকৃতিতেই মূলত বসন্ত জানান দেয় তার আগমনী বারতা। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, বৃক্ষরাজি, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। চোখ বুজলেও টের পাওয়া যায় তার দৃশ্যপট। কবির ভাষায়, আজ ফাগুন এসেছে বনে বনে। অশোকে-অশ্বত্থে-শিরীষে-শালে-পিয়ালে দখিনা হাওয়ার নাচন, নরম রোদের কাঁপনে যখন-তখন মাতামাতির দিন আজ। ফুল ফুটবার পুলকিত সময়। আজ মাতাল হাওয়ায়, উতরোল মৌমাছিদের গুঞ্জরনে, গাছের কচিপাতায়, কোকিলের কুহুতানে জেগে ওঠার দিন। গ্রীষ্মের খরতাপের আগে ফাগুনে প্রকৃতি পায় শেষ পরিতৃপ্তি। নিসর্গের বর্ণচ্ছটায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে অপরুপ। কচিপাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনে দোলা লাগে, হৃদয় উচাটন হয়।বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি তো অনাদিকাল থেকেই। কবিতায়, গানে, নৃত্যে, চিত্রকলায় বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে নানা অনুপ্রাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষায়। নগরমানুষ যতই নিষ্প্রাণ, হিসেবী, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন হোক না কেন, বসন্তের এই দিনে তারা গেয়ে ওঠেন বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে/ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে …।ফাগুনের প্রথম দিনে সবাই মিলিত হবে মনকে বসন্তের রঙে রাঙিয়ে। প্রীতির বন্ধনে আপন মহিমায় খুঁজে নেবে বসন্তকে। সেই মিলনের তাগিদে আজ সারা দিন দেশের নানা প্রান্তে বসন্ত বরণে মেতে উঠবে জাতি। বসন্তের প্রথম দিনে দেশ বিদেশে আজ নানা আয়োজনে আলোড়িত হবে। শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে ঋতুরাজ বসন্তকে। সেল ফোনে টেক্সট আদান প্রদান, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যাবে নানা কথা গল্প আর গানে।


Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...