‘আমি সবাইকে ছেড়ে যেতে চাইনা না, প্লিজ একটু দয়া করুন’

ইফতেখার রোমান নিরব

আরিফ চৌধুরী শুভ :: মানুষের নাম কি কখনো তার জন্যে অভিশাপ হতে পারে? এই প্রশ্নো এখন নিকটজনদের অশ্রুন্সিক্ত করে। বাস্তবতা যেন একেবারেই ভিন্ন এই যুবকের ভাগ্যে। পুরো নাম ইফতেখার রোমান নিরব। পোশায় একজন ডাক্তার। সবাই আদর করে নিরব ডাকলেও বাস্তবের নিরব দুরন্ত মেধাবী এবং অত্যন্ত পরোউপকারী।

যুক্ত আছেন একাধিক সামাজিক সংগঠনের সাথে।মানুষের সেবা করবেন বলে হয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু হাসপাতালের বেড়ে যন্ত্রণায় কাতরানো এই ‘নিরব’ কেই এখন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অন্যের কাছে। মরণব্যাধি ক্যান্সার প্রাণচাঞ্চল্য নিরবকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নিরব যেন ক্রমেই নিরব থেকে নিথর হয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনে। কিন্তু নিরব সবার মাঝে আগের মতোই উচ্ছ্বাসিতভাবে বাঁচতে চায়। নিরব কি বাঁচবে?

ড্রাইভার বাবা ও গৃহিনী ময়ের একমাত্র সন্তান নিরবের সংসারেও রয়েছে ছোট্ট একটি ফুটফুটে সন্তান। স্ত্রীর নিরব কান্না অার তার শরীরে ক্যান্সার ছোট্ট মেয়েটির বোঝার বয়স হয়নি এখনো। সারাক্ষণ বাবার সাথে সে হাসে।বাবার কোলে গড়াগড়ি করে। বাবার সাথে সে শুধু খেলতে চায় আগের মতো। কিন্তু বাবার শরীরের শক্তি ফুরিয়ে যায়, মুখের হাসি লুটে যায় ক্যান্সারের যন্ত্রণায়। বাবা তার সাথে না খেললে কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে ওঠে।

নিরবের বাড়ি নোয়াখালী জেলার নেয়াজপুর ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামের হামিদ ভুইয়া বাড়ি।বাবা ড্রাইভারি করে অনেক কষ্টে নিরবকে পড়াশুনা করিয়েছেন। নিরব ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে ২০১২ সালে ঢাকায় নিডাসা থেকে ডিপ্লোমা ইন ডেন্টালে পড়াশুনা করেন। তারপরই চলে যান নিজের গ্রামে। রোগি দেখতেন নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও চৌমুহনিতে। বেশিরভাগ রোগিই তার চেম্বারে ফ্রি চিকিৎসা পেত। কিন্তু আজ ক্যান্সার আক্রান্ত নিরবকে চিকিৎসার জন্যে গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব হারিয়ে সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যমে বাঁচার অাকুতি জানিয়ে একটি পোস্ট করেন নিরব। পাঠকদের সেই পোস্ট পড়ার অনুরোধও জানান নিরব। নিরবের পোস্টটি নিম্নরুপ:

‘মৃত্যুর মুখোমুখি আমি। কিছু না বলা অনুভূতি আজ আমি শেয়ার করলাম। দয়া করে সবাই পড়বেন। অনেক কষ্ট হয়েছে আমার এই লেখাগুলো লিখতে। ঘুম কাকে বলে মনে করতে পারছি না আমি। কবে যে শেষ ঘুমিয়েছি তাও জানি না। সব সময় ভারি কিছু আমাকে ঘিরে থাকে। চোখ বন্ধ করে অস্থির হয়ে এপাশ ওপাশ করি। মধ্যরাতে ওঠে মোবাইলের আলোতে আমার ঘুমন্ত নিঃষ্পাপ শিশুটিকে দেখি। দেখতেই থাকি। এভাবে কখন যে সকাল হয়ে আসে বুঝতেই পারি না।

মাঝে মধ্যে গভীর রাতে কারো কান্নার শব্দ শুনতে পাই। আমার স্ত্রীর লুকানো কান্না। তার মা বাবার কাছ থেকে তাকে সারাজীবন সুখে রাখবো প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০১২ সালে বিয়ে করেছিলাম। কান্নার শব্দ শুনে আমার খুব ইচ্ছে করে তার মাথায় হাত রেখে বলি কান্না কেন করো? আমি আছিতো? কিন্তু আমি বলতে পারি না। আমি সত্যি পারি না। অদৃশ্য কিছু যেন বাঁধা দেয় আমাকে। আমি গভীর ঘুমে আছন্ন হওয়ার ভাণ করে পড়ে থাকি।

আগে বাড়ীতে যখনই মা স্পেশাল কিছু রান্না করতেন, তখন সবার আগে আমাকে দিতেন। আর বলতেন আমার বাবাটা খেলেই আমার খাওয়া হবে। আমিও খুব মজা করে মায়ের হাতে রান্না খেতাম। মাকে শুধু বলতাম মা আরো দাও। পেট ফুরিয়ে খাই। মায়ের হাতের রান্নার তুলনা হয় না। কদিন আগেই মা আমার প্রিয় খাবার বিরিয়ানি রান্না করে গরম গরম বিরিয়ানি আমাকে প্লেট ভরে খেতে দিলেন। কি আর্শ্চায! দুই তিন লোকমা খেয়ে আমি আর খেতে পারছিলাম না। অথচ তারও কদিন আগেই এই বিরিয়ানি আমি প্লেট ভরে মজা করে খেতাম। মা বসে বসে দেখতেন আর হাসতেন। সেদিনও মা দেখছিলেন। কিন্তু কেঁদেছেন। আমি খেতে পারছি না বলে মুখে আঁচল দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমিও মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলি। মাকে বলি… মা আমার অনেক খিদে লাগে, কিন্তু খেতে পারি না। মনে হয় পেটের ভিতর কিছু ডুকে পেটটাকে ভরপুর করে রেখেছে। আমি জোর করে খাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম মা আমার গ্যাসের সমস্যা করছে রাতে খাবো।

ছোট বেলায় বাবা আমাকে কাঁধে চড়িয়ে স্কুলে নিয়ে যেতেন। আর বলতেন- লেখাপড়া করে যে গাড়ী ঘোড়ায় চড়ে সে। অনেক কষ্ট করে ড্রাইভারি করে আমাকে পড়ালেন। কষ্টের উর্পাজন প্রায় সবটাই আমার পড়ালেখার পিছনে ব্যয় করলেন। যখন আমি ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল শেষ করে ক্লিনিকে কাজ শুরু করলাম, তখন বাবা খুশিতে আত্নহারা হয়ে সবাইকে বলতেন, আমার ছেলে এখন দাঁতের ডাক্তার। কারো দাঁতে সমস্যা হলে আমার ছেলের কাছে যেও। বিনাপয়সায় চিকিৎসা পাবি। মাকে বলতেন, আমাদের দু:খের দিন শেষ। ছেলে ডাক্তার হয়েছে এখন আমার আর কোন চিন্তা নেই। অথচ আজ বাবার মুখ মলিন।

বাবা এখন ধার করে সংসার চালান। নামাজের বিচানায় বসে কাঁদেন। আমার ইচ্ছে করে বাবাকে বলি। বাবা আমি থাকতে তোমার এত চিন্তা কিসের? কিন্তু আমি বলতে পারি না। কি ই বা বলবো? আমার জীবনেরইতো ভরসা নেই। বাবাকে কি করে ভরসা দিবো?

আমার ৩ বছরের ছোট্ট মেয়েটা খুব আবদার করে বলে বাবা আমি তোমার সাথে খেলবো।দোকানে যাবো। কিন্তু আমি তার এই ছোট্ট মনের আবদার রাখতে পারি না। শক্তি প্রয়োগ করলে নড়াচড়া বেশি করলে হাঁপিয়ে উঠি। মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। মেয়েটাকে নিজের পিঠে ঘোড়ায়র মতো চড়াতে পারি না বলে অনেক অভিমান করে সে। মাঝে মাঝে তার মা বকা দিলে কান্না করে দেয়। আমার ভিতরটা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। কিন্তু আমি স্বাভাবিক থাকার ভান করি।

আমি অপরাধী। অনেক অপরাধী। এতগুলো মানুষকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছি আমি। আর নিজের সাথে নিজেই অভিনয় করে যাচ্ছি প্রতিটি মুহুর্তে। মাঝে মাঝে খুব ভোরে ওঠে অজানার উদ্দশ্যে হাঁটা শুরু করি। ইচ্ছে করে অনেক দুরে হারিয়ে যাই। কিন্তু যেতে পারি না। হাঁপিয়ে উঠে বাড়ির পাশে টংয়ের দোকানে বসি। সেদিনও বসলাম, দুজন প্রবীণ লোক চা খাচ্ছিলেন আর গল্প করতে করতে হাসছিলেন। কি উচ্ছ্বাস আর আনন্দ তাদের মধ্যে। আমিও হাসতে চাই তাদের মতো। কিন্তু আমি পারি না। কিভাবে হাসতে হয় আমি আজ ভুলে গেছি। অথচ ৭ মাস আগেও সব ঠিকঠাক ছিলো। মনে হলো এইতো সেদিন বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিতে হেসে লুটেপুটে মাটিতে পড়েছিলাম। ক্যান্সার কি আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিলো?

বন্ধুরা ও কয়েকজন সমাজকর্মী আমাকে আশা দিলেন ২০ লাখ টাকা কোন বড় অংকের টাকা নয়।২০০০০ মানুষ ১০০ টাকা করে দিলেই হয়ে যাবে। আমি জানি না এই টাকা কিভাবে যোগার হবে? অনেকে দোয়া করলেন অনেকে সহযোগীতার প্রতিশ্রুতিও দিলেন। নিজেকে কিছুটা হালকা মনে হতে লাগলো। অল্প অল্প করে মনে আশার প্রদীপ জাগতে শুরু করলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার প্রদীপগুলো নিভতে শুরু করলো। কয়েকদিন ধরে আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে। পেটের ডান পাশে ফুঁলে গেছে। ঢাকায় মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতে ডাক্তার দেখাতে গেলাম। ভাবলাম একটা কেমোথেরাপি দিলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ডাক্তার মাহবুবুর রহমান বললেন, কেমোথেরাপি দেওয়া যাবে না।

একমাত্র বোনমেরু ট্রাসপ্লান্ট ছাড়া কোন উপায় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে বলছেন। আমার ভিতরটা আবার দুমড়ে মুচড়ে গেলো। চিৎকার করতে মন চায়। কিন্তু চিৎকার বের হয় না। আমি কি করবো, কোথায় যাবো, কার কাছে হাত পাতবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনারা একটু দয়া করেন না আমাকে। একটু অনুগ্রহ করুন অামার প্রতি।

আমি সবাইকে ছেড়ে যেতে চাই না এই পৃথিবী থেকে। আমি বাঁচতে চাই। প্লীজ দয়া করুন আমাকে।

ইফতেখার রোমান নিরব।

01633777146 (বিকাশ পার্সোনাল)

01796375566 ( 7) (রকেট এবং বিকাশ)

ব্যাংক এক্যাউন্ট, তাছলিমা বেগম, ব্যাংক এশিয়া, মাইজদী শাখা (60834001941)।’

ইফতেখার রোমান নিরব

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আমীর খসরুর জামিন বাতিল, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার :: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় ...