আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে মানুষ মনে রাখবে

ঢাকা : মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর ২০১৩ সালকে আলাদাভাবে মনে রাখবে মানুষ।

এজন্য বিশ্ব ইতিহাসেও বাংলাদেশ নতুনভাবে পরিচিতি পাবে। এ বছর দুই ট্রাইব্যুনাল ৯টি মামলার রায় দিয়েছে।

কার্যকরও হয়েছে একটি। তাই সারা বছরই ট্রাইব্যুনাল ছিল দেশ ও বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত একটি অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহের বিচার করা। এর আওতায় পড়ে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সমূহ।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী ইশতেহার ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সিলেট-৩ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

মৌখিক ভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর পর মানবতাবিরোধী ‘যুদ্ধাপরাধ’ অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে এ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়। এরপর বিচার কাজ দ্রুত করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পর ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ৩ নভেম্বর পযর্ন্ত ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে এ সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল দুটি। অবশ্য এসব রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী মহলসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিভিন্ন মহলে বির্তক রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের ৯ রায় এ বছর :

ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর প্রথম রায়টি ঘোষণা করা হয় চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি। ওই দিন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। আসামির অনুপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।

দ্বিতীয় রায়টি ঘোষণা করা হয় ৫ ফেব্রুয়ারি। এ রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকাকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২ ।  এ রায়ের পর কাদের মোল্লা ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন গড়ে তোলে তরুণ প্রজন্ম। এরপর সরকার ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন আনে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এ মামলার চূড়ান্ত রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের  পরিবর্তে ফাঁসির আদেশ দেয়। গত ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে এ ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায় হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এ রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে ২৮ মার্চ মাওলানা সাঈদী এবং সব অভিযোগে সাঈদীর ফাঁসির চেয়ে সরকারপক্ষ পৃথকভাবে আপিল করে। এ আপিল শুনানি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মাওলানা সাঈদীর মামলার রায়ের পর সারাদেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

চতুর্থ রায়টি হয় ৯ মে। ওইদিন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এ রায়ের বিরুদ্ধে ৬ জুন আপিল করেন কামারুজ্জামান।

ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায়টি ঘোষণা করা হয় গত ১৫ জুন। ওই রায়ে জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদ- দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। গোলাম আযম  খালাস চেয়ে এবং রাষ্ট্রপক্ষ তার সর্বোচ্চ সাজা ‘ফাঁসি’ চেয়ে আপিল করেছে।

ষষ্ঠ রায়টি ঘোষণা করা হয় গত ১৭ জুলাই। ওই দিন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। এ রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে ১১ আগস্ট আপিল করেন আসামিপক্ষ।

সপ্তম রায়টি ঘোষণা করা হয় ১ অক্টোবর। এ রায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।  রায়ের বিরুদ্ধে ২৯ আগস্ট খালাস চেয়ে আপিল করেন আসামিপক্ষ। এ বিষয়ে এখনও শুনানি শুরু হয়নি।

অষ্টম রায়টি ঘোষণা করা হয় গত ৯ অক্টোবর। ওইদিন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদন্ডের আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২।

ট্রাইব্যুনালের নবম মামলার রায়টি ঘোষণা করা হয় গত ৩ নভেম্বর। ওইদিন বুদ্ধিজীবী হত্যকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈন উদ্দিনকে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। আসামিদের অনুপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। যেকোনদিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে।

আলোচিত গণজাগরণ মঞ্চ:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন রায় দেওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। এ গণজাগরণের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে সরকার। এরপরই আপিল বিভাগ তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়। মঞ্চের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের যোগ দেওয়ায় এই আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। একপর্যায়ে মঞ্চের নেতৃত্বের মধ্যেও ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। মঞ্চ থেকে বের হয়ে যায় বিশিষ্ট অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। তিনি এর মুখপাত্রের বিরুদ্ধে বিষোধাগারও করেন।

কাদের মোল্লার নাটকীয় ফাঁসি:

গত ১৭ সেপ্টেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় আপিল বিভাগ ঘোষণা করেছিল। ৫ ডিসেম্বর ৭৯০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, সংশ্লিষ্ট আইনে আসামিপক্ষের রিভিউ পিটিশন করার সুযোগ নেই। ফলে এখন সরকার আদেশ জারি করে যে কোন সময় ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করে, তারা রিভিউ প্রশ্নে সিদ্ধান্তের জন্য সুপ্রিমকোর্টে যাবে। এরমধ্যে সরকারের নির্দেশে ১০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাতেই আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের যাবতীয় উদ্যোগ নেয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। এজন্য কাদের মোল্লার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের জন্য রাত ৮টায় জরুরি ভিত্তিতে তার পরিবারের সদস্যদের চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠানো হয়। এরপর তৎক্ষণাৎ পরিবারের ২৩ জন সদস্য কাদের মোল্লার সাথে দেখা করেন।

এদিকে ফাঁসির প্রস্তুতি যখন প্রায় সম্পন্ন তখন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তখন ছুটে যান চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের বাসভবনে ফাঁসি কার্যকর স্থগিত এবং রিভিউ আবেদন নিয়ে।

ফাঁসি কার্যকরের মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে চেম্বার বিচারপতি ফাঁসি কার্যকর পরদিন ১১ ডিসেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত স্থগিত করে আদেশ দেন। এরপর দিন গোটা দেশবাসীর  দৃষ্টি ছিল সুপ্রিমকোর্টের দিকে। সকালে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে শুরু হয় রিভিউ আবেদনের শুনানি। এছাড়া আসামিপক্ষ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোরও আবেদন করে। রিভিউ আবেদন চলবে কি চলবে না এ বিষয়ে বুধবার শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করায় ফাঁসি স্থগিতাদেশও বহাল থাকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার সকালে আবার শুরু হয় রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি। শুনানি শেষে ১২টা ৭ মিনিটে প্রধান বিচারপতি আবেদন খারিজ (ডিসমিসড) করে দেন। বিকাল ৩টার পরে  রিভিউ আবেদন খারিজের সংক্ষিপ্ত আদেশের কপি ট্রাইব্যুনাল ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিসে পাঠানো হয় সুপ্রিমকোর্ট রেজিস্ট্রার অফিস থেকে। তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় রাতেই কার্যকর হচ্ছে ফাঁসি। তবে সাধারণত রাত ১২টা ০১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর করার নিয়ম থাকলেও যেহেতু রাত ১২টা এক মিনিট ছুটির দিন শুক্রবার শুরু হয়। তাই শুক্রবার শুরুর আগেই নানা নাটকীয়তার পর ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি:

কাদের মোল্লার ফাসি কার্যকরের বিষয়টি পাকিস্তান স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। দেশটির বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ফাঁসি নিয়ে মন্তব্য করেন। এমনকি জাতীয় পরিষদে  কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকরের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের অবনরতি হয়।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ফাঁস:

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ঘোষণার আগের দিন ওয়েবসাইটে রায়ের কপি ফাঁস হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরদিন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার রায়ের খসড়া কপি ফাঁসের কথা স্বীকার করেন। এ রায়ের কপি ফাঁস হওয়া নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। এর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের পরিচ্ছন্নকর্মী নয়ন ও অফিস সহকারী ফারুককে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুলকেও গ্রেফতার করা হয়।

নিখোঁজ সাক্ষীর খোঁজ:

রাষ্ট্রপক্ষ  ত্যাগ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরণ হন সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী। এরপর দীর্ঘদিন তার কোন খোঁজ ছিল না। এ বছরের ১৬ মে গণমাধ্যমে খোঁজ মিলে তিনি ভারতের কারাগারে। এ নিয়ে আবারও ট্রাইব্যুনাল আলোচনায় আসে। প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে বিচার ব্যবস্থা।

তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউটরদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউটরা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য ব্যাপক দৌঁড়ঝাপ করেন। তারা ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে পত্রিকায় শিরোনাম হন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উত্তপ্ত ছিল দেশ

ঢাকা : বিদায় নিয়েছে ২০১৩ সাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সদ্যবিদায় নেওয়া বছরটি ...