ব্রেকিং নিউজ

আমার আমি এবং আমার হিমু ভাবনা: তাহমিনা শিল্পী

তাহমিনা শিল্পীতাহমিনা শিল্পীতাহমিনা শিল্পীতাহমিনা শিল্পী


তাহমিনা শিল্পী :: বেশ কয়েকদিন আগে কথা প্রসঙ্গে আমার এক সহকর্মী আমাকে বলেছিল-“আপনিতো হুমায়ূন আহমেদ-এর সেইরকম একজন ভক্ত ছিলেন!” আমি তার কথা শুনে বিরাট এক ঝাঁকি খেলাম। জানতে চাইলাম-“ছিলাম মানেটা ঠিক বুঝলাম না তো!” সে বলল-“উনি তো আর এখন নেই তাই বললাম।” আমি আগেরবারের থেকেও অত্যধিক জোড়ে ঝাঁকি খেলাম। বললাম-” উনি নেই এটার মানেটা ওতো ঠিক বুঝলাম না!” এবারে আমার ওই সহকর্মীটি পড়ল বিপদে। বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে।

আমি তাকে কঠিন ভাবে বললাম- “কে বলেছে হুমায়ূন আহমেদ নেই?” সত্যিই হিমু স্যার কোথায় নেই? কোথায় তাঁকে পাই না? তাঁর সৃষ্টি আমার প্রত্যাহিক জীবনের সর্বত্র এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তিনি নেই একথাটা আমি কখনো ভাবতেই পারিনা। শুধু আমি কেন আমার মত তাঁর অসংখ্য ভক্তকুলের কেউই কখনো এটা ভাবে না যে তিনি নেই। তিনি বাংলাদেশের কিংবদন্তী লেখক, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।

উপন্যাস, গল্প, কবিতা, গান, সিনেমা, নাটকের মাধ্যমে তিনি আমার এবং প্রতিটি বাঙালীর প্রত্যাহিক জীবনে সবসময় বিরাজমান। তাইতো প্রতিদিন তাঁর সৃষ্টিতে নিজেকে হারাই। আবার খু্ঁজে খুঁজে পাই।

উল্লেখ্য, হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থেকেই আমি তাঁকে হিমু স্যার বলে থাকি। যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি তখন থেকেই শুরু করেছিলাম হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া। “আয়নাঘর”, “ময়ূরাক্ষী”, “আমার আছে জল”, “দারুচিনি দ্বীপ”, “নবনী”, “তিথীর নীল তোয়ালে”, “মৃন্ময়ী”, “মধ্যাহ্ন”, “লীলাবতী”, “সে আসে ধীরে”, “শুভ্র গেছে বনে”, “নন্দিত নরকে”, আত্মজীবনীগ্রন্থ “কাঠপেন্সিল”, “রঙপেন্সিল”, “ফাউন্টেন পেন” এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মিসির আলী ও হিমু সিরিজের সবগুলো বইসহ তাঁর প্রকাশিত দুইশতাধিক বইয়ের অসংখ্য বই আমি পড়েছি এবং সংগ্রহে রেখে পড়ি।

প্রত্যেকটি বইয়ের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। নারীত্বের প্রতি সচেতনতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, মানুষের জন্য উদারতা, অতিব খারাপের মাঝে ভালোর খোঁজ পাওয়া, একই সাথে কঠোরতা-মমতা, কল্পনাবিলাশী হয়ে বাস্তবধর্মী হওয়া এসবতো হিমু স্যারই তাঁর লেখনিতে শিখিয়েছেন।

আর ভালবাসার কথা কি বলবো! “একটা ছিল সোনার কন্যা, মেঘ বরন চুল, দুই চোখে তার আহারে মায়া ।” এক সাধারন মেয়ে অসাধারন হয়ে ওঠে হুমায়ূন আহমেদের বর্ননায়। যে মানুষটির মুখে শুনি “আমি ভুল করা কন্যার সাথে কথা বলব না”, আবার সেই মানুষটিই বলে -“ভুল করা কন্যার লাগি, আমার মন আনচান করে।” এমন ভালবাসার বর্ননা বোধহয় কেবল হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই দেয়া সম্ভব।

হিমু স্যার তাঁর লেখায় নিজস্ব ভঙ্গিতে কিছু কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন। যা মনের অজান্তেই সবসময় আমার কথাকে প্রভাবিত করে। যেমন- অতিব সুন্দর, বড়ই সৌন্দর্য, বিরাট ঝাঁকি খাওয়া, অত্যধিক প্রিয়, মমতা। এরকম আরো অনেক শব্দ অবচেতন মনে আমি বলে থাকি। এ নিয়ে যে বন্ধুরা মশকরা করেনা এমনটি কিন্তু নয়। সবাই বলে আমি বর্ষা প্রেমি। কিন্তু সেও তো হিমু স্যারেরই জন্য।”যদি মন কাঁদে,তুমি চলে এসো/চলে এসো এক বরোষায়!” আহা! কি কথা, কি সুর।

আমার অতিব প্রিয় গান। একেবারে অন্তরে বর্ষা গেঁথে যায়। এই গানটি শুনলে গানের প্রতিটি কথার সাথে যেন আমি হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাই বেলা ফুরাবার সেই মহেন্দ্র ক্ষণে। কদমগুচ্ছ হাতে নিয়ে প্রিয় মানুষটির খোঁজে নুহাশ পল্লীর জলভরা মাঠে। আবার “বরোষার প্রথম দিনে,ঘনকালো মেঘ দেখে/আনন্দে যদি কাঁপে তোমার হৃদয়/সেদিন তাহার সনে করো পরিচয়!” এমন গানের কথা যে বুঝতে পারে। সে কি বর্ষার প্রেমে না পরে থাকতে পারে? আমিও পারিনি, একদম পারিনি।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কবিতায় বলেছেন- বালিকা ভুলানো জোছনা নয়, তিনি গৃহত্যাগী জোছনা চান। তাই কি জোছনার প্রতি আমার অগাধ ভালোবাসা? যদিও কোন কারন খুঁজে পাইনা। তবুও চাঁদ, জোছনা আমার ভীষন প্রিয়। বোধকরি সেও হিমু স্যারের জন্যই। “আমার ভাঙা ঘরে, ভাঙা চালা,ভাঙা বেড়ার ফাঁকে/অবাক জোছনা ঢুইকা পরে, হাত বাড়াইয়া ডাকে!” কিম্বা “ও কারিগর,দয়ার সাগর/ওগো দয়াময়… /চাঁন্নী পশর রাইতে যেন, আমার মরন হয়!” কি যে মোহময়তা খুঁজে পাই এ গানে আমি বলে বুঝাতে পারবো না।

সিনেমা দেখার অভ্যাস আমার একদম ছিলোনা। সেই আমিই হলে গিয়ে সিনেমা দেখা শিখেছিলাম হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্য ও পরিচালনার প্রথম মুক্তিযুদ্ধেরর সিনেমা “আগুনের পরশমনি”। তারপর একে একে “শঙ্খনীল কারাগার”, “শ্রাবন মেঘের দিন”, “দুই দুয়ারী”, “চন্দ্রকথা” “শ্যামল ছায়া”, এবং সর্বশেষ “ঘেটুপুত্র কমলা”। তাঁর প্রতিটি সিনেমার গল্পই একেবারে সহজ,সুন্দর এবং ব্যাতিক্রমী। উপস্থাপনও একেবারে সহজ, স্বাভাবিক। যেন মনে হয় এ আমারি গল্প এবং তাঁর সিনেমার বিশেষত্ব হচ্ছে তাঁর নিজের লেখা গানের সমাহার।

আজ ১৩ নভেম্বর কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের এই দিনে তিনি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাশি আমি বিশ্বাস করি না। তবে ভাবতে ভালো লাগে হিমু স্যার আর আমার জন্মমাস একই। আমরা একই রাশির জাতক। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু তিনি আছেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে। যতদিন বাংলা সাহিত্য বেঁচে থাকবে, ততদিন তিনি থাকবেন শ্রদ্ধাভরে সকল বাঙালীর মনে। আমি রূপা নই, তবুও আপনিতো আমার হিমু স্যার। তাই জন্মদিনে আপনার প্রতি রইল আমার সশ্রদ্ধ ভালবাসা আর কয়েকটি নীল পদ্মের সুবাস।

লেখকের ইমেইল: tahmina_shilpi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এএইচএম নোমান

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর: ধ্বংস থেকে সৃষ্টি

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর গভীর রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা ...