Home / অর্থনীতি / ‘আর্থিক সেবা খাতকে সুবিবেচনার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করে যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব’

‘আর্থিক সেবা খাতকে সুবিবেচনার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করে যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব’

 ড. আতিউর রহমানস্টাফ রিপোর্টার :: “যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মানে হচ্ছে বিভিন্ন আয়ের (নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চ আয়) গ্রাহকদের জন্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা। আর গ্রাহক হিসেবে বিভিন্ন আয়ের মানুষের উপস্থিতি পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়ায়। অন্যদিকে আর্থিক সেবা খাত যদি স্থিতিশীল থাকে তবে আর্থিক সেবার ক্রয়মূল্য কমে আসে এবং আর এর ফলে আরো বেশি বেশি গ্রাহক আর্থিক সেবা নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ আর্থিক সেবা খাতের স্থিতিশীলতার ফলেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ঘটে।”

আজ (০৭ সেপ্টেম্বর) মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নেটওয়ার্ক এসইএসিইএন-এর উদ্যোগে ডেপুটি গভর্নরদের নিয়ে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের সেমিনারে বক্তব্য রাখার সময় একথাগুলো বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান।

এসইএসিইএন-এর পক্ষ থেকে গ্লেন টাস্কি সেমিনারের এই অধিবেশন সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন এবং অংশ নিয়েছেন ভারত, মালদ্বিপ, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, নেপাল ও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় ড. আতিউর বলেন- বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কৃষি, এসএমই, নারী উদ্যোক্তদের উৎসাহ প্রদান এবং সবুজ অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছে। তিনি আরও বলেন যে সচরাচর যারা ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন বা তুলনামূলক কম সেবা পান সেসব গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বর্গচাষীদের জন্য ঋণ কর্মসূচি এবং মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের মতো উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগগুলোকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র্ঋণ সংস্থা এবং মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে একযোগে কাজ করে সুফল পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও ড. রহমান আলোচনা করেন। তিনি জানান যে ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত হিসাব অনুসারে কৃষক ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের নো-ফ্রিল একাউন্টগুলোতে (যেমন ১০ টাকার একাউন্ট) অনিষ্পন্ন স্থিতির পরিমাণ ৩.৫ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে গেছে, এবং এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহের পরিমাণ ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫৪০ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ১.২ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া ঋণের পরিমাণও এ সময়ের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার যৌথভাবে কাজ করাকেও উৎসাহিত করা হয়েছে।

যেমন: ব্র্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৪৬ জেলায় ৩ লক্ষ ১৯ হাজার বর্গাচাষিকে ঋণ সুবিধা দিতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার ও স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ বেড়েছে, নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। আর্থিক সেবা খাতে আইসিটি প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করার ফলে মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অতুলনীয় সাফল্য এসেছে বলে ড. আতিউর অভিমত ব্যক্ত করেন।

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ি মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের একাউন্টধারির সংখ্যা যথাক্রমে ৪২ মিলিয়ন ও ১ মিলিয়ন। পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুন:অর্থায়ন কমর্সূচির আওতায় প্রায় ১ বিলিয়ন টাকা ছাড় করা হয়েছে ২০১৬ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে বিভিন্ন ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর কর্মসূচির আওতায় অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে শিক্ষা সহয়তার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে (প্রধানত শিক্ষা বৃত্তি কমর্সূচি) সেগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

ড. আতিউর বলেন যে বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীল অবস্থা দেখা যাচ্ছে তার কৃতিত্ব বহুলাংশে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলের। তিনি বলেন যে, যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেছে বলেই আশে পাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির চিত্র উজ্জ্বলতর, মুদ্রস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, ডলারের সাথে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে, মাথাপিছু আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থাও অত্যন্ত সন্তোষজনক।

পরিশেষে ড. আতিউর বলেন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় বিশেষ সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। সর্বশেষ বৈশ্বিক মন্দার সময়ও বাংলাদেশ ও অন্যান্য কয়েকটি উন্নয়নশীল যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলের করণেই কার্যকারভাবে মন্দা মোকাবিলা করতে পেরেছিলো। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ঝুঁকির দিকটি হলো এর ফলে আগে কখনোই আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবাদানকারির সংস্পর্শে আসেননি এমন ব্যক্তির সাথে লেনদেন করতে হয়। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে আর্থিক সেবা/পণ্যগুলো তৈরি করতে হবে এবং সুলভে বাজারজাত করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক সেবা খাতকে সুবিবেচনার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে “যথাযথ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি” নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ভোলায় এক্সিম ব্যাংকের শাখা উদ্ধোধন

ভোলায় এক্সিম ব্যাংকের শাখা উদ্ধোধন

এম শরীফ আহমেদ, ভোলা থেকেঃ  বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে দ্বীপ জেলা ভোলায় এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ...